আলবিশ বুদ্ধিমানকে বলল, শালো বীরেনবাবুঠো—
কোন বীরেনবাবু?
আরে, শালো আনন্দপুরকো।
অ। অয় শালার ত চাকরি হবা ধরিছে হামরালার উচ্ছেদের তানে–উকিল।
কায় উকিল হো?
ঐ শালার বীরেন। বীরেন-উকিল।
ধুত। উকিল ত কোর্টমে যাথে, কালা কোট পহিনকে। উকিল হোকে বাগানমে কিয়া করথে!
তোমার মাথা করেগা। এ্যানং বড় উকিল যেইলার একখান মক্কেলও নাই। সেই তানে চা-কোম্পানি উমরাক চাকরি দিয়া নিয়া আসিছে–এ্যালায় এই খাশ-জমির হালুয়া-আধিয়ারের পাছত কাঠি দাও। ক একখান অফিসার হইছে, বাগানের। কী কহিছে শালা?
কহিছে কি তোমলোগ দু-বিঘা করকে লেকে বাকি জমিন ছোড় দো।
কেনে, শালোর বনুসের (বউ) পোকর মানষির তানে?
আলবিশ রেগে দাঁড়িয়ে পড়ে, আরে আগারি ত বাতঠো শুনেগা, না, এইসা বাত কর যায়গা?
কখন বলিবার ধরলেক হে, তোমাক ঐ শালো, এ্যানং কাথা?
এই, যব কমরেডকো লেকচারঠো—
কোন লেকচার? কমরেড ত তামান টাইমেই নেকচার ঝাড়িছে, ঘুমের ভিতরও কহে কুখ্যা জোতদার
এবার আলবিশ হেসে ফেলে, আরে এই গানবাজনা কো আগারি।
কী? তোমরা ডাকি নিয়া গেইসে?
হয়।
কায় ডাকি নিল?
ফাগু আর বীরেনবাবু। তো হামনিমন্ ত গাই। উসকে বাত, বইঠকে বইঠকে উমনিমনকো সা বাতচিত হোথে লাগেল।
এককেবারে বইঠকে বইঠকে বাতচিত? খাড়কে খাড়কে না?
ওরা হাতির রাস্তার সেই বাকটার কাছাকাছি এসে গিয়েছিল, বায়ে ঘুরলেই সামনে, ডাইনে, সেই খাশজমির এলাকা শুরু, বয়ে ফরেস্টই চলে। চা বাগান আরো অনেক দূরে।
বাকটা ঘুরতেই ওরা দেখে সেই জমির ভেতরে আর হাতিরাস্তার ওপরে কিছু লোকজন। সেই সার্ভের লোকজনকেও দেখা যাচ্ছে। ওরা দু-জন দাঁড়িয়ে পড়ে। শালো, চেইন ফেলাচ্ছে–জমি মাপিবার ধইচছে?
বুদ্ধিমান ডাইনের ঢাল বেয়ে মাঠের ভেতর দিয়ে আলে-আলে দৌড়তে শুরু করে। আলবিশও তার হটার গতি বাড়ায়। কিন্তু সে ঢাল বেয়ে আলে নামে না। কাদায় থকথক করছে নতুন রোয়া মাঠ, আলে-আলে অত লাফাতে পারবে না আলবিশ।
কিন্তু ঘটনার জায়গাটিতে কোনো উত্তেজনা নেই, কোনো ঘটনাও নেই। সার্ভের লম্বা চেইনটা এই জমিগুলোর ওপর দিয়ে মরা সাপের মত পড়ে আছে। তার ওপর বসে আছে বেটিছোঁয়ারা, জেনিমন (মদেশিয়া চৌরা), ছাওয়া-ছোটর ঘর, লেড়কা-লেড়কি। রাধাবল্লভ সামনে কিছু লোক নিয়ে দাঁড়িয়ে। এই জমিটার একটা ঢাল ওপরে, কিছু দূরে চা বাগানের মজুরদের একটা ভিড়–কেউ-কেউ বসে, কেউ দাঁড়িয়ে। আর বাঁ পাশে হাতির রাস্তার মোড়টাতে সুহাস, বিনোদবাবু, প্রিয়নাথ, অনাথ দাঁড়িয়ে বীরেনবাবু ও আরো কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলছে।
বুদ্ধিমান এসে রাধাবল্লভের সামনে দাঁড়ায়। দীর্ঘ একটি শ্বাসে বুক ভরে জিজ্ঞাসা করে, কী হইছে কমরেড? তারপর নিশ্বাসটা ছাড়ে। মনে হয় বুদ্ধিমানের শ্বাস-প্রশ্বাসের চাপে তার গেঞ্জিটা ছিঁড়ে যাবে। এখন এতটা হেঁটে ও এইটুকু দৌড়ে আসায় তার চোখের নীচের উঁচু হাড়দুটোতে যেন ঘাম চকচকায়, ঐ দুটো আরো প্রখর হয়ে উঠতে পারে। নিশ্বাসে আন্দোলিত বুকের জন্যই কী না, বোঝা যায় না, বুদ্ধিমানের হাতদুটোও তার শরীরের পাশে ফুলে ফেঁপে দোলে।
ততক্ষণে আলবিশও পৌঁছে গেছে। রাধাবল্লভ চোখটা বন্ধ করে, ডান হাতটা মাথার ওপর কনুইয়ে ভেঙে আঙুলগুলোকে ঘাড়ের কাছে নিয়ে যায়, তারপর রোগা বুকটা চিতিয়ে, একটু কেতরে বক্তৃতার মত শুরু করে, কথাটা হচ্ছে, আমরা যখন আজ সার্ভের অফিসারের নিকট কৃষক সমিতির বক্তব্য বলিবার ছিলাম, তখন আমাকে আর আলবিশ ভগতকে আনন্দপুর চা বাগানের বাবু বীরেনবাবু আর ঐ ইউনিয়নের ফাগু উরাও ডাকি নিয়া আলোচনায় বসিবার চাহেন। আমরা আলোচনায় বসি। তাহারা অ্যালাং-প্যালাং বহুত কথা কহিছে। সেই সব কথা এখন আর বলিয়া কুনো কাম নাই। সে যাই হোক, বীরেনবাবু কহেন যে আমাদের জমি ছাড়িবার লাগিবে, মাথাপিছু দুই বিঘা করিয়া জমি থাকিবে আর এই তামান জমি মাপামাপি হওয়ার ধরিবে।
এই কথাতে, চারপাশে এমন গুঞ্জন ওঠে যাতে রাধাবল্লভকে থামতে হয়। সে হাত তুলে তাদের থামিয়ে বলে, কিন্তু সেইটাও কুনো কথা নহে। আমরা এই সব কথায় ঐ আলোচনাকক্ষ ত্যাগ করি। কিন্তু সেইটাও কুনো কথা নহে। আমরা যেই টাইমে ঐ সব আলোচনা করিবার ধইচছি, আলোচনা আর কথাবার্তা চলিছে, আর আমাদের কুননা মানষি যখন জমিতে নাই, সগায় গেইসে সার্ভের জায়গায়, রিশিকেশ গান গাহিবার ধরিছে, স্যালায় এই বীরেনবাবুর ঘর, এই কোম্পানির ঘর, আমাদের পাছত দিয়া, লুকাইয়া আমিনবাবুকে দিয়া, এইঠে আমাদের জমিতে চেইন ফেলিছে।
দম নেবার জন্য রাধাবল্লভকে থামতে হয়। তখন তার গলার সবগুলো রগ ফুলে উঠেছে। যে কণ্ঠস্বরে ও যে-ঘৃণায় সে এই কথাগুলো বলতে চায় তার সবটুকু যেন সে উগরে দিতে পারছে না। তাই তার মুখটা একটু ডাইনে বেঁকে গেছে–যদিও তার শ্রোতারা বেশির ভাগই বায়ে। আর তার নীচের ঠোঁটটা চেবড়ে যাচ্ছে। তাতে তার ক্ষয়ে-যাওয়া দাঁতের কালচে গোড়ায় জমে ওঠা থুতু দেখা যায়। রাধাবল্লভ ধিক্কারে বলে ওঠে, বীরেনবাবু আনন্দপুর চা-কোম্পানির চাকরি করেন। তিনি আলোচনার নামে আমাদের বনের আড়ালে নিয়া গিয়াছেন। আর সেই ফাঁকে এই আমিনকে চেইন দিয়্যা এইখানে জমি মাপিবার কাজে পাঠাইছেন। এইঠে আমাদের বেটিছছায়া, ছাওয়া-ছোটর ঘর সেই চেইনখান চাপি ধরি এইঠে বসি গিছে। আর সেই সময় চা বাগানের ইউনিয়নের এই শ্রমিকরা এইখানে আসিয়া লাই বান্ধি এই সব বোটিছোঁয়া আর ছাওয়া-ছোটর ঘরকে হুমকি দেখায়, ভয় দেখায়। আমি যখন এইখানে আসি পৌঁছাই তখন দেখি এই অবস্থা। আপনারা সবাই প্রস্তুত হোন। আমরা আমাদের দখলের জমি ছাড়িব না! এই জমি মাপিবার দিব না। চা-কোম্পানির আর আমলাতন্ত্রের ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করেন।
