রাধাবল্লভ তার পাঞ্জাবির হাতায় মুখটা মোছে। রাধাবল্লভের পাশে দাঁড়িয়ে যারা তার কথা শুনছিল তারা আলগা হয়ে যায়। বুদ্ধিমান হঠাৎ লাফ দিয়ে সামনের আলটার ওপর উঠে মজুরদের দিকে তাকিয়ে থাকে। কয়েকবার পায়চারি করে। বুদ্ধিমানকে দেখিয়ে মজুরদের লাইনের মেয়েদের ভেতরে একটু হাসাহাসির ভাব আসে।
.
০৩৬.
কৃষক-মজুর : ভাষণসংগ্রাম
বুদ্ধিমান যে বড়, উঁচু আলটায় দাঁড়িয়েছিল, সেটা পশ্চিমে গিয়ে হাতির রাস্তার সঙ্গে মিশেছে। সেখান থেকে সুহাস ঐ আল ধরে এদিকে আসে, একা। আমিন আর চেইনম্যানেরা ওখানে দাঁড়িয়ে থাকে। বীরেনবাবুও।
সুহাস কাছাকাছি আসতেই বুদ্ধিমান শ্লোগান দিয়ে ওঠে, খাশজমির দখলদারি, আর সমবেত উঁচু আওয়াজ ওঠে, ছাড়ছি না, ছাড়িম না–
খাশজমি মাপামাপি
নাহি চলেগা, নাহি চলেগা
খাশজমির পাট্টা চাই
লোন চাই, সার চাই
বুদ্ধিমানের গলা থেকে রাধাবল্লভ শ্লোগানটা নিয়ে নেয়। হাতটা তুলে টেনে বলে, কৃষকদের বিরুদ্ধে বাগানের মালিক ও আমলাদের ষড়যন্ত্র এই শ্লোগানটা এরা জানে না, চুপ করে থাকে। পেছন থেকে একটি মেয়ের ক্ষীণ গলায় একবার চলিবে না শোনা যায়। দম নিয়ে রাধাবল্লভই শ্লোগানের জবাবে আরো চিৎকার করে, ব্যর্থ করো। দ্বিতীয় ব্যর্থ করোতে অনেকেই গলা দিতে পারে।
এর মধ্যে সুহাস লাফিয়ে আল থেকে নেমে এদের সামনে চলে আসে।
শ্লোগান থামলেও সুহাস কথা শুরু করে না। তখন এরা আরো একটু চুপ করে, মজুরদের লাইনটাও একটু-একটু এগিয়ে আসে। সুহাস গলা না তুলে, বরং একটু হাসি মিশিয়ে বলে, আপনাদের জমি মাপা হবে না। আপনারা চেইনটা ছেড়ে দিন।
কথাটা সুহাস এত ঠাণ্ডা ভাবে বলে যে সবাই একটু অপ্রস্তুত হয়। কয়েক মুহূর্তের একটা ইতস্তত ভাব আসে, কী করা উচিত এই নিয়ে। সুহাস পাশের দিকে তাকায়। তারপর আবার মুখ ঘোরায়। অনাথবাবু আর প্রিয়নাথবাবুকে ডেকে চেইনটা গোটাতে বলবে কিনা ভাবে।
কিন্তু ওঁরা কেউ এদিকে আসছেনই না একেবারে।
ততক্ষণে রাধাবল্লভ চোখ বুজে ঘাড় কাত করে ফেলেছে। সে আর গলা চড়ায় না। কিন্তু তার শীর্ণ চোখেমুখে রাগ, ধিক্কার, কষ্ট এই সবের ছাপ বড় বেশি স্পষ্ট। রাধাবল্লভ বলে, আমরা সরকারের চেইন আটকাতে চাহি না। বিশেষত বামফ্রন্ট সরকারের চেইন, বামফ্রন্ট সরকার জনগণের বন্ধু-সরকার। কিন্তু যাহাদের চক্রান্তে এই চেইন খাশজমিতে ফেলা হইছে তাদের বিচর করিতে হইবে।
দেখুন, চক্রান্ত-টক্রান্ত কিছু নেই। আমরা এখন দাগনম্বরওয়ারি জমি মেপে যাচ্ছি। তাতেই আপনাদের জমিতে চেইন পড়েছে। আমাদের এখন এই জমি মাপার কথা নেই। আমরা চেইন তুলে নিচ্ছি, আপনারা ছেড়ে দিন। বিনোদবাবু, অনাথবাবু, প্রিয়নাথবাবু কেউই এগচ্ছেন না–সুহাস মনে-মনে একটু রেগেই আবার ডাইনে তাকায়। এখন চেইন যদি এরা ছেড়ে দেন, দিয়েছেন মনে হয়, তা হলে কি সুহাসকেই চেন গোটাতে হবে।
স্যার, এ-বিষয়ে আমাদের সমস্ত বক্তব্য শুনিলেই বুঝিবেন যে কত বড় ষড়যন্ত্রের মধ্যে এই চা-কোম্পানিরা বামফ্রন্ট সরকারকে ঠেলি দিচ্ছে।
সুহাসকে বাধ্য হয়েই দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। কিন্তু রাধাবল্লভ তার কথা শুরু করতে পারে না। মজুররা লাল ঝাণ্ডা তুলে জিন্দাবাদ জিন্দাবাদ শ্লোগান দিয়ে এগিয়ে আসে বড় আলটার ওপরে। তারপর সুহাসের উদ্দেশে আওয়াজ তোলে, খাশ জমিনকো সেটেলমেন্ট করনে হোগা, করনে হোগা, খাশ জমিনমে আধিয়ারি নাহি চলে গা, নাহি চলে গা, বামফ্রন্ট সরকারকো কানুন মাননে হোগা মাননে হোগা।
রাধাবল্লভকে বুদ্ধিমান জিজ্ঞাসা করে, কমরেড, রিশিকেশকে ডাকিব?
ডাকো ডাকো, সগাক ডাকো, খবর দাও, রাধাবল্লভ চোখ না খুলে বলে। বুদ্ধিমান ভিড়টার পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে মাঠ বরাবর ছুট দেয়–লড়াই বান্ধিবে। পেছনে শ্রমিক আর সামনে কৃষক নিয়ে সুহাস মাঝখানে। পেছনের শ্লোগান থামলে সে রাধাবল্লভকে বলে, দেখুন, আমি ত সার্ভে করতে এসেছি। আপনাদের জমি আমরা মাপব না, এ নিয়ে আর কী বক্তব্য আমি শুনব? শুধু সার্ভে নিয়ে কেউ কিছু যদি চলতে চান, বা, উত্তরাধিকার বা অংশ নিয়ে, দখল নিয়ে, সেইগুলো শুনতে পারি।
সুহাস আগেই আন্দাজ করেছিল যে এই দলের সবাই একটা এলাকায় এক লতে খাশজমি দখল করেছে। তাতে প্রায় প্রত্যেকেরই নিশ্চয় এক-দেড়-দুইহাল জমি আছে। এখন মাপামাপি করতে গেলে সেটা ধরা পড়বে। তখন ভেস্ট জমি আবার ভেস্ট হবে। তাই এরা প্রথম থেকেই আওয়াজ তুলেছে জমি মাপতে দেবে না। খাশজমি দখলে রেখেছে যে কৃষক সে ত বরং তাড়াতাড়ি রেকর্ড করাতে চায়। গবমেন্ট অর্ডার প্রথমে ছিল, খাশজমি মাপা হবে ও দখলদারদের নাম রেকর্ড হবে। পরে অর্ডার এসেছে, এখন ও-সবের দরকার নেই। দ্বিতীয় অর্ডারের কারণ নিশ্চয়ই এই রকমই আরো সব ঘটনা।
এতক্ষণ আনন্দপুরের এস্টেট অফিসারে নথিপত্র আর মৌজা ম্যাপ দেখে সুহাসের এই ধারণাটাই প্রমাণিত হয়েছে। চা-কোম্পানির মতলবও সুহাস বুঝতে পেরেছে। কিন্তু, সেই বিবাদ-মীমাংসায় তার কোনো ভূমিকা নেই। বরং সে একটু বিরক্তই হয়, বিনোদবাবু তাকে না বলে এই জমিতে চেইন ফেলে প্রথম দিনই এরকম একটা গোলমাল বাধালেন কেন?
যে-দলটা ঢালটার ওপর এসে দাঁড়িয়েছিল, তারা কিছুটা চুপচাপই সুহাস ও রাধাবল্লভের কথা শুনছিল। সুহাসের কথার পর চা বাগানের শ্রমিকদের দলের ভেতর থেকে বক্তৃতা শুরু হয়ে যায়, সাথিমন, চাবাগানকো লেবারলোক অউর কিষানলোক দুষমন নাখে। ভাই-ভাই হায়। সাথি-সাথি হায়। এককো দুখ অউরকো বুঝনা পড়লেক। নাহি বুঝলে ঔ মালিকমন মজুরকো অউর কিষানকো খতম করনে পড়ে। লেকিন সাথিমন, হামার এই ক্ষেতিপর এক খারাপি কাম হলেক, কী, না, চিয়া বাগানকো ভেস্ট ল্যাণ্ডপর কিষানলোর্কো জবরদখল কায়েম করতা-থে। এতনা জবর দখল যে ই গবমেন্টকো সেটেলমেন্ট ভি উ হোনা নাহি দেগা। লেকিন বামফ্রন্ট সরকার জনগনকো সাথি সরকার হ্যায়। ইসকো সব কাম ঠিক-ঠিক করনা পড়েক। ত হাম বলে কি, সরকারকে যো অফিসার হ্যায়, হিয়া, উ অফিসারকো সরকারকে কানুন ত সাফ-সাফ করনে তোগা। হামনিমনকো ই ডিম্যান্ড হ্যায় কি যযা ই-ভেস্ট জামিনকো পুরা মাপ করনে হোগা, অউর কোন কো পাশ কেতনা জমিন হ্যায় ইসকো লিস্ট বাহার করনে হোগা। সাথিমন, মজুরো অউর কিষানো দুষমন নাখে। মজুরকো ইউনিয়নকো লালঝাণ্ডা লাল, লাল পার্টি আর কিষান সমিতিকো ভি ওহি ঝাণ্ডা ওহি পার্টি। হামলোগ সাথি হ্যায়। উ হি দফে হামনিমন কি ডিম্যান্ড ই হায় যে সব খাশজমিকো তালাশ করনে হোগা, করনে হোগা। ই অফিসারলোগো অউর জোতদারলোগোকো যো কলকজা হোতা হ্যায়, যোক্যাপাসিটি হোতা হ্যায় উ খতম করনে হোগা। ইনকিলাব জিন্দাবাদ। ফাগু উরাওঁ বক্তৃতা শেষ করে আবার শ্লোগান দেয়, ইনকিলাব। কিন্তু এই শ্লোগানের জবাবে কোথায় যেন একটা মজাও মিশে থাকে। মদেশিয়া মেয়েদের অকারণ হাসিতে শ্লোগানের সুরটা রিনরিন বেজে ওঠে, বাজতে থাকে। তাতে শ্লোগানের একটা আদিবাসী ধরন ধরা পড়ে–কোনো কিছুই যেন গান ছাড়া বা নাচ ছাড়া হয় না, তেমনি আবার সন্দেহও উঁকি দেয় এই শ্লোগানের দল লড়াইয়ে আসে নি, এই শ্লোগানটার আদায়-অনাদায়ের সঙ্গে তাদের বাঁচামরার খুব ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নেই।
