হৃষীকেশ যখন বাকটার কাছাকাছি তখন দেখে উল্টোদিক থেকে বুদ্ধিমান ছুটে আসছে। হৃষীকেশকে দেখেবুদ্ধিমান দাঁড়িয়ে পড়ে চিৎকার করে, রি-শি-কেশ,ল-ডা-ই,ল-ডা-ই, বুদ্ধিমান এক লাফে নালীটা পার হয়ে জঙ্গলের মধ্যে গিয়ে পড়ে। সে ছোট কোঁতকার মত একটা ডাল নিয়ে আবার লাফিয়ে নালীটা পেরতেই হৃষীকেশ লাফ দিয়ে জঙ্গলের মধ্যে পড়ে। এদিক-ওদিক তাকিয়ে হৃষীকেশ ডালফাল কিছু পায় না। সে একটা গাছের নিচু ডালটাই টেনে নামিয়ে ভাঙে। ডালটা ভাঙে বটে কিন্তু সেটাকে গাছ থেকে ছেঁড়া যায় না। সমস্ত শরীর দিয়ে ডালটাকে টেনে নামানোর চেষ্টা করতে থাকে হৃষীকেশ। তখন বাইরে থেকে বুদ্ধিমান ডাক দেয়, হে-এ হৃষীকেশ চলি আয়, চলি আয়, এই লাঠিখান ধর।
বুদ্ধিমানের গলা শুনে হৃষীকেশ নালীটা লাফিয়ে পার হয়ে দেখে রাস্তার ওপর একটা সাইজমত ডাল। ফেলে রেখে বুদ্ধিমান সোজা দৌড়চ্ছে। হৃষীকেশ ডালটা তুলে নিয়ে একটা বিরাট হকার তুলে রে। এ-এ-এ করে সামনে হাতির রাস্তার ভিড়টার দিকে ছুটল। বুদ্ধিমানও হকার দিতে শুরু করেছে। আর হাতির রাস্তাটা দবদব করে ওঠে ওদের ছুটন্ত পায়ের দাপটে। সেই দৌড়ে, সেই হকারে আর লাঠিদুটোর ভঙ্গিতে সামনে বুদ্ধিমানের গেঞ্জিপরা আর পেছনে হৃষীকেশের জামাপরা শরীরে পেশির যেন নর্তনও দেখা যায়।
সামনে এই হাতির রাস্তাটার ওপরই ভিড়–সেখান থেকে ডাইনে জমি নেমে গেছে। সেখানেও ভিড়। দৌড়তে-দৌড়তে বোঝা যায় না কে কোন দিকে দাঁড়িয়ে। কিন্তু বুদ্ধিমান জায়গাটা দেখেই গিয়েছিল, তাছাড়া তারা জানেই কোন দল কোথায় দাঁড়াতে পারে। হাতির রাস্তার ওপরের ভিড়টা ঐ দুইজনের উদ্যত আক্রমণের সামনে ভাগ হয়ে গিয়েছিল–ওরা যাতে মাঝখান দিয়ে গলে যেতে পারে। কিন্তু তার আগেই প্রথমে বুদ্ধিমান, পেছনে হৃষীকেশ ঢাল বেয়ে নীচে নেমে যায়। সামনে একটা থকথকে কাদা জমি ছিল, লাফ দিয়ে তার আলে ওঠে। তারপর দুই-চারটা আল পেরিয়েই আবার একটু মাঠ। ভিড়টার কাছে ওরা ততক্ষণে প্রায় পৌঁছে গেছে। বুদ্ধিমান আর হৃষীকেশ লাঠিদুটোকে মাথার ওপর তুলে শা–লা, মাথা ফাটি দিম, শালা, বলে আরো জোরে হকার তুলতেই ভিড়ের ভেতর থেকে ইনকিলাব হকার উঠে ওদের গলার সঙ্গে মিশে যায়। সব সাজিয়েগুছিয়ে যেন হৃষীকেশ আর বুদ্ধিমানের জন্যই ওরা অপেক্ষা করছিল। তাদের আওয়াজ শুনেই ভিড়টা সরে তাদের ঢোকার জায়গা করে দিয়েছিল। ওরা পেছন থেকে ভিড়টার ভেতর ঢুকে পড়ে, এক লাফে বড় আলের ওপর উঠে সামনে বাগানের মদেশিয়াদের দিকে তেড়ে যায়। অত বেগে ঐ আওয়াজ তুলে মাত্র দুজনের ঐ তেড়ে আসায় বীরেনবাবু এক লাফে মদেশিয়াদের লাইনটার ভেতরে ঢুকে যান। তাতে আবার মদশিয়াদের ভেতর যারা সামনে ছিল তারা হঠাৎ দুপা পেছিয়ে যায়। তারা পেছিয়ে গেলে তাদের পাশাপাশি যারা তারাও দু-এক পা পেছিয়ে যায়। ফলে মদেশিয়া লাইনটাই একটু বেসামাল হয়ে পড়ে। এইটুকুর অপেক্ষাতেই যেন কৃষক সমিতি ছিল। রাধাবল্লভের চিৎকার শোনা যায়–ইন-কি-লাব; একটা দীর্ঘ প্রলম্বিত জিন্দাবাদ আওয়াজের সঙ্গে, যেন শ্লোগানটা শেষ করলেই দম ফুরিয়ে যাবে, কৃষক সমিতি প্রায় মিছিলের মত করেই বড় আলের ওপর উঠে মদেশিয়া লাইনটার ওপর আছড়ে পড়ে। মদেশিয়ারা সবাইই প্রথমে এক-পা দু-পা করে, তারপর প্রায় যেন দৌড়ের মত করেই, পেছুতে থাকে। এটা টের পেয়ে রাধাবল্লভ আবার রণধ্বনি তোলে–ইনকিলাব।
কিন্তু একেবারে আচমকা তাদের থেমে যেতে হয়। মদেশিয়ারা পেছুচ্ছে দেখে তাদের পেছনে এক ঢিবির ওপর থেকে তিনজন মজুর তিনটি চিয়াড়ি (ধনুক] বাগ করে ধরছে রাধাবল্লভদের দিকে। বুদ্ধিমান চিৎকার করে ওঠে, খবরদার। হৃষীকেশ ঘাড়টা ঘুরিয়ে তার দলের লোকদের চিৎকার করে বলে, চিয়াড়ি জোতো, চিয়াড়ি জোতো। কিন্তু কৃষক সমিতি বোধহয় চিয়াড়ি বের করার সময় পায় নি। রাধাবল্লভ আর হৃষীকেশ দুজনই পেছন ফিরে আঁতিপাতি খুঁজে নেয়, তাদের দলের চিয়াড়ি বেরিয়েছে কি না। কোথাও খুঁজে পায় না। ওদিকে মদেশিয়াদের চিয়াড়িতে তীর লাগানো হয়ে গেছে। একমাত্র উপায় সবাই মিলে আরো জোরে ছুটে চিয়াড়ি ছোঁড়ার আগেই ওদের ওপর হামলে পড়া। বুদ্ধিমান হকার তোলে–ইন-কি-লাব। কৃষক সমিতির দলটা নতুন উদ্যমে ছুটে যাওয়া শুরু করতেই–এবার আর বাধভাঙা বন্যার জলের মত নয়, এইবারের ছুটে যাওয়ার মধ্যে যেন মুহূর্তে একটা হিশেব হয়ে যায়, তিনটি চিয়াড়ি একবারও ছোঁড়া হলে তিনজন মারা যাবে, ওদের কাছ পর্যন্ত পৌঁছতে কবার ছুঁড়তে পারবে, কত জন মারা যাবে–আলবিশ ভগত পেছন থেকে দৌড়ে সামনে এসে মদেশিয়াদের দিকে মুখ করে দুই হাত ওপরে তুলে দাঁড়িয়ে পড়ে। কৃষক সমিতির দলটাও সঙ্গে সঙ্গে দাঁড়িয়ে পড়ে, বুক চিতিয়েই, আলবিশের ভঙ্গিতেই।
আলবিশের তখন চোখ দুটো আরো বড় হয়ে গেছে, কপালের লাইনগুলো যেন আরো গভীর, বাবরি চুল থোকা-থোকা ঘাড়ের ওপর আর হা করে থাকায় তার বড় বড় দাঁত, পান-খাওয়া লাল জিভ বেরিয়ে এসেছে।
সামনে ঢিবির ওপরে যারা চিয়াড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল তারা চিৎকার করে ওঠে, ভগত, তফাত হো। কিন্তু ভগত তফাতে যায় না, কোনো কথাও বলে না। আলবিশ ওঁরাও, ওদের একটা গোত্রের একটা অংশের পুরোহিত। কিন্তু পুরোহিত ত পুরোহিতই। ভগত ত ভগতই। কৃষক সমিতি হলেও ভগত। লালঝাণ্ডা হলেও ভগত। বুদ্ধিমানকে রাধাবল্লভ সঁতে দাঁত চিপে বলে, বুদ্ধিমান, শ্লোগান দিও না। চিয়াড়ির দলটা ভগতের ওপর তীর ছুঁড়তে ইতস্তত করছে, এত সামনাসামনি, যেন তাতে ভগতকেই মারা হয়। এখন শ্লোগান দিলে ওরা চিয়াড়ি ছাড়ার ছুতো পেয়ে যাবে। কিন্তু হৃষীকেশ আর রাধাবল্লভ এটাও বোঝে এখন যদি ওরা চিয়াড়ি ছাড়েই তাহলে তিনের বদলে ত্রিশ জন মারা যাবে। এখন আর ছুটে গিয়ে ওদের ওপর হামলে পড়া যাবে না। আর কৃষক সমিতির সবাই যেমন লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, তাতে চিয়াড়ি ছাড়লেই তিনজন পড়বে। সামনে দৌড়তে-দৌড়তে চিয়াড়ি বা গুলি খেলেও দল সামনেই ছোটে। কিন্তু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে একজন মারা গেলে, পুরো দল পেছন ফিরে দৌড়বে। তখন একের পর এক পড়তে থাকবে। রাধাবল্লভ আর হৃষীকেশ তাদের বুকের আর কপালের শিরার দবদব শব্দে যেন হিশেব কষে যায় জনা.দু-তিনের মৃত্যুতে তারা যেটা জিততে পারত, কতজনের মৃত্যু দিয়ে সেটা এখন হারতে হবে। বুকের এক-একটা আওয়াজে যেন এক-একজন করে মরছে।
