জিপ গাড়ির পেছন থেকে, গাড়ির ভেতরে ঝাঁকুনি খেয়ে লাফাতে-লাফাতে, কাত হয়ে, হোঁচট খেয়ে বাঘারু তার এই চিরকালের ফরেস্টটাকেই অচেনা হয়ে যেতে দেখে, যেমন সে দেখে যখনই কখনো এরকম গাড়িতে দেউনিয়া তাকে তুলে দেয়। আসিন্দিরের ভটভটিয়ার পেছনে তাকে বসালে এরকম লাগে না। তখন ত সবই সামনে, তার বুকের সামনে। তাই, গাড়িটা থামার পর, প্রথমে ফাগু লাফিয়ে ও তার পরে এম-এল-এ ব্রিফকেসটা নিয়ে একটু ঘষটে, নেমে গেলেও বাঘারু নামতে পারে না। ফাগু আর এম-এল-এ নেমে যাওয়ার মানে যে তারও নামা–এই অভ্যস্ত প্রয়োজনীয় বোধটাও অর লোপ পেয়ে বসে থাকে মোটর গাড়িতে গতিতে অতিক্রান্ত দূরত্বটুকু বুঝতে। এত তাড়াতাড়িই কি ফুলবাড়ির নদীর পারে পৌঁছে যাওয়া যায়? এ যেন ফরেস্টটাকে টেনে ফুলবাড়ির নদীটার কাছে আনা। চারপাশের বনজঙ্গলের যে-পরিচয় অন্তত বাঘারুকে কিছু আশ্বস্ত করতে পারত–তাও এই জিপের আড়াল থেকে অদৃশ্য।
বাহাদুর হঠাৎ গিয়ার বদলে সঁ-আঁ করে জিপটা পেছিয়ে নেয়। তখন ফরেস্টটা বাঘারুর সামনে, সবটুকু দেখতে না পেলেও, সামনেই। ফরেস্টের ভেতরে সেই ঢুকছে, ফরেস্টটা স্থিরই আছে–এই বোধটুকু সে অন্তত ফিরে পায়।
কিন্তু পরক্ষণেই বাহাদুর আবার একটা ধাক্কায় সামনে এগিয়ে যায়। বাঘারু হুমড়ি খেয়ে পড়ে। গাড়িটা সবটুকু ঘুরিয়ে আনন্দপুর ফিরে যাওয়ার জন্য দাঁড় করিয়ে বাহাদুর ঘাড় না-ঘুরিয়ে বলে, উতরো।
তখন বাঘারুর সামনে, একটু দূরে, ব্রিফকেস হাতে এম-এল-এ আর ফাগু। গাড়িটা ঘুরে দাঁড়াতেই ফাগু ছুটে এসে সামনের সিটে বসার পরও বাঘারুর জিপ থেকে নামা শেষ হয় না। সে, বাহাদুরের কথা শোনামাত্র দাঁড়িয়ে পড়েছিল। মাথায় ঠোক্কর খেয়ে বসে পড়েছে। তারপর ঘষে-ঘষে ঐ পেছনের ডালাটার কাছে এসে এক পা বের করে। কিন্তু সে পা মাটিতে রাখার আগেই জিপ গাড়িটা হু-স করে বেরিয়ে যায়। ফাগু পেছন ঘুরে লাল সেলাম বলে এদিক-ওদিক ঘাড় ঘোরায়, কিন্তু এম-এল-এ-কে পায় না। তখন রাস্তা জুড়ে বাঘারু দাঁড়িয়ে। পেছন থেকে এম-এল-এ ডাকে, চলেন ভাই, ঝট করি নদীখান পার করি দেন।
জিপগাড়ি যখন আর দেখা যায় না, তখনো আওয়াজ আসছে। বাতাসে পেট্রলপোড়া গন্ধ। বাঘারু হাঁটতে শুরু করে। পেছনে এম-এল-এ। বাঘারু একটা ছোট ডালকে লাঠি বানায়। সেটা দিয়ে দু-পাশের জঙ্গল সরায়। একটুখানি বন পেরলেই মাঠ। মাঠ পেরলেই নদী। নদী পেরলেই ফুলবাড়ি।
.
০৪১.
মায়ের বাঘারুপ্রসব, বাঘারুর ব্যাঘ্ৰনিধন ও এম-এল-এ তরণ এবং বাঘারুর প্রথম সংলাপ নিয়ে আদিপর্বের শেষ অধ্যায়
কয়েক-পা যেতেই বনের গন্ধ সারা শরীরে ভর করে। ঝিঁঝির ডাক ক্রমে বাড়ে। দুজন দুজনের নিঃশ্বাসের শব্দ শুনতে পায়। যেন, এরকম অনেকক্ষণ হাঁটতে হবে, ওদের, যেমন হয়, বনে।
এম-এল-এ পেছন থেকে জিজ্ঞাসা করে, তোমরালার নামখান কী হে?
বাঘারু তার হাতের লাঠিটা দিয়ে সামনের জঙ্গল সরাতে-সরাতে বলে, ঐখান ত বড় লজ্জার কথা বাবু।..
কোনখান?
ঐ। মোর নামখান।
ধুত, নামতে আর লজ্জা কী আছে? নাম ত নামই।
মোর নামখানি বাড়ি যাছে।
কায় বাড়ি যাছে?
যত টাইম যাছে, মোর নামখান সলসল করি বড় হয়্যা যাছে। এ্যালায় এ্যাতখান বাড়ি গেইছে যে ঐ নামখানে মুই আর আটো না। ঢলঢলাছে।
ত নামখান ক কেনে, শুনি।
কছি, এমেলিয়া বাবু। কিন্তু তোমাক মোর নামটা ছোট করি দিবার নাগিবে। য্যানং সগার নাম ছোট হবার ধরে, মোর নামখানও ছোট হওয়া নাগিবে।
বাঘারু খুব নিচু গলায় কথা বলছিল। আর লাঠিটা দিয়ে সামনের জঙ্গলটা সরাতে-সরাতে এগচ্ছিল। এম-এল-এ দেখে, জঙ্গলটা যেন কোনো সময়ই বাঘারুর কোমর ছোয় না। সে যেন মাঠের ওপর দিয়ে হাঁটছে, এমনি তার হাঁটা, আস্তে-আস্তে। বাঘারুকে চালু রাখতে এম-এল-এ একটু অন্যমনস্ক গলায়ই বলে, নামখান আবার কার ছোট হইল রে?
সগারই ত ছোট হয় বাবু, মোরখানই এক বাড়ি যাছে। ধরো কেনে, মোর দেউনিয়া গয়ানাথ রায়বর্মনখান হয়্যা গিছে গয়া-জোতদার–
এম-এল-এ খুক করে হেসে ফেলে, আর?
ধরো কেনে, রাধাবল্লভখান হয়্যা গিছে রাধু-লিডার
এম-এল-একে এবার আর-একটু বেশি হাসতে হয়, আর?
ধরো কেনে, তোমার নামখানও ত ছোট হবার ধরিছে। ছোট হয়্যা যাছে, আর বাড়িবে না।
কেনে?
আগত আছিল বীরেন্দ্রমোহন রায়বর্মন, এ্যালায় হছে এ্যামেলিয়া।
ধুত, এইটা কি নাম নাকি, এইটা ত কাম।
ঐ ঐ বাবু, কামতই ত নামখান হয়। মোর ত সেইটাই গোলমাল। হাজারিয়া কাম। হাজারিয়া নাম। কামও বদলি যাছে, নামখানও বাড়ি যাছে। এক কামের পরে আরেক কাম, এক নামের পর আরেক নাম।
এম-এল-এ বলে ওঠে, তায় তোমাক মালষিলা ত বাঘারুই কয়?
মুখ না ফিরিয়ে চলতে-চলতে বাঘারু বলে, মানষিলা ত মোক বাঘারু নামখান দিয়াই খালাশ, কিন্তু মুই লাগাম কুনঠে? মানষিলা জানে না, মোর আর-একখান নাম আছিল। গয়ানাথ দিছে।
গয়ানাথ নাম দিছে?
হয়। গয়ানাথ ত মোক নাম দিয়ে বাবু। গয়ানাথ মোর মাও-এর দেউর্নিয়া, মোর দেউনিয়া, জমির দেনিয়া, ফরেস্টের দেউনিয়া, তিস্তা নদীর দেউনিয়া, ভোটের দেউনিয়া। ত ধরো, এ্যানং একখান ভোটের আগত কহিল, হে বাউ, ভোটত তয় নামখান দিয়া দিছু। ত মুই পুছিলো, কী মোর নামখান। ত কহিল, ফরেস্টচন্দ্র বর্মন, মনত রাখিস ফরেস্টচন্দ্র বর্মন। ত মুই মনত রাখি দিছু ফরেস্টচন্দ্র বর্মন। মনত রাখি ভোট দিছু–গয়ানাথের ভোট। কিন্তু তার বাদে একেদিন সাহেব দেখিলো–পায়ে গামবুট, মাথায় টুপি, মিলিটারির নাখান ফরেস্টারসাহেব ফরেস্টের ভিতর হাঁটিছে, য্যান মাখনা হাতি। ত মুই মোর নামখান বদলি ফরেস্টার করি নিছু, মোর পাকা নাম। লিখা আছে ফরেস্টচন্দ্র বর্মন। কিন্তু মুই কহি ফরেস্টারচন্দ্র বর্মন। এম-এল-এ ততক্ষণে বাঘারুর পেছনে। তাকালে সে দেখতে পায়, বাঘারুর উদোম পিঠে ও পাছায় নানা দাগ–গাছের কাণ্ডে ফাটা-ফাটা যেমন কত দাগই থাকে।
