আলবিশের কথার রেশটা কাটতে যতক্ষণ লাগে, তারপরে বীরেনবাবু বলে, কিন্তু একটা ত মীমাংসা তোমাদের করতে হবে। নইলে বাগানের শ্রমিকরাই বা তাদের হক ছাড়বে কেন?
রাধাবল্লভ তার ডান হাত দিয়ে মুখটা মুছে বলে, কিন্তু কথাটা হচ্ছে এই কথাটা আপনারা কেন সবাই। বুঝেন না চা বাগানের মজুরের হক কোম্পানির সঙ্গে, আর আমাদের এই ভেস্ট জমির হক, সরকারের সঙ্গে। আপনারা আমাদের ভিতর লড়াই লাগাচ্ছেন কেন?
রাধাবল্লভের কথার উত্তরে বীরেনবাবু একটু রাগ করেই বলেন, এই সব কথা বলে কোন লাভ নেই রাধাবল্লভ। সে কোম্পানির সঙ্গে যা তাদের করার মজুররা করবে, কিন্তু কোম্পানিকে বললেই ত বলছে আমাকে জমি দাও, আমি বাগান বাড়াব, বাগান বাড়লেই মজুরের লাভ হবে।
বীরেনবাবু রেগে ওঠায় রাধাবল্লভ আরো একটু বেশি রেগে জবাব দেয়–দেখেন বীরেনবাবু, আপনি ত কোম্পানি না?
তা ত না-ই, আমি ত কোম্পানির চাকরি করি।
তা হলে আপনি কোম্পানির হয়ে এত কথা বলেন কেন?
তুমিও ত রাজবংশী না রাধাবল্লভ, তা হলে তুমিই বা রাজবংশীদের নিয়ে এত কথা বলো কেন?
রাধাবল্লভ উঠে দাঁড়ায়, এই আলবিশ চলেন, এদের সঙ্গে আর কী কথা হবে। ঠিক আছে, আপনারা যা করার করেন। এখন হাটে-হাটে ঢোলাই দেন রাধাবল্লভ সাহা ভাটিয়া, ও কেন রাজবংশীদের নিয়ে জমি দখল করে। তারপর চাদা দিয়া মানষি দিয়া একটা উত্তরখণ্ড পার্টি খাড়া করেন।
.
০৩৪.
কৃষক মজুর : লেনদেন
বীরেনবাবু বোঝেন একটা ভুল কথা বলে ফেলেছেন। কিন্তু এখন যদি একটা মীমাংসার সূত্র বের না করা যায় তা হলে সব মাঠে মারা যাবে। সেই কথাটাই বলতে পারলেন না। আসলে রাধাবল্লভ তার চাকরি নিয়ে কথা তুলেই মাথাটা গরম করে দিল। বীরেনবাবু ফাগুকে একটা তঁতো মেরে বলেন, এই ধরে আন, বুঝিয়ে-সুঝিয়ে, যা, তাড়াতাড়ি যা।
ফাগু দৌড়ে গিয়ে আলবিশ আর রাধাবল্লভের পথ আটকায়। সল্ট লিকের কাছের ভিড়টা থেকেও দু-চারজন গোলমালের আভাসে উঠে আসে। ফাগু তাদের দিকে ফিরে ধমক দিয়ে বলে, কিছু না খে, তফাত যাও। ফাগুর কথা শুনে তারা আর এগয় না, কিন্তু দাঁড়িয়ে থাকে।
ফাগু রাধাবল্লভকে ধরে বলে, হে কমরেড চলল, চলো, বাতচিতমে ঐসা ত হোতাই হ্যায়। তোমকো ভি কৃষক সমিতি লাল ঝাণ্ডা, হামকো ভি মজদুর ইউনিয়ন লাল ঝাণ্ড। তো বাতচিত ত হোনাই চাহে।
রাধাবল্লভের রাগ তত ছিল না কিন্তু যেন ক্লান্তি ছিল, সে বলে, আরে ভাই, এত কথা বলি কী কাজ হইবে? তোমরা কোথায় আমাদের পাকে কোম্পানিকে বলিবেন যে খাশজমির কৃষক উচ্ছেদ করা চলিবে না তা না, উল্টা কোম্পানিই তোমাদের দিয়া আমাদের উচ্ছেদ দিছে। এরপর একদিন তীরধনুক দিয়া মারামারি লাগাই দিবে আর তোমরাও লাগি যাবা।
আলবিশ রাধাবল্লভের কথার খেই ধরে বলে, আর ব্যস, লাগ যাবে দেশিয়া আর মদেশিয়ার ফাইট, পুলিশ আয়গা ব্যস–ফটাফট দুই দলের কমরেডমন এ্যারেস্ট। ফাগু বলে, আরে, ছোড় দোও উসব বাত। কায় না জানে তোমার খাশজমিঠে দেশিগা-ভাটিয়া-মদেশিয়া সব কোই হায়, চলো-চলো, বাত খতম করো
রাধাবল্লভ ফিরতে-ফিরতে বলে, ঐটাই ত তোমাদের কোম্পানির বিপদ, না-হইলে কত দাঙ্গা বান্ধাইত।
আলবিশ রাধাবল্লভকে সমর্থন দিয়ে বলে–ত–য়? তারপর দুজনেই বসে।
ফাগু তার উদ্যোগ ছাড়ে না। সে বীরেনবাবুকে বলে, আপনি ঐ সব আলগা বাত করবেন না। ই ত রাধা কমরেডনে বোলা, হামরা লেবাররাভি বলব, খাশজমিঠে কৃষকলোগকো হঠানা নাহি চোলেগা। আউর উলোক ভি হামকো বাত বোলেগা। কিয়া, ঠিক হ্যায় না রাধা কমরেড?
রাধাবল্লভ বলে, ঠিক ত হ্যায় কিন্তু বোলেগাটা কী?
আলবিশ বলে, হ-আ, বোলো, কিয়া তোঁহার মতলব, বোলো
ফাগু বীরেনবাবুকে জিজ্ঞাসা করে, কিয়া বীরেনবাবু, ঠিক হ্যায় না?
বীরেনবাবু বলে, হা, এখন তোমরা ঠিক করো কী বলবে। তোমরা যদি দুই পক্ষ এক হয়ে কিছু বলো, সরকারও সেটা মানতে বাধ্য হবে, এই তোমার সেটেলমেন্টেই সেটা রেকর্ডও হয়ে যাবে।
ফাগু বলে, তো থোলো, কিয় বোলেগা?
ফাগু কথাটা কাকে বলে বোঝা যায় না, কারণ কথাটা সেই তুলেছে এবং জবাবটা তারই দেয়ার কথা। কিন্তু আবার বোঝা যায় যে সে এই কথাটারই জবাব বীরেনবাবুর কাছ থেকে জেনে নিতে চায়। বীরেনবাবুই তাদের আসল মুখিয়া কিন্তু তার কথার জবাবেই ত আর বীরেনবাবু শর্তটা দিতে পারে না, তাই তাকে চুপ করে থাকতে হয়। যেন ব্যাপারটা নিয়ে তারা সবাইই ভাবছে, বীরেনবাবুও। শেষে বীরেনবাবু শুরু করে, যারা জমি দখল করে আছে, মানে রাধাবাভের লোকেরা
বাধা দিয়ে রাধাবল্লভ বলে, আমার কোনো লোক নাই বীরেনবাবু, লোক থাকে ভদ্রলোকদের আর জোতদারদের। আমি ত ভদ্রলোকও না, জোতদারও না।
কেন? তোমাকে ত সবাই বাবু বলেই ডাকে, সে যাকগে, যারা জমি দখল করে আছে তাদের যাতে জমি থেকে সম্পূর্ণ উচ্ছেদ না হয় সেটা দেখতে হবে, এই ত?
শুনি না, আপনাদের কথাটা শুনি।
ফাগুরা কী বলবে বলুক। কী ফাগু?
না, সে ত, বলনেই হোগা, জরুর।
কিয়া? বীরেনবাবুই আবার প্রশ্ন করে।
ঐ যে, রাধাবল্লভমনকো উচ্ছেদ নাহি চলেগা।
নাহি ত চলেগা কিন্তু জমিটা ত তোমাদেরও সই?
জরুর। চাবাগানকো খাশ, বাগানকো দেনা হোগা।
সবই ত হোগা। কিন্তু সেটা হবে কী করে সেটা বলল।
সে ত জরুর বলনে হোগা বলে ফাগু থেমে যায়। আবার কিছুটা চুপচাপ থেকে বীরেনবাবু বলে, তা হলে তোমাদের জমিটা মাপামাপি হোক আগে।
