সুহাস রাধাবল্লভের দিকে পেছন ফিরে, বাগানের দলকে বলে, আপনাদের এস্টেট অফিসারকে আসতে বলুন।
কৌন কে?
এস্টেট অফিসার, এস্টেট অফিসার, আমাদের সঙ্গে যিনি কথা বলছিলেন, ওখানে।
ফাগু হুকুম দেয়, বীরেনকো বোলো, বীরেন এস্টেট অফিসার।
হো বীরেনবাবু, বীরেনবাবু হো-অ, ডাকটা বাগানের দলটার সামনে থেকে পেছনে চলে যায়।
রাধাবল্লভের দিকে তাকিয়ে সুহাস বলে, দেখুন, এখন ত আমাদের রোজই সার্ভে করতে হবে। কাজটা তাড়াতাড়ি না হলে ত আপনাদেরও অসুবিধা। কিন্তু এসব হাঙ্গামা ত আমরা মেটাতে পারব না, মানে আমাদের ত এটা কাজ নয়।
কী আপনাদের কাজ নয়, স্যার, বামফ্রন্ট সরকার জনগণের বন্ধু সরকার সুতরাং
না। সে ত ঠিক আছে কিন্তু যার যা কাজ সে ত তাই করবে, আমি ত আর ধরেনফরেস্ট রেঞ্জারের কাজ করতে পারব না, এটা আমাদের, মানে সেটেলমেন্টের কাজ নয়।
কোনটা স্যার আপনাদের কাজ নয়?
এই যে, এই খাশজমি এক-একজন কতটা করে দখল করছেন, তারা পাবেন নাকি চা-কোম্পানি পাবে, এটা ত আমরা ঠিক করতে পারব না।
রাধাবল্লভ বলে, স্যার, আপনি যদি আমাদের মাপতে চান, চলুন স্যার মাপিবেন, আমরা চেইন ঘাড়ে করি আপনাকে মাপি দিব। মাপাই ত আপনার কাজ। আমরাও মাপাই চাই।
শুনুন, এই ভেস্ট জমিগুলো ত দাগে-দাগে মিলিয়ে সরকার মেপে তুবে দখল নিয়েছে, আমরাই নিয়েছি, সুতরাং এই জমির খানাপুরী বুঝারতের কাজ হয়ে আছে, আমাদের মৌজা ম্যাপেই আছে। আর, কার দখলে কে কতটা রেখেছেন সরকার তা রেকর্ড করতে নিষেধ করেছেন। অনেক জায়গায় তার একটা লিস্টি আমরা নিয়েছি। যদি সরকার চায়, আমরা জমা দেব। আপনারা যদি চান, সেরকম একটা লিস্টি বানিয়ে আমাকে দিতে পারেন।
ভগত বলে, সে আমরা লিশ্চয় দিব স্যার, আপুনি চাহিলে দিব স্যার, আমরা ত সরকারের সহিত বন্দোবস্তই চাহি স্যার, কিন্তুক খাশ জমি মাপিবার দফে বাগানের মজুরদের দাবি কেন স্যার, ই মাপামাপিতে ওদের ত কুনো ফায়দা নাই। না কি, ঐ বীরেনবাবুকো মারফৎ কোম্পানি দাঙ্গা বাধাবার ধরলেক, স্যার।
আপনি কি আমাকে ডেকেছেন? বীরেনবাবু ঢালের ওপর থেকে বলেন, নীচে নামেন না। সুহাস অপেক্ষা করে উনি নামবেন, কিন্তু বুঝে যায় নীচে কৃষক সমিতির লোকজনের ভেতর নামতে তার ভয় হচ্ছে। সুহাসের এই অপেক্ষা আর বোঝার মাঝখানের ফাঁকটুকুতে রাধাবল্লভ বলে, স্যার, এই বীরেনবাবু লোকটা আমাদের ফরেস্টের ভিতর নানান কথায় ভুলাইয়া রাখি এই সব আমিনবাবুর সহিত ষড়যন্ত্র করিয়া এইঠে চেইন ফেলিছে আর এ্যালায় বাগানিয়া মজুর আউর বস্তির কৃষকের ভিতর দাঙ্গা বাধিবার তাল করিছে।
বীরেনবাবু ওপর থেকে চিৎকার করে ওঠে, রাধাবল্লভ, বি কেয়ারফুল– সেটাও একটা শ্লোগানের মত শোনায়। বাগানের দল যেন তার জবাবেই বলে ওঠে, নাহি চলেগা, নাহি চলেগা।
সুহাস কৃষক সমিতির দিকে পেছন ফিরে বীরেনবাবুকে ধমকে বলে, শুনুন, আপনার ত এখানে কোনো ইন্টারেস্ট নেই, তবে আপনি কেন আমাদের কাজে এত ইনভলভড় হচ্ছেন আর একটা ল-অ্যান্ড-অর্ডার সিচুয়েশন তৈরি করছেন?
আমি আপনাদের কাজে কোনো ভাবেই বাধা দেইনি।
আপনি ত এদের সঙ্গে একটা কমপ্রোমাইজের চেষ্টা করছিলেন যখন এখানে চেইন পড়েছে–আর ঠিক তখনই কৃষক সমিতির দলটা পেছন থেকে আচমকা জিন্দাবাদ শ্লোগান তোলে আর হকার দিতে-দিতে হৃষীকেশ আর বুদ্ধিমান পেছন থেকে ছুটে আসে।
.
০৩৭.
কৃষক–মজুর : সম্মুখসংগ্রাম
হৃষীকেশ মৌজ করে সিগারেটের ধোয়া ছাড়ছিল। কিন্তু চরের দলটা প্রায় একসঙ্গে দাঁড়িয়ে ওঠে। তারপর হৃষীকেশকে বলে, হালায় আর সিগারেট ফুঁইকতে হবে না, তাড়াতাড়ি দৌড় লাগা। আনন্দপুরের জমিতে কাইজ্যা লাইগ্যা গিছে। চল চল।
হৃষীকেশ লাফিয়ে ওঠে। কেমন বিহুলের মত চারদিকে একবার তাকায় তাদের দলের কৈউই নেই। যারা এতক্ষণ গান শুনছিল তাদের কেউ-কেউ চায়ের দোকানটার কাছে, জ্যোৎস্না আমিনের সামনে কয়েকজন। অনেকে সোজা সেই হাতির রাস্তা ধরে উত্তরে আনন্দপুরের দিকে যাচ্ছে বেশ তাড়াতাড়ি, যেন এখানকার গানের পালার শেষে ওখানে আরো .. লম্বা পালা আছে। হৃষীকেশ কয়েক পা আস্তে-আস্তে হাঁটে। আবার আশেপাশে তাকায়। সে যেন বিশ্বাসই করতে পারে না তাদের দলের কেউ নেই। চরের দলের কেউ-কেউ তাকে ছাড়িয়ে এগিয়ে যায়। হৃষীকেশ পেছন ফিরে একবার তিস্তার দিকে তাকায়। সেই চেয়ারটা খালি পড়ে আছে, আর একটু দূরে সেই টেবিলটা। হৃষীকেশের এটা বুঝে নিতেই একটু সময় লাগে, যে-ভিড়টার মাঝখানে সে এতক্ষণ ছিল, সে-ভিড়টাতে সে এখন নেই। সিগারেটটা এতক্ষণ টানে নি। এইবার জোরে-জোরে দুটো টান দিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দেয়। চায়ের দোকানটার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করে, আরে, এই, কী হইছে? ভিড়টার ভেতর থেকে একজন চেঁচিয়েই জবাব দেয়, জানি না কী হবার ধরিছে–সগায় ত ঐঠে, হাকিম আমিন সগায়, শনিবার পাছ তোমরালার সমিতির তানে বাগানের মদেশিয়াগিলার মারামারি হবার ধরিছে।
অ্যাঁ?–এই একটি কথাতে হৃষীকেশ সম্বিৎ ফিরে পায়। এরকম একটা মারামারি লাগার আশঙ্কা ত সব সময়ই থাকে। আজ সার্ভের ব্যাপার নিয়েই সেটা লেগে যেতে পারে। কিন্তু হৃষীকেশ ছাড়া মারামারি হবে কী করে? হৃষীকেশ সঙ্গেসঙ্গেই দৌড়তে শুরু করে, যতটা জোরে পারে। কমরেড ত আর মারামারি করতে পারবে না। আলবিশও পারবে না। আর ত সব চ্যাংরাছোঁড়ার দল।তাদের কী করতে হবে, সেটা হৃষীকেশ ছাড়া আর-কেউ ঠিকই করতে পারবে না। এক বুদ্ধিমান আছে। কিন্তু বুদ্ধিমান ত একা পড়ে যাবে। হৃষীকেশ চরের লোকগুলোকে পেরিয়ে চলে যায়। এই খাড়া খাড়া, চ, আমরাও ত যাচ্ছি। হৃষীকেশ দাঁড়ায় না, দৌড়তে-দৌড়তেই ভাবে বাগানের মদেশিয়ারা যদি বস্তির মধ্যে এসে ঘরবাড়িতে আগুন লাগিয়ে দিয়ে থাকে? তাহলে ত…•! হৃষীকেশ আন্দাজের চেষ্টা করে চিয়াড়ি (তীর-ধনুক] চালানোর মত দল তাদের ভেতর পাকাতে কত সময় নেবে? কিন্তু সবই ত নির্ভর করে কে বেশি তৈরি, তার ওপর। আনন্দপুরে সমিতির সঙ্গে মারামারি বেঁধেছে আর সে এখানে গান করছে অথচ তাকে একবার না-ডেকেই সবাই চলে গেল! ডাকার টাইম পায় নাই? একটা হাঁক দিলেই ত হত, হৃষীকেশ চলি আইস–এখন দৌড়তে-দৌড়তে হৃষীকেশ সেই ডাক শোনার চেষ্টা করে। না কি ডেকেছিল, হৃষীকেশ শুনতে পায় নি, আর ওরা ভেবেছে হৃষীকেশ ত আসিছেই। তাহলে ত..। না কি, কেউ রোঝেই নাই। হঠাৎ শুরু হই গিছে? কিন্তু হৃষীকেশ ছাড়া একটা মারামারি এতক্ষণ চলছে কী করে। ততক্ষণে হৃষীকেশ আনন্দপুরের জমির কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। এই হাতির রাস্তাটা সামনে বায়ে বেঁকেছে–সেই বাকটা নিলেই আনন্দপুরের ভেস্ট জমির এলাকা। জমির কাছে এসে হৃষীকেশ বোঝে সে এত জোরে দৌড়চ্ছে যে জমিতে পৌঁছে আর দম পাবে না। সে তাড়াতাড়ি তার দৌড়ের বেগ কমিয়ে দেয়। কমিয়ে দিতেই তার বুক আর কানের পাশের শিরার দবদব শব্দে যেন কানে তালা লাগে।
