ওরা ওদলাবাড়ি যাওয়ার রাস্তাটার মুখের দিকে এগচ্ছিল–ফরেস্টের ভেতর দিয়ে যে বড় রাস্তাটা ওদলাবাড়ি গেছে। দূর থেকে দেখাই যাচ্ছিল রাস্তাটার মুখে আনন্দপুরের জিপটা দাঁড়িয়ে। গয়ানাথ জোতদারও কাছেই দাঁড়িয়ে ছিল। সে এম-এল-একে আসতে দেখে দু-পা এগিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।
সেই মোড়, জিপগাড়ি ও গয়ানাথ কাছাকাছি আসতেই পেছন থেকে বীরেনবাবু বলেন, কী ফাগু, বাগানের জিপ ত দাঁড়িয়েই আছে।
ফাগু সঙ্গে-সঙ্গেই ঘুরে বীরেনবাবুকে বলে, হ। কমরেডকো পৌঁছ দোও, ফুলবাড়ি বস্তি। এই ঘোরার ফলেই ফাগুর বাহু থেকে এম-এল-এর হাত খসে যায়।
বীরেনবাবু একটু হেসে বলেন, তা হলে বাহাদুরকে ডাকো।
বাহাদুর জিপের পাশেই মাটিতে বসেছিল বলে তাকে দেখা যায় নি। সে উঠে দাঁড়াতেই বীরেনবাবু বলেন, বীরেনবাবুকে ফুলবাড়ি ছেড়ে দিয়ে এসো।
এম-এল-এ বলে ওঠে, আরে এইটুকু ত হাঁটিই চলে যাব, তার উপর বস্তি পর্যন্ত ত আর গাড়ি যাবে না, মাঝখানে ত নদী।
গয়ানাথ জিপের সামনের সিটের দিকে আঙুল তুলে বলে, উঠেন, উঠেন, ঐ নদী পর্যন্ত গাড়িতে যান, তার বাদে নদী পার করি দিবে–হে-এ বাঘারু।
যখন আঙুল তুলল তখন মনে হল গয়ানাথ জিপটার মালিক, যখন কথা বলল তখন মনে হল এম-এল-এর মালিক আর যখন বাঘারুকে ডাকল তখন মনে হল বাঘারুর মালিক।
গাড়িটা পেরিয়ে রাস্তার মুখে এলে বীরেনবাবু সামনের সিট দেখিয়ে বলেন, নিন, ওঠেন। কী, ফাগুও যাবে নাকি?
হাঁ, জরুর–এম-এল-এ উঠে ব্রিফ কেসটা কোলের ওপর তুলে একটু ডাইনে সরে জায়গা দেয়, ফাগু সামনের সিটে বসে। গয়ানাথ এগিয়ে এসে বলে, এই যাচ্ছে, মোর মানষি। আপনাকে নদীখান পার করি দিয়া, ফুলবাড়ি পৌঁছাই দিয়া, আসিবে।
এম-এল-এ বাঘারুকে ঠিক দেখে কিনা বোঝা যায় না। গয়ানাথ বলে, হে-এ বাঘারু, পাছত ওই কেনে।
জিপগাড়িটা তখন স্টার্ট দিয়ে তৈরি। এতই লম্বা বাঘারু যে সে মাটি থেকে পা তুলেই জিপের ভেতর ঢুকে যেতে পারত। কিন্তু পায়ের দৈর্ঘ্য আর জিপের উচ্চতার তুলনা ত কোনোদিনই তার অভিজ্ঞতায় আসে নি। তাই জিপ গাড়িটা যেন একটা পাহাড়, তাতে উঠতে বাঘারু পেছনের লোহার ডালাটার ওপর দুই হাতে শরীরের ভর দিয়ে ভেতরে গলে যেতে চায় কিন্তু তার মাথা ছাতে ঠেকে যায়। আর তখনই গাড়িটা চলতে শুরু করলে বাঘারু প্রায় হুমড়ি খেয়ে ঐ ঢাকনার ওপরই পড়ে। কিন্তু পড়তে-পড়তেই তাড়াতাড়ি হাতের ভরে উঠে, পা দুটো উঁচু করে, ডান হাঁটু ঐ রেলিঙের ওপরে তুলে দিতে পারে। ফলে রেলিংটার ওপরই বসে পড়ে। বাঁ পায়ের পাতা রাস্তায় ঘসে। তখন সে জিপের ভেতর গড়িয়ে যায়। তার লম্বা, পেশল, নগ্ন, রোমহীন, বা পাটা জিপের পেছনে শূন্যতার ফ্রেম জুড়ে অনেকক্ষণ থাকে। তার মাটিলেপা, থ্যাবড়া, হুকওয়ার্মের ফুটোয় দাগি পায়ের তলাটা খুব শাদাসিধে সোজা টাঙানোই যেন, ওখানে, পোস্টারের মত। আর ঐ পাটা অমনই যেন থাকার কথা ওখানে। নিজেকে টেনে হিঁচড়ে ভেতরে ঢোকাতে থাকে বাঘারু, যতক্ষণ তার মাথা সামনের সিটের পেছনে গিয়ে ঠেকে না যায়। আর নুড়িছড়ানো বর্ষার রাস্তার খানা-খন্দে লাফিয়ে-লাফিয়ে হেলেদুলে, কাতরে-বেঁকে জিপ গাড়িটা পাহাড়ের ঢাল বেয়ে গড়ানো বোল্ডারের মত বেতালে-বেচালে গড়িয়েই যাচ্ছিল। তাতে বাঘারুর এই ঝাপানো আর গড়ানো টেরই পাওয়া যায় না। শুধু বাহাদুর একবার টেরিয়ে দেখে নিয়েছিল। জিপের অতটুকু জায়গায় নিজের অতবড় শরীরটাকে সেঁদিয়ে, কাত হয়ে, উপুড় হয়ে, হাঁটু আর হাতের পাতার ওপর ভর দিয়ে উঠে, বসে, শেষে আবার ঘুরে বাইরের দিকে তাকানো–এমনিতেই মেহনত ও কৌশলের ব্যাপার, তদুপরি জিপের ঝাঁকুনিতে প্রায় অসম্ভবই হয়ে উঠতে চায়। শেষ পর্যন্ত জিপের মেঝেতে বসে, পেছন ফিরে, পেছন থেকে ফরেস্টের দিকে তাকাতে পারে বাঘারু।
এমনভাবে ফরেস্টেকে ত আর দেখে না, ফরেস্ট সব সময়ই প্রথমে বাঘারুর সামনে, তারপরে সে ফরেস্টের ভেতরে, তারপরে ফরেস্ট তার সব দিকে-ওপরে-নীচে, ডাইনে বায়ে, সামনে-পেছনে, শেষ পর্যন্ত ফরেস্ট তার গায়ের সঙ্গে মিশে যায়। এমনি হয়ে আসে বরাবর। কিন্তু পেছনে বসে ফরেস্টের উঁচু-নিচু, মাথা-গোড়া, কোনো কিছুই দেখতে পাচ্ছে না। সেই আড়াল থেকে ফরেস্ট দুপাশে হু-হুঁ গলে গিয়ে রাস্তা বানিয়ে দিচ্ছে। ফরেস্ট স্থির থাকে, পাহাড়ের মত, আর বাঘারুই সেখানে ঢোকে। জিপের পেছনে সেই স্থির, ফরেস্ট তার দুপাশ দিয়ে সরে যায়। যেন ফরেস্টের ভেতর সে ঢুকছে না–ফরেস্টের ভেতর এই কাল রাস্তাটা সিদচ্ছে। পেছনে যতদূর চোখ যায় কাল রাস্তাটা লম্বা থেকে লম্বা হয়ে যাচ্ছে, আরো লম্বা। বাঘারু একটু বেশি লম্বা বলেই হয়ত তার চোখ একটু ঠেকে যায় সামনের ফাঁকটার ওপরে। তাই সে গাছের মাথা দেখতে পায় না। শুধু তাই নয়, তার মনে হচ্ছিল যেন এই বনের তলার জংলার ভেতর দিয়ে একটা পাতালের মত বনে সে ঢুকে যাচ্ছে। পাতালের মত বনে-যেখানে বনের মাথা দেখা যায় না, শুধু তলা দেখা যায়।
এই কি ফরেস্টারচন্দ্র বাঘারুবর্মনের ফরেস্ট? এর ত কোনো কিছুই সে চিনতে পারছে না, কোনোদিন যে এই ফরেস্টে সে ছিল তাও যেন মনে হচ্ছে না। অথচ চোখ বেঁধে ছেড়ে দিলে, বর্ষার এই জংলায় আর লতায় পা-জড়িয়ে যেতে পারে বটে, কিন্তু বড়, পুরনো কোনো গাছের সঙ্গে ঠোক্কর খাবে না, নিশ্চয়ই। এখন জিপের ভেতর থেকে, পেছনে সে বুঝতেই পারছে না, কোন দিক দিয়ে কোথায় যাচ্ছে।
