ঐ সব আল, গাছ এইসব দাগ দিবেন কেন? বেশ হাসি-হাসি মুখেই এম-এল-এ জিজ্ঞাসা করে, যেন ধাঁধা।
আছে, তাই দেব।
হ্যাঁ, ঐ ত মজা। ঐটা যদি না থাকে তয় ত একজন বলিবার পারে ঐ জায়গাটায় গাছ নেই।
না থাকলে বলবে, নেই।
না হয়, না হয়। যার সম্পত্তির সীমা ধরেন ঐ গাছ পর্যন্ত, সেইলা ত চাহিবে গাছটা না-থাকুক।
কেন?
কহিবার পারিবে, গাছ নাই ত মোর জমিখানারও সীমা নাই।
সুহাস হেসে ফেলে, তা অবিশ্যি পারে।
আর নিভৃত আলাপের সুরে এম-এল-এ বলে, তা উ ত আপনাকে আসিয়া বলিবে যে ম্যাপে গাছটা দিবেন না।
সুহাস আরো হেসে বলে, হ্যাঁ, তা পারে–
এম-এল-এ তখন হেসে বলে, দেখেন না, এক বিঘত জমি নিয়া খুনাখুনি পর্যন্ত হওয়া ধরে? আর, আপনি ত এই তামান জমির সীমা টানাটানি করিছেন।
সুহাস হাসি-হাসি মুখে তাকিয়ে থাকে। এম-এল-এ একটু চুপ করে থেকে বলে, গোলমাল তো আপনার সঙ্গেই হইবে, কত গোলমাল।
এম-এল-এর কথার ভেতর নিভৃত আলাপের ভঙ্গি ছিল। তার একটা কারণ, আলাপটা সত্যিই নিভৃত ছিল। আর-একটা কারণ, সুহাস অনুমান করতে চায় কি এই নিভৃত আলাপে এম-এল-এ তাকে কিছুটা সমর্থনই দিয়ে যেতে চায়! ভেবে ফেলেই সুহাস সাবধান হয়, এই সমর্থনটুকুর বদলেই হয়ত যাওয়ার আগে তাকে কোনো ব্যক্তিগত ও দলগত কাজের কথা বলবে। সুহাস আসলে বুঝতে পারছে না–এম-এল-এ তারই বারান্দায় এসে বসল কেন। সেটা না-বোঝা পর্যন্ত সুহাসের অস্বস্তি কাটবে না।
প্রিয়নাথ কাঁচের গ্লাসে চা এনে দেয়। তার পর জিজ্ঞাসা করে, একবার এম-এল-এর দিকে, আর একবার, সুহাসের দিকে তাকিয়ে, একটা বিস্কুট দেব?
দাও, একখান বিস্কুট দাও, এম-এল-এ বা হাতে চায়ের গ্লাশটা নিয়ে ডান হাতটা বাড়িয়ে রাখে। প্রিয়নাথ বিস্কুট আনতে যায়। সুহাস তাড়াতাড়ি জিজ্ঞাসা করে, আপনাকে কিছু খাবার এনে দেবে?
আরে নানা, প্রিয়নাথ বিস্কুটটা এনে দিলে এম-এল-এ গ্লাশের চায়ে নরম করে করে খায়। সুহাস বিস্কুট নেয় না। চায়ে চুমুক দিয়ে এম-এল-এজিজ্ঞাসা করে, আপনি ত এই প্রথম এই কাজে আসছেন, না?
জবাব দিয়েও সুহাস ঠিক বুঝে উঠতে পারে না, সে লোকটিকে পছন্দ করছে, না অপছন্দ করছে। লোকটার কথা বলার ভাষাটা এমন–রাজবংশী ভাষার সঙ্গে চলতি বাংলার মিশেলটা নিয়ে কোনো অস্বস্তি নেই। বলতে বলতে বলতে বলতে তার নিজের এই ভাষা তৈরি হয়ে গেছে। সেটা দিয়ে সে। সবার সঙ্গে সব জায়গাতেই কথা বলতে পারে–কলকাতাতে, নিশ্চয় তার পাটিটাটিতে, আবার তার এই সব গ্রামেও নিশ্চয়। লোকটাকে বেশ কাজের লোক বলে মনে হয় তার মুখের কথা শুনেই। আবার চেয়ারটা ভরে বসেছে একেবারে পাইকার-দেউনিয়ার মত, পায়ের ওপর পা তুলে, জামাটা ঘাড়ের পেছনে ঠেলে দিয়ে। চায়ে চুমুক দিয়ে এম-এল-এ আবার বলে, গ্রামের জমিজমার ত ধরেন কেনে দখলই হচ্ছে আইন। দখল যার জমি তার। আপনি যদি একখান লাইন টানি দিয়া আমার জমিখানের ভাগ, ধরেন, আর-একজনের জমির ভিতর ঢুকাইয়া দেন, তা হলি ত আমি পরের দিন লোকজন লাঠিসোটা নিয়া ঐ জমিটার দখল নিয়া নিম। ব্যাস, কথাটা শেষ করে এম-এল-এ বলে, ত আপনার সঙ্গে গোলমাল হবে না? প্রত্যেকদিন গোলমাল হবে আপনার মাপামাপি নিয়া। তবে আপনি ত শক্ত অফিসার। জোতদারদের বাড়ি খাবেন না, বলে দিছেন। জোতদাররা ভয় খাইছে, এম-এল-এ এবার বেশ জোরে-জোরে হেসে ওঠে।
সুহাস যেন নিজের অবস্থাটা বোঝানোর জন্য বলে, আমরা তো আর প্রপাটিরাইট মামে সম্পত্তি কার সে-সব ঠিক করছি না, সে-সব ত সিভিল কোর্টের ব্যাপার।
প্রপাটি রাইট-টাইট ত আপনার গয়ানাথ জোতদার, ফরেস্ট ডিপার্টমেন্ট আর আনন্দপুর চা বাগানের ব্যাপার। আর-সব মানুষের রাইট মানে ত এক বর্ষার চাষ। ব্যাস। কোর্টে যাইতে আমাদের সব মানষি ভয় পায়। সেইখানে ধরেন গ্রামের মাতব্বর, কি ধরেন পার্টির নেতা, কি ধরেন আপনাদের মতন, অফিসার যা হুকুম দেন সেটাই সবাই মানি নেয়। মানি নিবার চায় অন্তত। সাধারণ মানুষের কাছে ত সরকার মানেই সরকারি অফিসার–এই ধরেন ডি. সি, এস.ডি.ও, জে এল আর ও, থানার দারোগা আর আপনাদের মতন আরো সব অফিসার। অফিসার ভাল না-হলে ত সরকার বদলি যায়। এই দেখেন না, সাতালডির ব্যাপার। সব ইঞ্জিনিয়ারগুলা মিলি শয়তানি করে।
সুহাস একটু চমকে বোঝে, এই লোকটি এখানকারই এম-এল-এ বটে, কিন্তু সত্যি করেই তার পেছনে অভিজ্ঞতার এমন একটা ভূমি আছে, যেখান থেকে কোনো সময়েই লোকটা সরে না। আর সেই কারণেই এতক্ষণ তার কথায় এমন ঘনিষ্ঠতা বোধ করে ফেলছিল সুহাস। এই লোকটিও কি সেই কারণেই সুহাসের কাছে এসে বসল? সুহাসও এখানকার লোক নয়, তাই তাদের ভিতর, এখানকার অভিজ্ঞতা নিয়ে, এই সব কথা বিনিময় হতে পারে।
সুহাস জিজ্ঞাসা করে, আপনাকে তো নিশ্চয়ই এসেম্বলিতে প্রায়ই বলতে হয়।
মাঝে-মাঝে বলতে হয়, লোকাল ব্যাপার-ট্যাপার থাকলে, আর দু-এক সময় কোশ্চেন জিজ্ঞাসা করতে হয়। আমাদের অন্য কমরেডরা আছেন সব, তারাই বলে দেন।
লোকটি থেমে গেলে.সুহাস জিজ্ঞাসা করে বসে, আপনার ভাল লাগে এসেম্বলি? এম-এল-এচুপ করে যায়। সুহাস বোঝে, সে ভেবে নিচ্ছে কথাটার জবাব দেবে কি দেবে না। নাকি আসলে জবাবটাই ভাবছে, এমন করে কোনো কথা হয়ত তার এর আগে মনে হয় নি? অথবা, কতটা বলবে আর কতটা বলবে না, তার সূক্ষ্ম হিশেব?
