যে-বিরাট দলটা ছড়িয়ে বসে চা খাচ্ছিল তাদের ভেতর থেকে একজন লাফিয়ে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে ওঠে, এই শালা সাহা, চরের কথা এইখানে তোলার তুমি কে?
হৃষীকেশ এদিক থেকে হুঙ্কার দিয়ে ওঠে, খবরদার, লেকচার থামানো চলিবে না। হৃষীকেশের চিৎকার শেষ না-হতেই বুদ্ধিমান চিৎকার করে শ্লোগান তোলে ইন-কি-লাব, আর অত ভিড়ের ভেতরে নানা জায়গা থেকে অনেক হাত ওপরে ওঠে, কোনো-কোনো হাতে চায়ের গ্লাশও ধরা, জিনদাবাদ।
চরের দলের ভেতর থেকে একজন এক লাফে বুদ্ধিমানের সামনে এসে পড়ে–শালা। বুদ্ধিমান পাল্টা আক্রমণে প্রায় তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, শা-লো। কিন্তু কেউই কারো গায়ে হাত দেয় না। দুজন মুখোমুখি, গায়ে গা লাগিয়ে প্রায়, দুর্গা ঠাকুরের অসুরের ভঙ্গিতে পরস্পরের দিকে চোখ পাকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। যেন যে-কোনো মুহূর্তে মারামারি বাধবে।
এত গোলমালের ভেতর রাধাবল্লভ চোখ খোলে, মৃদু হাসিতে ডান হাতটা তুলে বাইকে বলে, আপনারা শান্ত হন। শান্ত হন। কথাটা হচ্ছে এই মারামারিতে কার লাভ হইবে? কথাটা হচ্ছে। আমাদের এই মাললাটাগুড়ি-ক্রান্তি অঞ্চলে অনেক কুখ্যাত জোতদার–
যে-লোকটি বুদ্ধিমানের সামনে লাফিয়ে পড়েছিল সে একটা পাল্টা লাফে রাধাবল্লভের দিকে ফিরে বলে, সে জোতদার-টোতদার নিয়্যা যা কওয়ার কও। চর নিয়্যা কিছু কওয়া চইলবে না। চরে জোতদারও নাই, আধিয়ারও নাই, সেটেলমেন্টও নাই, পাট্টাও নাই।
রাধাবল্লভ আবার তার ডান হাতটা তোলে, আপনারা শান্ত হন, কথাটা হচ্ছে চরের বা বাগানের কথা নয়। কথাটা হচ্ছে গত সেটেলমেন্টের পর আমাদের এই মাললাটাগুড়ি-ক্রান্তি এলাকায় অনেক ছু হইয়াছে, ফ্লাডও হইয়াছে, চরও জাগিছে, ফরেস্টও হইছে, জমিও হইছে, নদীও হইছে
হ্যাঁ, ঐ সব বলল সাহা, ফরেস্ট বলল, জোতদারও বলল, চরফর তুইলব্যা না, চরে শালা তোমার কৃষক সমিতি করা চইলবে না।
চরে জমি আছে আর চাষি আছে, চরের দলের ভেতর থেকে চিৎকার করে একজন বলে।
খবরদার। কৃষক সমিতির কথা তুলিলে জিভখান টানি লিব বলে হৃষীকেশ হঠাৎ লাফ দিয়ে ঐ দলটার সামনে পড়ে। সঙ্গে-সঙ্গে আলবিশ লম্বা হাত বাড়িয়ে তার পাট-পাট বাবরি ছুঁতেই সে বসে পড়ে।
শালো, কার কথা, কী কথা কুছু শুনবেক নাই, চিল্লাখে ত চিল্লাখে।
যে-লোকটি কৃষক সমিতির কথা তুলেছিল চরের দলের কেউ তার মাথায় চাটি মারে, ঠিক আছে, সাহা, বলো বলল।
কথাটা হচ্ছে, আপনারা জানেন এইবারের, সেটেলমেন্ট কৃষকের স্বার্থে করিতে হইবে।
ঠিক কথা, সাহা, শালা জোতদারগুলাক ঠ্যাঙাও আর জমিগিলা খালাশ করো।
রাধাবল্লভ হঠাৎ থেমে যায়, যেন সে বক্তৃতাটা থামিয়ে দিল মনে হয়। কিন্তু বক্তৃতাটা থামার মত জায়গায় আসে নি। সবাই রাধাবল্লভের মুখের দিকে তাকায়। রাধাবল্লভ হাসার চেষ্টা করছিল।
রাধাবল্লভ জোরে হাসতে পারে না। তার ব্রণের আর বসন্তের দাগভর্তি মুখে অসংখ্য কুঞ্চন দেখা যায়। তারপর, তার নীচের ঠোঁটটা বিস্ফারিত হয়। পান-খাওয়া জিভ আর দাঁত বেরিয়ে পড়ে। রাধাবল্লভ তার মুখের ওপর ডান হাতটা বুলিয়ে বলে, এইটা খুব মজার কথা হইছে, মজাটাতে তার এত. হাসি আসে যে তাকে আবার মুখেচোখে হাত বোলাতে হয়, জোতদাররা কয়, চরের কথা বলো, আর চরুয়ারা কয়, জোতদারের কথা বলো-।
হাসির ঝোঁকে রাধাবল্লভ চোখ ঢেকে মাথা নাড়ায়। আর চরের দলটাই হাততালি দিয়ে ওঠে।
বক্তৃতা থেমে যাওয়া, রাধাবল্লভের গলার স্বর নেমে আসা, হাসাহাসি, হাততালি–এতে আলবিশের মনে হয় বুঝি বক্তৃতা শেষই হল। সে তাড়াতাড়ি একটা পান এনে পেছন থেকে হাত বাড়িয়ে রাধাবল্লভকে দেয়। রাধাবল্লভ পানটা মুখে দিয়েও হাসতেই থাকে। তার ছোট শীর্ণ ঐটুকুমুখে অত বড় পান আর অতটা হাসি একসঙ্গে আঁটে না। থামানো লেকচার শুরু করা, পুরো হাসিটা হাসা আর পানটাকে চিবিয়ে দলা করে এক গালে ঠেলে নেয়া–এর ভেতরে যেটুকু সময় চলে যায় তাতেই যেন রাধাবল্লভের লেকচারটা শেষ হয়ে গেল বলে সবাই ধরে নেয়। আবার শুরু করতে হলে, রাধাবল্লভকে গোড়া থেকে ধরতে হবে।
রাধাবল্লভ হাসি মিশিয়ে পান চিবয়।
.
০৩২.
হৃষীকেশের গান
হৃষীকেশ সেই যে নীচে বসে পড়েছিল আর দাঁড়ায় নি, সেখানেই-উটকো হয়ে বসে আছে। ঐ বিরতির সুযোগে মুখ তুলে চিৎকার করে উঠল; চরের জমিতে জোতদারও নাই, আধিয়ারও নাই, শুধু গুড় আছে, চাটো আর চাটো, চাটো আর চাটো–
বলতে বলতেই সে উঠে দাঁড়িয়ে যাত্রার কুজা মন্থর মত দু-চার পা হাঁটে। তাতেই সবাই বোঝে হৃষীকেশ অভিনয় করবে, সবাই একটু নড়েচড়ে বসে। পিঠ নুইয়ে খুঁড়িয়ে-খুঁড়িয়ে হাঁটতে হাঁটতে হৃষীকেশ, সেই চরের দলটার সামনে গিয়ে দাঁড়ায় আর তাদের সামনে লম্বা জিভ বের করে হাতটাচাটার ভঙ্গিতে জিভের সামনে ওঠায়নামায়। যারা দাঁড়িয়েছিল বসে পড়ে। এই রিশিকেশ ঘুরে-ঘুরে। হৃষীকেশ হঠাৎ তার পেছনটা অনেক উঁচুতে তুলে দেয়, সেই উঁচু পেছন থেকে গড়িয়ে যেন পিঠটা নেমেছে, মাথাটা আরো নীচে, কিন্তু মুখটা ভোলা, তাতে জিভ বের করা। এটা হনুমানের লঙ্কাপোড়ানোর ভঙ্গি। তখন একটা বিরাট লেজ থাকে–পোয়াল দিয়ে মুড়ে-মুড়ে বানানো। হৃষীকেশ তার উঁচু পেছনটাকে আরো উঁচু করতে ও বেতালে নাচাতে পারে, একবার বায়ে, আর-একবার ডাইনে, দু-একবার দুটোই সমানে। এতে তার খুব নাম। হৃষীকেশ এবার তার পেছনটাকে চরের দলটার সামনে নিয়ে গিয়ে হঠাৎ প্রচণ্ড দুলিয়ে লাফিয়ে ঘুরে যায় আর হাতটা জিভের সামনে এদিক-ওদিক চাটা:ভঙ্গিতে ঘোরায়। চরের দলের একজন হৃষীকেশের পেছনে মারার জন্য একটা লম্বা লোমশ পায়ে লাথি ঘেঁড়ে কিন্তু হৃষীকেশ এমন পিছলে যায় যে লাথিটা লাগে না। লোকটার পা আছড়ে পড়ে। হৃষীকেশ আবার তারই সামনে পেছনটা ঘুরিয়ে নিয়ে যায়। সমবেত হাসিতে আর হাততালিতে লড়াইটা জমে ওঠে। আর, ঐ লোকটির পা-চালানো আর তারই মুখের ওপর হৃষীকেশের পেছন-ঘোরানোতে ব্যাপারটাতে যেন নাটকীয়তাই এসে যায়। হৃষীকেশ হঠাৎ মুখ তুলে সবাইকে জিজ্ঞাসা করে, কহেন আপনারা, এইটা কি চাটিবার ধইচছি আমি? এইঠে এক চাট, আবার ঐঠে এক চাট, কহেন, আপনারা।
