হৃষীকেশ আবার হাতচাটার ভঙ্গিটা তার চারপাশে জমা ভিড়টাকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখায়। আর মাঝেমধ্যে বলে, কহেন আপনারা, এইটা কিসের চাটন? এক-একবার জিজ্ঞাসা করে আর তার পেছনটা উঁচু হয়ে দোলে। শেষে চরের দলটার সামনে একবার চাটন দেখিয়ে, আর-একবার পেছন নাচিয়ে হৃষীকেশ বলে, এইঠে চাটিলেও মিষ্টি, ঐঠে চাটিলেও মিষ্টি, য্যানং মোর আখি গুড়ের গজা, আর? আর? কহেন আর কী?
হৃষীকেশ গানের ঝোঁকে সোজা হয়ে এক পাক ঘোরে, আর জিজ্ঞাসা করে। ও এমনি ঘুরতে-ঘুরতে গানের পরের লাইনটার মিল খুঁজছে। দর্শক ও শ্রোতাদের মধ্যেও প্রত্যাশা তৈরি হয়ে উঠছে–একটা লাগসই পরের লাইনে গানটা পুরো জমে উঠবে। হৃষীকেশ ঘুরতে-ঘুরতে আবার চরের দলের সামনে এসে পড়ে।
হৃষীকেশ সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে, এক হাত কানের পাশে দিয়ে, আর-এক হাতে ঠোঁটটা ঢেকে চরের দলটার দিকে তাকিয়ে গলা ফাটিয়ে গান ধরে
ও-ও। আমার চরুয়া-হালুয়া ভাই।
তোর গুণের সীমা নাই।
তোর এতোখান জমিতে ভোখো না মেটে
তোর প্যাটের সীমা নাই।
ও-ও আমার চরুয়া-হালয়া ভাই।
তোর প্যাটের সীমা নাই
তোর গলার তলায় প্যাটখান শুরু
হাঁটুর তলায় যায়।
চারদিকে হাততালির তুমুল সমর্থন। হৃষীকেশ থেমে সকলের দিকে তাকিয়ে মাথাটা একটু-একটু ঝাঁকিয়ে অভিনন্দন নেয়। পাট-পাট করা বাবরি চুল, ঝকঝকে সঁহ্যাঁত, সুপুষ্ট মুখে তাকে বেশ পেশাদার গায়কই মনে হয়। গানটা সে শুরু করে রাজবংশীদের প্রচলিত সুরেই প্রথমে একটা খুব বড় টান দিয়ে, এক-একটা নিশ্বাসের ঝোঁকে-ঝোঁকে। চরের দলের ভেতর থেকেই একজন একটা সিগারেট ছুঁড়ে দেয়। হৃষীকেশ লুফে নিয়ে বলে, থ্যাঙ্ক ইউ।
এরকম একটা গানের আসর বসে যাওয়ায় সবাই এসে ঘিরে দাঁড়িয়েছিল। দেখতে-দেখতে একটা যেন পালাগানের মত ভাবই ধরে। সেই ভিড়ের ভেতর রাধাবল্লভ আলবিশও দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে, শুনছিল। পেছন থেকে কেউ একজন একটা লাঠি দিয়ে আলবিশকে খোঁচা মারতেই আলবিশ পেছন। ফিরে তাকায়। লোকটি রাধাবল্লভকে দেখিয়ে আলবিশ আর রাধাবলভকে বাইরে আসতে বলে। ওরা দুজন যখন দেখি দেখি বলে বেরচ্ছে, হৃষীকেশ ওদের গলা শুনে দাঁড়িয়ে উঠে তাকাতেই চরের দলের একজন উঠে হৃষীকেশের হাত চেপে ধরে চিৎকার করে ওঠে, এই পুঙ্গির ভাই, থামবি না, গান যখন শুরু করছিস শেষ করতি হব। হৃষীকেশ দেখে আলবিশ আর রাধাবল্লভ ভিড় থেকে বেরিয়ে গেল, কিছু বলল না। সে আবার সকলের মুখের সামনে নিজের প্রসারিত হাতটা ঘুরিয়ে এক পাক ঘুরে আসে।
আ-আ মুই একি করলু রে
মোর চরুয়াহালুয়া ভাই
তোর সাথে মুই বিয়া বসিলু
বাসর হইল নাই।
চারপাশের ভিড়টা জমাট বেঁধে যায়। অভিজ্ঞতায় তারা টের পেয়ে যায় হৃষীকেশ গানের নিয়ম অনুযায়ীই চরম বিন্দুর দিকে যাচ্ছে। হৃষীকেশ শেষ লাইন দুটো বার দুই গেয়ে ও গানের মুখে ফিরে গিয়ে কৌতূহলটাকে আরো বাড়ায়। এবার বেশ মোটা পেট নিয়ে হাঁটার ভঙ্গি করে ও প্রথম স্তবকটা ফিরে গায়। তারপর একটুও বিরতি না দিয়ে হঠাৎ ধরে বসে,
ও-ও-রে নিঠুর চরুয়া-হালুয়া রে-এ
তোর প্যান্টের তলায় প্যাট ডংডঙাছে
খাড়া কিছুই নাই
এতক্ষণে যেন পুরো গানটা তার প্রত্যাশিত চরম বিন্দুতে ওঠে। হৃষীকেশ ডান হাতটা সামনে নিয়ে কনুই থেকে আঙুল পর্যন্ত ঝুলিয়ে দোলায় আর ঘুরে ঘুরে গায়
তোর প্যাটের তলায় প্যাট ডংডঙাছে।
খাড়া কিছুই নাই
আর তার এক পাক ঘোরার মধ্যে হাসিটা যখন ছড়িয়ে পড়ছে আর উঁচুতে উঠছে তখন সেই চরের দলটার কাছে পৌঁছে হৃষীকেশ নিজের দুই পেটে দুই হাত দিয়ে চরম দুঃখের অভিনয়ে ডুকরে ওঠে
ও-ও রে মোর চরুয়া-হালুয়া রে-এ
মোর প্যাটের ভোখোত মিটাইলি রে
(কিন্তুক) মোর তলপেট ভরে নাই
তলপেট চেপে ধরে ডুকরে কান্নার স্বরে হৃষীকেশ ঘুরে যায় মোর তলপেট ভরে নাই, আর কিছুটা এরকম ঘুরেই হঠাৎ সোজা হয়ে এক হাত মাথার ওপরে, আর এক হাত কোমরে দিয়ে কোমর দুলিয়ে দুলিয়ে গেয়ে যায়, মোর তলপেট ভরে নাই, মোর তলপেট ভরে নাই; তারপর ধপ করে মাটিতে বসে পড়ে এক পা, হাঁটুতে ভাজ ফেলে সামনে ছড়িয়ে, আর এক পা পুরো ভাজ করে, কাওয়ালির ঢঙে বাহাত কানের পাশে নিয়ে ডান হাত সামনে ছড়িয়ে দিয়ে কাধ থেকে কনুই পর্যন্ত ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে দ্রুত লয়ে গেয়ে ওঠে, তলপেট ভরে নাই তলপেট ভরে নাই। চারপাশের সবাই তার গান ও ভঙ্গির তালে হাততালি দিয়ে দিয়ে দ্রুত থেকে দ্রুত লয় বাড়াতে থকে। বাড়াতে বাড়াতে এক সময় সুরটা চরমে উঠে একটা চিৎকারে শেষ হয়ে যায়। হৃষীকেশ মাটি থেকে উঠে পকেট থেকে সেই সিগারেটটা বের করে ধরায়। তারপর এক মুখ হাসি নিয়ে চরের দলটার দিকে তাকিয়ে ধোয়া ছাড়ে।
.
০৩৩.
কৃষক-মজুর : আলোচনা
হৃষীকেশের গান যখন শুরু হয়েছে, অর্থাৎ রাধাবনভের বক্তৃতা থেমে গেছে–আনন্দপুরের বীরেনবাবু আর ফাগু ওরাও রাধাবল্লভকে ভিড়ের ভেতর থেকে বাইরে নিয়ে আসে। সঙ্গে আলবিশ। তারপর, সেই গাড়িদুটোর দিকে হাঁটতে থাকে। রাধাবভ বলে, এইখানেই কথাবার্তা বলেন, আপনাদের সঙ্গে অতদূরে গেলে এদিকে ত সবাই খোঁজাখুজি করবে।
আরে চলোই না। এখান থেকে কি কেউ দেখতে পাবে না নাকি, যে তুমি ওখানে কথা বলছ।
আলবিশ মাথা দুলিয়ে বলে, চলো, কমরেড, চলল, চলিবার কহথে ত চগে।
