সবাই মিলে সল্ট লিক পার হয়ে গিয়ে বসে। একটু দূরে গাড়িতে, ফরেস্টের বাবুরা। সই দিকের মুখে মদেশিয়াদের যে-দলটা বসে ছিল তরা কেউ এদিকে আসেও না, তাকাও না।
বীরেনবাবুই প্রথম কথা শুরু করেন, শোনো রাধাবল্লভ, সার্ভে ত শুরু হল। এখনত মাঠখড়ার কাজ রোজই এগবে। তোমাদের জমি ত বোধহয় আজকালই পড়বে। দু-একদিনের মধ্যেই ত বাগানেও পৌঁছবে। তা তোমরা কী করবে বাগানের ব্যাপারে?
কথা হচ্ছে কিছু করার নাই। আপনাদের জোল্যান্ডের ভেস্ট জমিতে আমাদের কৃষকরা দখল নিয়ে এতদিন ধরে চাষ করে। আমরা সরকারের কাছে পাট্টা চাই।
পাট্টা ত আর তোমার সেটেলমেন্টে হবে না, সে যেখান থেকে চাওয়ার তুমি চাও। কিন্তু তোমরা এখন কোনো বোঝাপড়ায় না-এলে ত দাঙ্গা বাধবে।
দাঙ্গা বাধিলে তা আপনাদেরই সুবিধা। আপনাদেরই মুনাফা। আপনারা ত আপনাদের মজুরদের বুঝাইছেন যে আমরা জমি ছাড়ি দিলেই আপনারা ওদের বন্দোবস্ত দিবেন। তার উপর বলতে লাগছেন আপনাদের বাগান আর বাড়াতে পারেন না–এই জমি ছাড়া। তাই নাকি পার্মানেন লেবারও নিতে পারেন না। কাম যদি এত কমই আপনাদের, বাগানটা ছাড়ি দেন না।
ওটাও ভেস্ট করে দেব? তা বলে, আমাদের তুমি চাকরিবাকরি দেবে? বীরেনবাবু একটু হাসি দিয়ে কথাটা মোলায়েম করতে চেষ্টা করেন। রাধাবল্লভও চুপ করে যায়। একটু পরে বীরেনবাবু আবার শুরু করেন, এবারের সেটেলমেন্ট ত তোমাদের পক্ষেই যাবে। এখনই যা ব্যবস্থা করার করে নাও। এর পরের ভোটে যদি সি-পি-এম হেরে যায় তখন আবার তোমাদের ঝামেলা। এখন মেটানোই ত ভাল। কোম্পানিও বেকায়দায় আছে, রাজি হয়ে যাবে। আর সরকার ত এখন তোমাদেরই পক্ষে। এই অফিসারও ত শুনলাম নকশাল, মানে, ছিল। সে-ও ত তোমাদেরই পক্ষে। এখন একটা বন্দোবস্তকরে নিলে তোমাদেরই সুবিধে।
আলবিশ একটু পেছনে বসে ছিল। সে গলাটা বাড়িয়ে শুনছিল আর মাথা দোলাচ্ছিল, যেন মনে হয় সব কথাতেই তার সম্মতি আছে। মাঝে-মাঝে হ-হ-ও বলছিল। বীরেনবাবুর কথা শেষ হলে সে বলে বসে, হে-এ বাবুমন (বাবুরা], ভঁয় কহথে কি হামনিমন [আমরা] সব জমি ছোড় হুঁ? আউর বাগানিয়া-লোক এসব জমি দখল লে লিবে? ত হামনিমন কাহা যাবে?
বোধহয় অতটা ঝুঁকে আছে বলেই কথার শুরুতেই তার মুখ দিয়ে লালা পড়ার উপক্রম হয়। বার বার সেই লালা ট্রেনে ভেতরে নিতে-নিতে সৈ আবার বলে, তোঁহার মালকিকার (মালিকেরা এতনা ঠিকা মজদুরকো কাম মে লেতা রোজ, লেকিন কইকো পার্মানেন করনেসে ত বুঝ আতা হ্যায়, কিয়া, না-ই বাগানপর কাম হ্যায় বহুত, ইসকো অউর জমিকো জরুরত হ্যায়। কথা বলতে আলবিশ খুব একটা অভ্যস্তও নয়। কিন্তু তার লম্বা চেহারা, লম্বা চুল, বড় মাথায় মনে হয় তার যেন কথা আছে। তদুপরি মদেশিয়া হয়েও বাংলা আর রাজবংশী মিশিয়ে এক অদ্ভুত ভাষা তৈরি করে ফেলে, বীরেনবাবুদের সঙ্গে কথা বলছে বলেই।
আলবিশের কথার উত্তরে সেই ফাগু ওঁরাও ছেলেটি রেগে গিয়ে বলে, মালকিকারকে দোষ নাখে [নেই। বাগান বাঢ়নেকো জমিন না থে ত পার্মানেন কাম বানাই যাবে কেইসে?
আলবিশ বেশ জোরে-জোরে মাথা ঝাঁকায়, আর ঘ, ই,করে, যেন এতক্ষণে কথার আসল যুক্তিটা এই ছেলেটি ঠিক ভাবে বুঝতে পারল। ছেলেটি বেশ রেগেই কথাটা বলে। বীরেনবাবু হাত উঁচু করে বলে, ফাগু, এত রাগছ কেন, এতে ত কোনো ঝগড়ার কথা নেই। ফাগু তার লাঠিটা দিয়ে ঘাসের ওপর আস্তে-আস্তে মারে আর মুখটা একটু সরিয়ে রাখে। আলবিশ আবার কথা শুরু করতে চায়। তার ডানহাতটা সে এগিয়ে দেয় প্রথমে উপুড় করে–পঁচ আঙুল ছড়ান, তারপর চিত করে–পঁচ আঙুল, গুটোনো। একবার মুঠিও পাকায়, আলগা। সেটা যখন খুলে যায় তখন তার চওড়া কপালে লম্বালম্বা ভাজ, গভীর। কথাটা বলার চেষ্টাতেই এতটা পরিশ্রম করে, অবশেষে আলবিশ বলতে পারে, ঠিক বাত তু, ঠিক বাত। লেকিন বাগানের কাম বেশি, ফয়দা বেশি, মুনাফা বেশি ত পার্মানেন মজুর ভি বেশি হোগা, খা? তো হতে-হতে ত কোম্পানি কহতে শেকে যে, কি? না, বাগানকো এতনা কাম, আউর বাড়ানে হোগা, ত হামকো জমিন নাহি হ্যায়! হা? কোম্পানিকো হিশাব লাগানে বোলো, কুন সাল পর কেনা পার্মানেন লেবার হ-আ-আ এই শেষ হা-আ-আ-টায় এতটাই লম্বা করে ঘাড় হেলিয়ে ফেলে আলবিশ যে তার মুখ থেকে লালা গড়িয়ে তার নিজেরই হাতের ওপর পড়ে। পড়ার পর সে টের পায়। টের পেয়ে হ-আ-আ বলার জন্য মুখটা যে-ই করেছিল, সেটা বন্ধ করে। ঝোল টানার মত শব্দ করে লালা টেনে নেয়। হাতটা উল্টে ঘাসের ওপর মুছে নেয়। তারপর হাতের তালু দিয়ে ঠোঁটটা মোছে।
আলবিশের কথার পর সবাইই কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। এখানে যারা আছে তারা সবাই ব্যাপারটা এত বেশি জানে, যে কথাটা উঠতেই সবাই বুঝে যায় একথার উত্তর দেওয়া মুশকিল। কোম্পানির অজুহাত যে চা বাগানের এলাকা না বাড়ালে নতুন শ্রমিক নিয়োগ করা যাবে না, সুতরাং আনন্দপুরের জোতল্যান্ডের যে-অংশ ভেস্ট হয়েছে সেটা আনন্দপুর চা কোম্পানিই সরকারের কাছ থেকে লিজ নেবে চা বাগিচা বাড়ানোর জন্য। অর্থাৎ ভেস্ট জোল্যান্ড আবার তার জোতদারের কাছেই ফিরে যাবে ইনডাশট্রিয়াল ল্যান্ড হয়ে। সুতরাং সেই ভেস্ট জমি দখল করেছে যে কৃষকরা তাদের জমি ছাড়তে হবে। কিন্তু কোম্পানির পার্মানেন্ট শ্রমিক প্রতি বছরই কমছে। আগে কোম্পানি তার পার্মানেন্ট শ্রমিকের সংখ্যা বছর পঁচ-সাত আগে যা-ছিল তার সমান করুক, তবে ত বোঝা যাবে যে আরো নতুন শ্রমিকের দরকার। রিটায়ারমেন্ট, ছুটিছাটা, মৃত্যু এসব কোনো খালি জায়গাতেই কোম্পানি পার্মানেন্ট শ্রমিক নিয়োগ করে না। সব কাজ ঠিকা শ্রমিক দিয়ে সারছে। তাহলে এখন এই ছুতোয় ভেস্ট জমির কৃষকউচ্ছেদের এই চেষ্টা কেন?
