এম-এল-এ-কে দেখা যাওয়ায় ওপরের লোকজন সব উঠে দাঁড়িয়েছে ও মারামারি হতে-হতে–হওয়ার ফলে যে-একটা সাজানোগোছানো ভাব এসেছিল সেটা ভেঙে গেছে। ওদের কাছাকাছি আসতেই গয়ানাথ পেছন ফিরে বাঘারুকে বলে, যা, ঐ দিক দিয়া উঠি আগত চেয়ারখান পাতি দে।
বাঘারু আল থেকে লাফিয়ে নীচে নামে, সেই বিধ্বস্ত ধানখেতে, তারপর ছোট আল দিয়ে এগিয়ে আবার বড় আলে উঠে, ঐ ভিড়টার কাছে পৌঁছয়। বাঘারু ভিড়ের পেছন দিয়ে ঢুকেছে। আর ভিড়টা সোজাসুজি এম-এল-এর দিকে মুখ করে আছে। ফলে, বাঘারুকে পেছন থেকে চেয়ারটা মাথায় নিয়ে ঠেলে-ঠেলে একেবারে ও-মাথায় ভিড়টার সামনে গিয়ে পৌঁছতে হবে, এম-এল-এ ওখানে পৌঁছনোর আগেই। এদিকে ভিড়ের পেছন থেকে বাঘারু যাকেই ঠেলা দেয় সেই হে-ই বলে চিৎকার করে ওঠে। ঢাকবার জায়গা আর বাঘারু পায় না। কিন্তু সে দেখতে পাচ্ছে এমেলিয়া ওদিক দিয়ে উঠতে শুরু করেছে। বাঘারু এতক্ষণ চেয়ার মাথায় ঢোকবার পথ খুঁজছিল, কারণ ফাঁক না পেলে লোকজনের মাথায়-ঘাড়ে চেয়ারের ধাক্কা লাগতে পারে। কিন্তু এখন, যখন দেউনিয়া এমেলিয়াকে নিয়ে প্রায় পৌঁছে গেছে তার আর-কিছু করার থাকে না। সে চেয়ারটা মাথা নিয়েই পেছন থেকে ঢুকে পড়ে। হে-ই, হে-ই, কায় রে হেই, হেই, বলতে বলতেই একটা গোলমাল পড়ে যায়। কিন্তু সঙ্গে-সঙ্গেই সবাই তাকিয়ে চেয়ারটা দেখে ফেলে সরে ফাঁক করে দেয়। লোকজন পেছনে চেয়ারের দিকে একবার আর সামনে এম-এল-এর দিকে একবার ঘাড় ঘোরায়। বাঘারু যখন প্রায় হাত দুয়েক দূরে, তখন এম-এল-এ দাঁড়িয়ে পড়েছে, আর, হাত দুয়েক দূর থেকেই বাঘারু চেয়ারটা মাথা থেকে নামিয়ে হুমড়ি খেয়ে এম-এল-এর সামনে চেয়ারটা মাটিতে রাখে। এম-এল-এই আচমকা দুপা পেছিয়ে যায়।
শালো, বলদ, চেয়ারের ওপর মানষি বসিবে, না মানষির উপর চেয়ার ফেলাছিস? চেয়ারটার মাথায় হাত দিয়ে এম-এল-এ দাঁড়ায় আর বাঘারু যেখানে দাঁড়িয়ে চেয়ারটা নামিয়েছিল সেখানটাতেই দাঁড়িয়ে থাকে–তার নেংটিপরা ঢ্যাঙা শরীরটা নিয়ে। যদি বাঘারু ছোটখাট হত, বা অন্তত একটু রোগা, ভিড়ের ভেতর দাঁড়ালেও যদি ওকে দেখা না যেত, যদি মিশে যেত ভিড়ের সঙ্গে, তা হলেও তাকে খেয়াল না করে থাকা যেত। কিন্তু এই বাঘারুটা ত একটা পুরনো শাল-গাছের মত–তার শ্যাওলা-ছাতাধরা শরীরে সবাইকে আড়াল করেই তাকে দাঁড়াতে হয়। এমনকি তার নেংটিটাও তার শরীরের সঙ্গে এমনই মিশে আছে যে বাঘারু যেন সত্যি একটা গাছই। কৃষক-মজুরের সমাবেশেও বাঘারু বেমানান। এখানে চা বাগানের মজুররা আছে। তাদের হাফপ্যান্ট, গেঞ্জি। কারো কারো নাইলনেরও। মাথায় তেল ও কাল চুল আঁচড়ানো। ধুতি পরাও যারা, একটু বয়স্ক, তাদের খাকি হাফশার্ট আর ধুতি ফর্শাও বটে। এখানে কৃষক সমিতির দলের সবাই হৃষীকেশ নয়, এমন-কি বুদ্ধিমানও নয়। আলবিশই আছে–তার পরনের কাপড় তু প্রায় নেংটিই, এত খাটো। কিন্তু তারও তৈলাক্ত বাবরি ঘাড়ের ওপর দোল খায়। অথচ এত বড় একটা বাঘারু, তার শরীরের চামড়া গাছের বাকলের মত, মুখ-চোখে কোনো ভাষা নেই, মাথার চুলের আলাদা রং নেই। সত্যি এখানে চলে না। এখানেও চলে না।
এ হে-ই বাঘারু, সরি যা কেনে।
হে পাহাড়টো, তফাত হো ভাই।
হে-ই–
বাঘারু টের পায় না। আর তখন এম-এল-এ, তার একেবারে নাকের সামনে এরকম একটা প্রাচীরের মত লোক খাড়া থাকায় দুবার গলা খাকারি দেয় কিন্তু কিছু বলতে পারে না। গয়ানাথ পেছন থেকে এম-এল-এর পাশে এসে আঙুলটা তলার খেতের দিকে দেখিয়ে বলে, হে-ই বলদখান, ঐঠে গিয়া খাড়া, খাড়া থাকিব।
বাঘারু সঙ্গে-সঙ্গে সোজা হেঁটে এম-এল-এর পাশ দিয়ে, গয়ানাথের পেছন দিয়ে পরে আরো দু-একজনকে ঠেলা দিয়ে নীচে নেমে যায়। তার চেহারাটাই এমন যে অনেকখানি জায়গা না-হলে তার চলে না। ফলে, সে চলে যাওয়ার পর অত মানুষজন সত্ত্বেও জায়গাটা একটুক্ষণের জন্য একটুখানি খালি-খালি লাগে।
সেই সুযোগটা নিয়ে সুহাস এম-এল-এর সামনে এসে মনস্কার করে বলে, আমি এখানকার হলকার চার্জে
আচ্ছা, আচ্ছা, আপনারা ত হাটে ক্যাম্প করেছেন, দেখে আসছি, এইখানে কোনো প্রবলেম নাই ত? শুনলাম কি মারামারি নাকি—
সুহাস তাড়াতাড়ি না, আমার কোনো প্রবলেম নেই, বলে সবার দিকে মুখ ঘুরিয়ে যোগ করে, এদের যদি কিছু থাকে এরা বলবেন। আমি তা হলে যাই, আমাদের ক্যাম্পের লোকজন ওয়েট করছেন, ওঁদের তা আবার গিয়ে রান্নাবান্না- হ্যাঁ, হ্যাঁ, এম-এল-এ ঘড়ি দেখে, দুটা ত প্রায় বাজে। আমিও ত বসতে পারব না। আমি যাব সেই ফুলবাড়ি বস্তি, মাঝখানে ফরেস্ট, তাড়াতাড়ি যাওয়া লাগবে, ঐখানে একটা ক্যালভার্ট নিয়ে গোলমাল।
বাগানের জিপটাকে খবর দিচ্ছি, বীরেনবাবু বলেন।
ফুলবাড়ি বস্তিতে জিপও যায় না। নদী আছে, হাঁটতেই হবে। আর আপনাদের জিপগাড়ি বেশি চড়লে হাটা ভুলে যাব। তারপর আপনারা যখন জিপ দেবেন না? এম-এল-এ হাসে। সুহাসের সন্দেহ হয়, আসলে লোকটা বাগানের জিপের খোঁজেই এসেছিল, অন্তত নদী পর্যন্ত যেতে পারত, কিন্তু এখন আর জিপ নেয়া যায় না। এম-এল-এ যখন, জিপ নেবেই বা না কেন?
কিন্তু আপনি আমাদের এইখানে ক্যাম্পে হাত পুড়াবেন রান্না করে, সে ত আমাদের দুর্নাম।
