কিন্তু আলবিশ কিছু একটা টের পায়। সে তার ওরাওঁ স্বভাবে বুঝে যায়–চিয়াড়ি-ছাড়ার চরম সময়টা পেরিয়ে গেল–এর পর আর চিয়াড়ি ছেঁড়া যায় না। কিন্তু দলটা, তৈরি চিয়াড়ি নামাতে পারছে না–তাতে তাদের হার মেনে নেয়া হয়। আলবিশ ঝট করে মদেশিয়াদের দিকে পেছন ফিরে দুই হাত তুলে কৃষক সমিতির দলকে চিৎকার করে বলে, বৈঠ করো, সবকোই বৈঠ করো, বৈঠ করো। রাধাবল্লভ আর হৃষীকেশ সবচেয়ে আগে বসে পড়ে। তারা পেছন থেকে টেনে বুদ্ধিমানকে বসায়। কৃষক সমিতির দল হুড়মুড় করে বসে পড়তে থাকে। আলবিশ ছাড়া।
.
০৩৮.
কৃষক মজুর : ঐক্যের সংগ্রাম
মাঠের ভেতর সুহাস একা দাঁড়িয়ে।
সদ্যরোয়া ধানখেত তখন পায়ে-পায়ে কাদা। চারাগুলো কাদার মধ্যে ঢুকে গেছে। এত মানুষের পা এই খেতটুকুকে দলেছে যে মাটির ভেতরের জল ওপরে উঠে এসেছে। সেই কাদাগলা জলে কিছু চারা ধান ভাসছে।
সার্ভের লোহার চেইনটা লম্বা হয়ে পড়ে আছে–ওদিকে সবুজ মাঠের ভেতর থেকে এখানে কাদামাটির ভেতর দিয়ে, ওদিকে হাতির রাস্তা পর্যন্ত।
বড় আলের নীচে সুহাস একা দাঁড়িয়ে জমিমাপার চেইনটা উদ্ধারে ব্যস্ত। তার কথার মাঝখানে চিৎকার করে দুজন ঢুকে পড়ার পর যেকাণ্ড শুরু হল–দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে দেখা ছাড়া সুহাসের কিছু করার ছিল না। কিন্তু সিনেমার মত দেখেও সুহাস ঠিক বুঝে উঠতে পারছিল না ওরা কি বুড়ো সাঁওতালকে দেখেই তীরধনুক নামিয়ে নিল, নাকি ভয় দেখানোর জন্যই তুলেছিল, ছোঁড়ার জন্য তোলে নি।
আজ থেকে মাত্র বছর দশ আগে ধনুক, সাওতাল, আদিবাসী, জমিন, লড়াই, টোটা, তীর..এই সব নিয়ে সুহাস যা-যা শুনত, ভাবত, দেখত, সেসব এখনই তার ওপর দিয়ে ঘটে গেল, ঘটে যাচ্ছে। অথচ এই ঘটনার একেবারে কেন্দ্রবিন্দু হয়েও সেই অতীতের, মাত্র বছরদশেকের অতীতের, কোনো ঝিলিক তার মনে কোথাওই খেলে গেল না। এতগুলো আদিবাসী মুখের ভিড় সত্ত্বেও না।
তাহলে, হয়ত বছর দশেক পরে স্মৃতিতে আজকের এই ঘটনাটায় সেই রূপকথা আবার ঝিলিক দিয়ে উঠবে, স্মৃতিতে এই ভিড়টাকে চেনা যাবে–আদিবাসীর, এই লড়াইটাকে চেনা যাবে–জমির। দশ বছর অতীতের স্বপ্ন আর দশ বছর পরের সম্ভাব্য স্মৃতির ভেতর বর্তমানে সুহাস বায়ে তাকিয়ে দেখে বিনোদবাবু, অনাথবাবু, প্রিয়নাথবাবু হাতির রাস্তা থেকে তার দিকে আসছেন। সুহাস এগিয়ে যায়, লাফিয়ে আলের ওপর ওঠে। তারপর ওদের দিকে হাঁটে। দূর থেকে বিনোদবাবু জিজ্ঞাসা করেন, স্যার, আপনার কিছু হয় নি ত?
না, তা হয় নি, কিন্তু আপনারা চেইন ফেললেন, অথচ এতক্ষণ ছিলেন কোথায়?
স্যার, যেরকম মারামারি দেখলাম, আমরা আর সাহস পেলাম না।
না। আমার জন্য বলছি না। কিন্তু চেইনটা গোটাতে হবে আপনাদের। আর আমি বুঝতে পারছি না বিনোদবাবু, চেইনটা এই জমিতে ফেলতে কে বলল।
কেন স্যার। আমরা ত পর-পর করে যাচ্ছি।
না। তা ত করে যাচ্ছেন। এটা ত আর বর্ডার লাইন নয়, একেবারে ভেস্টেড ল্যান্ডের মাঝখানে। আমরা ত ভেস্টেড ল্যান্ড মাপছি না, মাপার কথাও নয়।
আমি ত দেখি নি স্যার, কী প্রিয়নাথ, তোমরা বিনোদবাবু বলেন। প্রিয়নাথ উত্তর দেয়, আমরা ত আর দাগ নম্বর চিনি না স্যার, আমরা যেমন লাইন বেঁধে চেইন টানছিলাম তেমনি টানছি।
অনাথ লাফিয়ে নেমে চেইন গুটোতে শুরু করে।
সুহাস ওঁদের তিনজনের দিকেই তাকিয়ে বলে, দেখুন, এরকম ভুল যেন আর না হয়, এত গোলমাল বেধে গেল এই এক কাণ্ড থেকে।
বিনোদবাবু একটু চুপ করে থেকে বলেন, আপনি কিছু বলছেন স্যার?
না। তেমন কিছু হলে ত বলতামই, তবে এরকম অদ্ভুত ভুল হওয়া ত নিরাপদ নয়।
সে ত স্যার আজকে একটা আপনার ডেনজারই হয়েছিল। তা হলে এখন ত ক্যাম্পে ফিরব স্যার?
হাঁ চলুন।
আগে আগে সুহাস ও পেছনে-পেছনে বিনোদবাবু ফেরা শুরু করতেই স্যার, স্যার বলে পেছন থেকে হাঁকাহাঁকি শুরু হয়। সুহাস দাঁড়িয়ে পড়ে। রাধাবল্লভ, সেই বুড়ো সাঁওতাল, হাফপ্যান্ট-পরা একজন নিশ্চয়ই বাগানের, আর তাদেরও পেছনে বীরেনবাবু, ওপর থেকে এই আলে নেমে এদিকে আসছে। কাছাকাছি এসে রাধাবল্লভ, বলে, স্যার, আমরা ত আপনার জন্য বসি আছি স্যার।
আমার জন্য কেন?
না, আপনি তখন কী একটা কথা বলছিলেন, তার ভেতর একটা মিস্-আন্ডারস্ট্যানডিং মানে, ওরা দুজন, হৃষীকেশ আর বুদ্ধিমান, বীরেনবাবু বলেন। সুহাস বুঝতে পারে ওদের যুদ্ধের সমাপ্তিঘোষণার একটা উপলক্ষ চাই। তা হলে দুই পক্ষেরই একটা যুক্তি জোটে যে সরকারি অফিসারের কথা-অনুযায়ী তারা আপস করছে। নইলে তাদের নিজেদের ওপরই জয়-পরাজয় নির্ধারণের দায় চাপে।
সুহাস বলে, আমি ত আমার চেইন উদ্ধার করতে গিয়েছিলাম। এখন ক্যাম্পে ফিরে যাব। আপনাদের কি মিলমিশ হয়ে গেল?
ফাগু একটু হেসে বলে, মিলমিশ তো হোনা হোগা, কিষান অউর মজদুরকো এক পার্টি, এক ঝাণ্ডা। কিষান অউর মজদুরকে একাই
ফাগুকে থামিয়ে দিয়ে ভগত হাতিরাস্তার দিকে তাকিয়ে বলে, আরে, এম-এল-এ আসি গেলাক, এম-এল-এ।
সকলেই ঘুরে দেখে।
বিনোদবাবু বলেন, আমরা তা হলে এই স্যার। আপনি
সুহাস দাঁড়িয়ে থাকে। এম-এল-এ এসে গেলে সে আর যায় কী করে?
.
০৩৯.
এ কি কৃষক না মজুর?
বড় আলপথটা দিয়ে বীরেন্দ্রনাথ রায়বর্মন এম-এল-এ আসছে–ধুতি-পাঞ্জাবিতে বেঁটেখাট মানুষটির চলনে কোনো জড়তা নেই। পেছনে গয়ানাথ। গয়ানাথের পেছনে সেই সার্ভে ক্যাম্পের চেয়ার উল্টো করে মাথায় নিয়ে বাঘারু।
