এইবার রাধাবল্লভ বলে ওঠে, মানে, আমাদের জমি আবার মাপামাপি কিসের? সরকারের ভেস্ট জমি। সরকার মাপামাপি করে দাগ নম্বর ধরি ধরি দখল নিছে। ব্যস-সরকারের ফর্ম দেখি সেটেলমেন্টে দাগ নম্বর মিলাবে। আমাদেরও পাট্টা দেয় নাই। আমরাও মাপতে দিব না। পাট্টা দিলে মাপ হবে, পাট্টা নাই ত, মাপ নাই।
বাঃ! তোমরা যদি পুরো জমিটা কার কত দখলে আছে তার একটা হিশাব বের করতে না দাও তা হলে মীমাংসাটা কী হবে?
কায় হিশাব কিয়েগা? হাম ত জানেথে কিসকো কেতনা জমিন।
আলবিশ কথা শুরু করলে রাধাবল্লভ তাকে থামিয়ে দিয়ে বলে, চু যান ভগত, চুপ যান। বীরেনবাবু আমাদের জমি মাপাইতে চায়। তো চাউক। যায় পারে স্যায় মাপুক।
রাধাবল্লভ, শোনো। যদি তোমার কথাটা মেনেও নেই, তা হলেও ত দেখতে হবে কে কতটা জমি দখল করে আছে? তাহলে কোম্পানিও সরকারকে বলতে পারে যে তোমাদের আইন-অনুযায়ী কৃষকদের পাট্টা দাও। তারপর দিয়েথুয়ে যা বাকি থাকবে সেটা কোম্পানি বাগানের জন্য লিজ নিবে। ফাগুরাও সেই কথা বলবে। কী ফাগু?
জরুর। হামনিমন বলেগা সব পাট্টা দোও, উসকে বাদ কোম্পানিকো দোও।
মানে, বীরেনবাবু, আপনারা আমাদের বলিছেন আমরা দুই বিঘা জমি নিজেদের দখলে রাখিয়া বাকি জমিটা আপনাদের দিয়া দিব?
সরকারের ত তাই নিয়ম। যা নিয়ম তাই ত করতে হবে। নইলে তোমাদের ওখানে এক-একজনের ত একহাল জমিও আছে। হৃষীকেশ ত দর্জিগিরি করে। ওর কী করে জমি থাকে?
ঐ সব কথা বাদ দেন। আমরা বিশ বছর ধরে জমি দখল রাখছি। আপনারা ত আমাকে গুলিও করছেন। মাথায় বুকে না লাগিয়া হাতে লাগিল, রাধাবল্লভ ডান হাত দিয়ে তার বা বাহুটা চেপে ধরে–বা বগলেই ছাতা, সে ত আর জমি ছাড়িবার জন্য না।
রাধাবল্লভ, তোমাকে গুলি কি আমরা করেছি? এই সব কথা বলো কেন?
ঠিক আছে। ঠিক আছে। সেটা কোনো কথা না। কথা হচ্ছে, এই যদি আপনাদের কথা হয় তবে কথাবার্তা এখানেই শেষ। আমরা জমি ছাড়িবও না, জরিপও করতে দিব না। ভেস্ট জমি ত খাশজমি। খাশজমির খতিয়ান আলাদা। তার আবার মাপামাপি কিসের?
বীরেনবাবু বুঝে যায় তার আসল প্রস্তাবটা রাধাবল্লভ প্রত্যাখ্যান করল। সেও তখন বলে, বাঃ বাঃ তোমরা খাশজমিতে আধিয়ারি চালাবে আর মজুররা বাগানের জমিতে নিজেদের হক পাবে না, না?
ঐটা বাগানের জমি না, সরকারের জমি। ঐখানে মজুরদের কোনো হক নাই। আপনারা মজুরদের সঙ্গে আমাদের দাঙ্গা বাধাচ্ছেন- রাধাবল্লভ উঠে দাঁড়িয়ে ছিল। সঙ্গে সঙ্গে আলবিশও। ফাগুও উঠে দাঁড়ায়। বীরেনবাবু বসে থেকেই বলেন, দাঙ্গা ত আমরা করতে যাব না–তোমাদের পার্টির ইউনিয়নই যাবে। তখন তাদরে সঙ্গে বুঝে। বাগানের ওয়ার্কাররাই দাবি করছে যে এই খাশজমি কতটা কার দখলে আছে, মাপা হোক।
ঠিক আছে বুঝব–আমরা জমিতেই আছি। আপনারা অফিসার ধরি আসেন। দেখি কে কার জমি মাপে রাধাবল্লভ উঠে পড়ে।
.
০৩৫.
কৃষক-মজুর : শ্রেণীসংগ্রাম
বেরিয়ে এসেই রাধাবল্লভ বলে, ভগত, তাড়াতাড়ি জমিতে চলেন, গোলমাল হইতে পারে। তারপর সেই গানের আসরের দিকে তাকিয়ে বলে, বুদ্ধিমানকে ডাকি আনেন। রাধাবল্লভ দাঁড়িয়ে থাকে না, সে উল্টোদিকে সোজা হাঁটতে শুরু করে। আলবিশ ভিড়টার দিকে প্রায় ছোটে। তার বয়স হয়েছে। তাড়াতাড়ি হাঁটতে গেলে পিঠটা নুয়ে যায়, যেন পা যে যথেষ্ট তাড়াতাড়ি চলছে না, সেটার ক্ষতি পুষিয়ে নিতে সে কোমর থেকে মাথাটা এগিয়ে দিচ্ছে। আলবিশ ভিড়ের ভেতরে বুদ্ধিমানকে খুঁজে বেড়ায়। এক পাক ঘুরে দেখে চায়ের দোকানে বসে হৃষীকেশের গানের সঙ্গে তাল দিচ্ছে।
হেই বুদ্ধিমান উঠো, উঠো।
বুদ্ধিমান না তাকিয়ে বলে, আরে ভগত বসি যাও কেনে, দেখেন না শালো রিশিকেশ ক্যানং পালা বান্ধিছে, চরুয়ার পালা। ভিড়ের ভেতর থেকে হৃষীকেশের তারস্বর ভেসে আসে। ভগত আর দেরি করতে চায় না। রাধাবল্লভ আবার একা-একা গেছে। সে বুদ্ধিমানের পিঠে তার হাঁটু দিয়ে একটা গুতো মারে। এইবার বুদ্ধিমান আলবিশের মুখেরদিকে তাকায়, আলবিশ হাতের ইঙ্গিতে তাকে উঠতে বলে।
গত প্রায় পনের বছর ধরে বুদ্ধিমান কৃষক সমিতির সঙ্গে। আর এখানে কৃষক সমিতি মানেই এই খাশজমি দখলে রাখা, চাষ করা, লোন পাওয়া, মামলা করা এই সব। এক-একবার ভোটে এক-এক রকম সরকার এক-এক রকম আইন জারি করে। কিন্তু এই দখলি খাশজমির কোনো মীমাংসাই হয় না। দখলে রাখাই ত আইনের বার-আনি। সেই এত রকমের অভিজ্ঞতায় বুদ্ধিমান মুহূর্তে বুঝে ফেলে কিছু একটা গোলমাল হয়েছে। সে তড়াক করে লাফিয়ে উঠে আলবিশের কানে কানে বলে, কী হইল?
কমরেড তোঁহাক জুমিত যাবার কইসে।
কেন? কুনো গোলমাল বাধি গেইল?
না জানি। বাহির চল।
আলবিশ আর বুদ্ধিমান তাড়াতাড়ি হাঁটতে শুরু করে। বুদ্ধিমান হঠাৎ দাঁড়িয়ে বলে, রিশিকেশকে ডাকি
আলবিশ দাঁড়িয়ে পড়ে। কিন্তু কিছু ভাবতে পারে না। হৃষীকেশকে ডাকা মানে ত এখন এই গানের আসরটা ভাঙতে হবে। তার মানে, এই এতগুলো লোকই ত জেনে যাবে। তার মানে, গোলমাল ত আরো পাকাতে পারে। কিন্তু গোলমাল ত এখনো শুরু হয় নি। হতে পারে। বীরেনবাবু শালোঠো ধমকসে বাত করলেক। কমরেড একেলা হো৷ না। ছোড় দে; আগারি চলো থ।
বুদ্ধিমান পা ফেলে বলে, চলো, চলো।
ওরা তাড়াতাড়িই হাঁটছিল। বুদ্ধিমান বেঁটে আর আলবিশ ঢ্যাঙা। ফলে বুদ্ধিমানের অস্থির পা ফেলার সঙ্গে আলবিশের লম্বা লম্বা পা ফেলা মিলে যাচ্ছিল।
