বাঘারু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে একবার বায়ে একবার ডাইনে ঘুরে নাচের মত নিজেকে দোলায়। আর সেই নাচের সঙ্গতিতেই একবার বায়ে, আর একবার ডাইনে, এ্যানং এ্যানং করি, বলে বলে হাতের লাঠিটা দিয়ে জঙ্গলে মারে, বর্ষার জঙ্গলের মাথা ভেঙে-ভেঙে যায়। কিন্তু বাঘারু যে-ছন্দে ডাইনে বায়ে দুলছে। আর যে-ছন্দে তার হাতটা ওঠানামা করে সেটা কিন্তু দ্রুত হয় না। বাঘারু তার হাঁটা বোঝনোর জন্য তাড়াতাড়ি হাঁটে, একটু, ছুটে-ছুটে যাওয়ার ভাব এনে। এম-এল-এর সঙ্গে দূরত্ব বাড়িয়ে বেশ কয়েকটা গাছের আড়ালে চলে যায় সে। তারপর থেমে পড়ে। তারপর সেই গাছগুলোর ভেতর একটা গাছের মতই একেবারে সোজা হয়ে দাঁড়ায় দুই পা ফাঁক, কোমর থেকে বুক ঠেলে জেগেছে, আবার কাঁধদুটো উঁচু থেকে ঝুঁকে পড়েছে সেই বুকের চড়াইয়ে। মুহূর্তের জন্য বাঘারুর পুরো আকারটা যেন সেই জঙ্গলে, গাছগুলোর ভেতর খোদা হয়ে যায়। কিন্তু পরমুহূর্তে সেই ক্ষোদিত মূর্তিটা ভেঙে ফেলে সে কোমর; ভেঙে নিচু হয়ে বলে, এ্যানং করিতে করিতে যেই মুই এক শালগুড়ির তলার ঝোঁপটাত এ্যানং করি খোঁচা দিছু, দিয়া আবার চলিবার ধইচছি, বাঘারু একটি পা ফেলে বোঝায়–সে চলে যাচ্ছিল, অমনি পাছতঠে এ্যানং করি একখান বাঘ আসি মোর পাছত এক পা আর ঘাড়ত এক পা দিয়া মোর ঘাড়খানের বগলত অর হাঁ করা মুখোন নিয়া আসিছে, উঃ কি গন্ধ বাঘের মুখত। এম-এল-এ ঐ গল্পটার দিকে এগচ্ছিল। দাঁড়িয়ে পড়ল।
বাঘারু নাকে হাত দেয়, পরমুহূর্তে আবার সোজা হয়ে বলে, বাঘায় হামাক ঠেলিবার ধরিছে, ফেলি দিবার চাহে আর মুই পাও দুইখান গর্ত করি মাটির ভিতরত সিন্ধাবার চাহি, খসা ঝরা পাতায় য্যান মোর পাও দুইখান পিছল না খায়, পড়িলে ত সর্বনাশ আর এ্যানং করি ঘুরি গিয়া মোর ঐ দেড়হাতি লাঠিখান বাঘারুর মুখের ভিতর সিন্ধাই দিয়া দুই হাতত ঠেলিবার ধরিছু–কায় কাক ফেলিবার পারে–বাঘ মোক না মুই বাঘক, প্রায় দমবন্ধ করে বাঘারু বলে, চলিছে, ঠেলাঠেলি চলছে, আর, তারপর সে কেমন পেঁচিয়ে ঘুরে যায়, যেন তার পেছনে, তার পিঠের ওপর এখন সত্যিই বাঘ থাবা গেড়েছে, আর তার সেই মুচড়ে যাওয়া শরীরে সে দুই হাতে দুদিক থেকে বাঘের মুখের ভেতর আড়াআড়ি ঠেকানো লাঠিটা ঠেলছে, ঠেলছে। ফরেস্টের এই আবছায়ায় তার সেই স্থির অথচ প্রচণ্ড বেগের মূর্তিকে যেন দুর্গাপ্রতিমার অসুরের মূর্তি মনে হয়–কিন্তু অসুরের মত ত সে পিঠটা বাকাবার জোর পায় না, অসুরের মত ত সে বুকটা চিতিয়ে দাঁড়াতে পারে না। দুটো হাতের ওপর তার মোচড়ানো শরীরের সমস্ত ওজন, লাঠিখান একটু ঢিলা হবা ধরিলেই ত বাঘ মোর ঘাড়ত দাঁত বসাইবে, আর, দুই পা যেন একটুও না টলে, মোর ত জানা আছে আপলাদ ফরেস্টের জমিখান ঐঠে নরম, কুনতিঝরার জলকাদায় আর পাতাপচায়। বাঘা ত আর আপলাদের জমি চিনে না। মুই চিনো। কিন্তু পা দুইখান পিছলি যাবারও পরে ত–তাই গোড়ালিখন শক্ত করি দিছু। আবার, সেই শক্ত পায়ের চাপে মাটি কাপে, বাঘা মুখোন এদিক-ওদিক করিবার ধরিছে, বাঘারু নিজের মাথা ঝাঁকিয়ে বোঝায়, কিন্তু মুই ত আর না পারো, মোর হাঁটুখান ভাঙি যাছে যেন হাঁটু ভেঙে যাচ্ছে এমন একটা ভাজের মত আভাস আসে কোমরে, কাথাটা হইল,কায় আগত পড়ি যাবে, মুই না বাঘায়। যায় পড়িবে স্যায় হারিবে, ব্যস, মুই য্যালা ধরি নিছু মুই পড়ি যাম-যাম, এই মোর হাটুখান–ডান হাঁটুখান-ভাঙি গেইল-গেইল, আর পারিলো না হে, মুই বাঘারুর প্যাটত গেইল, গেইল হে, স্যালায়, ঠিক স্যালায়, বাঘান মোর ঘাড়ঠে আর পাছাঠে থাবাখান চট করি নামি নিল আর মোর দুই হাতত মোর দেড়হাতি লাঠিখান ধরা, মোর হাতটাও নামি যাছে, নামি যাছে, বাঘারু নিচু হতে-হতে দেখায় সেও কেমন বাঘের দিকে নেমে যাছে, স্যালায় মুই বুঝি গেইলু, আরে, আরে, বাঘাখান ত মোক ছাড়ি দিছে, ব্যাস, যেই বুঝিনু–সড়াত করি লাফ দিয়া সামনের গাছটাত চড়ি গেইল, চড়ি গেইল।
বাঘারু লাফ দিয়ে গাছের ডাল ধরে ঝুলে ডান পা-টা তুলে ডালের ওপর রেখে বা-পা-টা তোলার ভঙ্গি করে, তার বাদে আরো উপরত উঠিবার ধরি, নিচু হয়ে দেখায় তরতর করে ডাল বেয়ে ওপরে উঠল, একেবারে উপরত গিয়া চাহি দেখি, একটু ঝুঁকে, দেখার ভঙ্গি করে, যেন তলায় বাঘ, আর সেই গলের ওপর বসে হেসে কুটিপাটি হয়, সে হাসি আর থামো না, মোর ঐ দেড়হাতি লাঠিখান এ্যানং করি বাঘারুর মুখত চাপি গেইছে যে বাঘারুর সঁতের ফাঁকত লাঠিখান সিন্ধি গেইছে। আর বাঘা বাহির করিবা পারে না, শুধু মাথা ঝাঁকাছে ত ঝাঁকাছে, এ্যানং এ্যানং করি, বাঘারু দাতে লাঠিটা বাঘের মত মাথা ঝাঁকায়, স্যালায় মুই উপরের ডালঠে য্যালায় একখান বড় বাঘারুর মতন আওয়াজ ছাড়িছু-হালু-ম–স্যালায় ঐ বাঘা দাঁত কাঠিখান নিয়া চো চা দৌড়, দৌড়, দৌড়, দৌড়। বাঘারু আবার কিছু হেসে নেয়।
ব্যস। বাঘা গেইল অর বাড়ি। আর মুই জলপাইগুড়ির হাসপাতাল এ্যানং করি–কায় জানে ছয় মাস না দুই মাস। একখান চাষও চলি গেইল, মোর হালও চলি গেইল–সে দেখায় কী ভাবে শুয়ে ছিল।
সেইঠে মোর নাম হয়া গেইল বাঘারু। বাঘাখানক মুই হারি দেছু, স্যালায় মোর নাম হইল বাঘারু। যায় জেতে তার নামখান ত একড় [রেকর্ড] হয়। বাঘাখানা মোক মারিলে ঐ জায়গাখানের নাম ধরিত বাঘাথোয়া। তা, ধরো কেনে, পুরা একখান পালাটিয়া গান বান্ধ্যা হয়্যা গেইল-কুড়ানির ছোঁয়া, কুড়ালিয়া-কোটা, বাঘারুয়া, ফরেস্টুয়া, চন্দ্র বর্মন।
