তা তোর নামখান শেষ হইল কুনঠে?
ঐটাই ত কাথা। মুই ত সবখান নামই রাখি দিছু–ফরেস্টারচন্দ্র বাঘারুবর্মন। বর্মন এইঠে অনেক মিলিবে, ফরেস্টচন্দ্রও অনেক পাবেন, রায় বর্মনও আছে, কিন্তু বাঘারু-বর্মন এই একোখান। নামখান। এ্যানং বড় হয়্যা গেইল যে ঢলঢলাছে, খলখলাছে, খুলি-খুলি যাছে।
ত মানষি ত তোমার নামখান কাটছাট করি টাইট করি নিসে?।
ক্যানং?
সগায় ত তোমাক বাঘারুই ডাকে, তুমিই ত এ্যালায় নামখান বড় করিবার ধরিছেন।
হে-এ এমেলিয়া বাবু। তোমরালার ক্যানং কাথা? আরে বাঘারুখান ত মোর নাম না-আছিল। মানষিলা দিসে–
তার আগত কী আছিল?
কহিছু না, ফরেস্টারচন্দ্র বর্মন। তার আগতও আছিল একখান।
তার আগতও তোমার নাম আছিল?
আছিল ত। মোর জন্মিবার আগতও মোর একখান নাম আছিল।
জন্মিবার আগত?
হয়। হয়। মোর ত একখান মা আছিল। হয়।
তা ত থাকিবার নাগেই হে।
ত মুই এখান এ্যানং চায়ের বাগানের ফ্যাক্টরির চোঙের নাখান মানষি। মোর এখান মা না থাকিলে চলে? মা না থাকিলে মুই আসিম কুনঠে?
ত ঠিকই। কোটত আছিল তোমার মাও?,
মোর মাওখান ত গয়ানাথেরই আছিল। কাজকাম করিত। খোয়া খাইত। আর ফরেস্টের ভিতরত গিয়া শুখা কাঠ, ডালপালা কুড়ি আনিবার নাগিত। আস্ত-আস্ত ডাল। আস্ত-আস্ত গাছ। আনি গয়ানাথের খোলানে পাঞ্জা করি রাখিত। দিন নাই, রাতি নাই, কাঠ কুড়ি যাছে, কুড়ি যাছে। য্যালাই পাহাড়ের নাখান উচা হবার ধরিত, গয়ানাথ একখান ট্রাক ধরি আনি বেচি দিত। মুই য্যালায় মোর মাওয়ের প্যাটত আসিছু, প্যান্টের ভিতরত আসি গেইছু, মাওয়ের প্যাটখান বড় হওয়া ধরিছে, সগায় জানি গেইছে মুই আসিম, মুই আসিম, স্যালায় সগায় মোক ডাকিবার ধইচছে–কুড়ানিয়ার ছোঁয়া–
ত, এইখান তোমারালার প্রথম নাম।
তার আগত মোর নামখান আর আসিবে কোটত। কিন্তু মুই মাওয়ের প্যান্টের ভিতর ত বড় হওয়া ধইচছি আর মাওয়ের প্যাটখান এককেরে ঢাক হয়া যাছে, ফাটি যাবে কি যাবে না, সেই টাইমত একদিন বাঘারু ঘুরে এম-এল-এর মুখোমুখি দাঁড়ায়, মাওয়ের মোর প্রসববেদনা উঠিবার ধরিছে। মুই জন্মিবার ধইচছি। মাওয়ের প্যাটখান ফালা ফালা করি বাহির হওয়া ধইচছি। আর মাওখান মোর জমিত লুটাপুটি খাছে, লুটাপুটি খাছে–
বাঘারু তার কোমর বরাবর জঙ্গলের দিকে তাকিয়ে, যেন ওখানে ওর মা এখনো ছটফটায়। তার সেই দেখাটা চলতে থাকে নিজের জন্ম দেখা পর্যন্ত। তার থেকে কয়েক হাত দূরে এম-এল-এ সেই জায়গাটার দিকে তাকিয়ে থাকে।
মুইত বাহির হয়্যা গেছু। মাওয়ের প্যাট থিকা বাহির হয়্যা গেছু।
আবারও তাকে চুপ করতে হয়–মাটির ওপর শ্রান্ত মা ও নতুন বাচ্চাকে দেখতে। দেখা শেষ হলে, ফিস ফিস করে বলে, মুই ত এ্যানং কান্দিবার ধরিছু যে জঙ্গলের গাছঠে পাখি উড়ি গেইসে, সেই শালগাছ থেকে ওড়া পাখিদের দেখতে ও আকাশে চোখ তোলে। এম-এল-এও ঘাড় ভেঙে ওপরে তাকায়, যেখান থেকে আকাশ ভেঙে বনস্পতি মহীরুহ নেমে আসছে। বাঘারু দেখে, পাখিগুলো আকাশে পাক দিচ্ছে, শালগাছের মগডালে বসছে, আবার উড়ছে, পাক দিচ্ছে। সেই পাখিদের তীক্ষ্ণ ডাক ওপরে। আর সেই বাচ্চার তীক্ষ্ণ কান্না নীচে। ঐ নিস্তব্ধ ঝিঁঝি-ডাকা বনান্ত তোলপাড়। বাঘারু খুব গোপনে বলে, মূই কান্দি আর পাখি চিল্লায়। পাখি চিল্লায় আর মুই কান্দি। কিন্তু নাড়ী কাটিবে কায়? ক্যানং করি? বাঘারু চোখ তোলে না। বনতলে নাড়ীতে বাধা এক মা ও এক শিশু বিচ্ছিন্ন হয়ে আছে।
মোর মাও-এরঠে একখান ছোট কুড়ালিয়া আছিল। এই ধরো কেনে, ডাল কাটিবার তানে। সারাদিন ত কাটাকুটি চলিত। ধারও আছিল চকচকা। ঐ ছোট কুড়ালিয়াখান দিয়া মাও নিজের। নাড়ীখান কাটি দিল। ব্যস। কাটি দিল। বাঘারু তার বুক ও বাহুর দিকে তাকায়, ফিরে-ফিরে তাকায় আর এম-এল-একে দেখায় যেন তার এই সাবালকতা সদ্য, ঐ নাড়ীকাটার পরই। তারপর বলে, একটু হাসি মিশিয়ে, ওর তানে ত সগায় মোক কহিত,কুড়ালিয়া-কাটা। ত দেখো কেনে, জন্মিবার আগতঠে মোক নিয়া একখান পালাগান বান্ধা হওয়া ধরিছে–কুড়ানিয়ায় ছোঁয়া। কুড়ালিয়া কোটা।
বাঘারু আবার হাঁটতে-হাঁটতে, জঙ্গল সরাতে-সরাতে বলতে শুরু করে, রাবণের যেইলা গরু আর মহিষ, গয়ানাথের স্যানং বাথান। গয়ানাথের য্যানং গরুর বাথান, মহিষের বাথান, স্যানং গয়ানাথের মানষির বাথান, স্যানং গয়ানাতের জমির বাথান। য্যানং এই পৃথিবীর তামান মানষি গয়ানাথের আধিয়ার আর হালুয়া, এই পৃথিবীর তামান গরু আর মহিষ গয়ানাথের বাথানের গরু আর মহিষ, স্যানং এই পৃথিবীর তামান জমি গয়ানাথের জমি, তামান ফরেস্ট গয়ানাথের ফরেস্ট, ফরেস্টের ভিতর য্যালা হাতি আর বাঘ স্যালায় গয়ানাথের হাতি আর বাঘ–
ত এ্যানং একোদিন, আপলাদের ফরেস্টের ভিতরঠে দুপহরের টাইম মুই আসিবার ধরিছু। মনত না আসে কোটত আসিছু, কোটত যাছু। কিন্তুক কোটত-না-কোটত ত যাছুই। আপলাদের ফরেস্ট ত মোর ধরো কেনে গয়ানাথের খোলানবাড়ির নাখান। কত কাজ এইঠে থাকিবার পারে। ঐঠে গয়ানাথের চষিবার জমি আছে। চড়িবার গরু আছে। হালুয়া আর রাখোলিয়া মানষি আছে। মুইও আছি। ত মনত নাই এ্যালায়–কোটতঠে কোটত যাছি। কিন্তু হঠাৎ এক শালগুড়ির আড়ালঠে– না, কাথাটা ঠিক না হইল! মোর হাতত আছি একখানা গঠিয়া লাঠি। ধরো, এই দেড়হাতি একখান গাটিয়া লাঠি, এই লাঠিটার ঠে ছোট। মুই ত যাছি। আর, একবার এদিক, একবার ওদিক ঝোঁপ ঝাড়ত লাঠি চালাছি। এ্যানং এ্যানং করি।
