ক্রান্তি হাটের হাটখোলায় সন্ধ্যা নেমে গেল। রাস্তার ওপরের মিষ্টির দোকানের হ্যাজাকের আলোতে মাঠের ঐ কিনারাটা উজ্জ্বল দেখায়। অন্য দোকানগুলোতেও আলো জ্বালানো হয়েছে। ফলে সুহাসের, এই বারান্দা থেকে রাস্তার ওপরটাকে, দোকানগুলোর চালাঘরের ওপর দিয়ে উজ্জ্বলতর দেখায়। ধীরে-ধীরে রাস্তার ধারের গাছগুলির নীচের পাতাগুলোতেও আলোর ছিটে লাগে।
সুহাসের বারান্দা থেকে রাস্তার এক অংশ দেখা যায় না, কিন্তু ওপরের আলোর আভা বোঝা যায়। সেটুকু বাদ দিয়ে হাটখোলার বাকি অংশটা সন্ধ্যায় অন্ধকারে দুমড়েমুচড়ে আছে। নড়বড়ে সব বাশের ওপর ভামনির ছাউনিগুলো মাটিতে আরো থুবড়ে পড়ে। সন্ধ্যা যত বাড়ে, মাটি আর আকাশের মাঝখানের ফাঁকটাও ততই বাড়ে।
একদল লোক মাঠটা পার হয়ে হলকা ক্যাম্পের এই ঘরের দিকে আসছে। সুহাস বারান্দায়, বসেছিল। অতজন লোককে একসঙ্গে আসতে দেখে সুহাস অনুমান করে, সার্ভের ব্যাপারে কিছু বলার জন্য দল পাকিয়ে আসছে। সে ঠিক করে ফেলে, কথা বলতে হলে সার্ভের সময় বলতে হবে আর আপত্তি থাকলে লিখিত দিতে হবে-সে সরকারি দলই তোক আর বিরোধী দলই হোক। প্রথম থেকেই সুহাস এ ব্যাপারটায় আইন-অনুযায়ী চলতে চায়, যাতে কারোই কিছু বলার না থাকে।
দলবলটা যখন মাঠের মাঝখানে, সুহাস শুনতে পায়, আপনার এখানে একটু বসব।
শুনেও প্রথমে সুহাস বুঝতে পারে না। চেয়ার থেকে উঠে সিঁড়ির দিকে একটু এগিয়ে যায়। অন্ধকারে তখনো চিনে নিতে পারে না, কে। তারপর হঠাৎ হাঁটার ভঙ্গিটা দেখে বুঝে ফেলে, এম-এল-এ।
ঘরের ভিতর থেকে প্রিয়নাথ এসে আগেই দাঁড়িয়েছিল। সে এবার লণ্ঠনটা, এনে দরজার বাইরে রাখে। আর, এম-এল-এ সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠতে-উঠতে বলে, আপনার এখানে একটু বসব।
আরে হ্যাঁ হ্যাঁ, আসুন আসুন, বলে সুহাস প্রিয়নাথের দিকে তাকাতেই প্রিয়নাথ ঘরের ভেতর থেকে একটা চেয়ার নিয়ে বাইরে দেয়। চেয়ারটা বাইরে আনতে-আনতেই এম-এল-এ উঠে এসেছে। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলছে। তা হলে চেয়ারটা দেবে কোথায়? এম-এল-এই সরে জায়গা করে দেয়। প্রিয়নাথ প্রথমে সিঁড়ির মাথাতেই চেয়ারটা রাখে। কিন্তু বোঝে, তাতে ওঠা-নামার অসুবিধে হবে। তাই একটু সরিয়ে দেয়।
এম-এল-এ চেয়ারটা দেখে। তারপর সেটাকে আর-একটু কোনাকুনি করে নিয়ে বসে, পাশে মাটিতে তার ব্রিফকেসটা রেখে। বসে পড়তেই এম-এল-এর ডান পাশে সিঁড়ি, বাপাশে ঘরের দরজা, সামনে বারান্দা, আর কোনাকুনি মাঠটা পড়ে। ঠিক কোথায় বসলে সবটাই তার সামনে পড়বে এ যেন এম-এল-এ অভ্যেসেই ঠিক করে নিতে পারে।
সুহাস প্রিয়নাথকে বলে, একটু চা এনে দেয়া যাবে, প্রিয়নাথবাবু? সে তার ঘরের দিকে যায় পয়সা আনতে। প্রিয়নাথ তার পেছন-পেছন দরজার কাছে সুহাসকে ধরে বলে, স্যার, স্টোভটা জ্বালিয়ে বানিয়ে দেই স্যার? আমাদের ত রান্নাও চাপাত হবে।
জ্যোৎস্নাবাবু–বিনোদবাবুরা কোথায়, জানেন?
কাছাকাছিই আছেন কোথাও স্যার, চলে আসবেন। অনাথ একটু গেছে কাঁঠালগুড়ির মোড়ের দিকে, ওদের দেশের একটা দল নাকি ওখানে থাকে।
আচ্ছা, চা করুন তা হলে।
আপনি খাবেন ত স্যার?
দেবেন এক কাপ, সুহাস কিছু ভাবে, প্রিয়নাথ ফেরার জন্যে ঘুরলে বলে, এখনই রান্না চাপাবেন না, ওঁরা এসেছেন—
প্রিয়নাথ একটু অবাক হয়ে বলে, কেন স্যার?
ওরা কেন এসেছেন বুঝতে পারছি না ত, যদি আমাদের কাছেই কাজকর্ম থাকে।
প্রিয়নাথ একটু হেসে বলে, স্যার, তা হলে ত আপনার কোনোদিনই খাওয়া-ঘুম হবে না, এ ত লেগেই থাকবে।
প্রিয়নাথের হাসিতে অভিজ্ঞতার এমন ছাপ ছিল যে সুহাসকে মেনে নিতে হয়।
প্রিয়নাথ ফিরে যায়।
সুহাস ঠিক বুঝে উঠতে পারে না কী ভাবে তৈরি হবে। হতে পারে, এম-এল-এ তাকে কিছু কাগজপত্র দিয়ে যাবে। সুহাস রেখে দেবে। তারপর সুহাস ভাবে, রশিদও দেবে। এই কাগজগুলোর একটা আলাদা ফাইল করবে। কিন্তু এখানে ত আর অফিসের আর-কেউ নেই। সে নিজেই ফাইলটা রাখবে। যদি জবাব দেয়ার থাকে, জবাবও দেবে। সুহাস যেন বুঝতে পারে, ঐরকম একটা নিয়মকানুনের বেড়া ছাড়া সে নিজেকে বাঁচাতে পারবে না। সুহাস ফেরে। প্রিয়নাথের রাখা লণ্ঠনের লাল আলোতে মেঝেটা চকচক করছে, এম-এল-এর চেয়ারের পায়া আর এম-এল-এর বাঁ পায়ের ওপর ওপর তোলা ডান পায়ের আঙুলগুলোতে আলো পড়েছে। এম-এল-এ পা-টা নাচাচ্ছে বলে বারান্দার সিলিঙে লণ্ঠনের আলোটায় ছায়া পড়ছে আর আলো হচ্ছে। এম-এল-এর মুখটার ছায়া দেয়ালের কোনায় একটু লেগে বাইরে চলে গেছে।
.
০৪৩.
জমির আল ও এসেম্বলির মাথাধরা
এম-এল-এ সুহাসকে জিজ্ঞাসা করে, আপনার এখানে আর গোলমাল হয় নাই ত?
সুহাস একটু আলগা দাঁড়িয়েছিল। চেয়ারটা নিয়ে সে এম-এল-এর কাছে বসে না। আবার, চেয়ারটা এখন যেখানে আছে, সেখানেও যায় না। চেয়ার আর এম-এল-এর চেয়ারের মাঝখানে দাঁড়ায়, ভঙ্গিতে আত্মবিশ্বাস নিয়ে। যদি এম-এল-এ তার কছেই এসে থাকে তা হলে সেটা আগে বলুক। এম-এল-এর কথার জবাবে সুহাস বলে, না-আ, তারপর বোঝে আরো কিছু বলা দরকার, যোগ করে, আমাদের সঙ্গে আর কার কী গোলমাল হবে?
এম-এল-এ একটু জোরে হেসে ওঠে, এই আপনি ভাবছেন নাকি? আপনার সঙ্গেই তো গোলমাল।
কেন? আমাদের সঙ্গে আর গোলমাল লাগবে কি সে, এম-এল-এ কথাটা যে-হালকা চালে বলে সেটা সুহাসকেও ঘেঁয়; যেমন দেখব, তেমন লাইন টানব– এখানে আল, এখানে রাস্তা, এখানে গাছ।
