আলবিশের দিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে রাধাবল্লভ বলে, তোমার এখন ঐ এক কথা। ঘর চললে এখন কী হবে। এমনিই ত আমরা দেরি করি ফেলিলাম। এখনো ত আমাদের বক্তব্য বলাই হল না।
তব বোল কোরো কেনে, বক্তব্য বোল্ কোরো, বলে ভগত একটু সরে যায়। ইতিমধ্যে বুদ্ধিমান ও হৃষীকেশ আসে। বুদ্ধিমান বলে, কমরেড, এইখানে মিটিংখান শুরু করি দাও। হৃষীকেশ কোনো কথাই গোপনে বলে না, চিৎকার করে চার পাশে তাকিয়ে, এক হাতের তালুর ওপরে আর-এক হাতের মুঠোতে ঘুসি মেরে বলে, কমরেড, মিটিংখান শুরু করি দাও।
হৃষীকেশের চেহারা শৌখিন। তার পরনে শার্ট, আর নাইলনের প্যান্ট। পায়ে স্যান্ডেল–চামড়ার। বাগানের এক বাবুর কাছ থেকে সেলাইমেশিন জোগাড় করে লাটাগুড়ি হাটে হৃষীকেশ একটা দর্জির দোকান দিয়েছে। সেটাই তার প্রধান পেশা, এখন। ব্যাঙ্কের লোন পেলে একটা মেশিন কিনবে আর শিলিগুড়ি থেকে কারিগর আনবে। বছর বিশপঁচিশ আগে লাটাগুড়িতে খাশজমির দখলে হৃষীকেশের বাবা ছিল। হৃষীকেশের বাবা মারা গেছে অনেকদিন, সে-জমি অবশ্য দখলে আছে হৃষীকেশ ও তার দাদার মধ্যে দুই ভাগে। হৃষীকেশের ভাগে এখন আধি। সে চাষ করে না বটে কিন্তু তাই বলে কৃষক সমিতি ত আর ছাড়ে নি। কমরেডের সঙ্গে সার্ভে ক্যাম্পে এসেছে-কৃষক সমিতির দাবিদাওয়া নিয়ে। একটা গানও তৈরি ছিল-শখের নাটক আর গানে হৃষীকেশের দারুণ নেশা। কিন্তু আজ আর গানটা গাওয়ার কোনো সুযোগ পাবে মনে হয় না। হৃষীকেশ রাধাবল্লভকে বলে, ঐখানে যেটুকু বলা হইছে–তার পর থিকা বলেন।
রাধাবল্লভ জিজ্ঞাসা করল, বলব?
বুদ্ধিমান বলে, বলেন, বলেন, তাড়াতাড়ি বলেন। সগায় বসিসি চা খাছে, এখন বসিসি শুনিবে। বলেন।
১.৪ রাধাবল্লভের বক্তৃতা
রাধাবল্লভ ছিল চায়ের দোকানের দিকে পেছন ফিরে। সে চায়ের দোকানের দিকে ঘুরল। তার বা বগলে ছাতা ত প্রায় সেঁটে আছে। ডান হাতটা তুলে মাথার ওপর কনুইয়ের ভাজ ফেলে আঙুলগুলো নিয়ে এল ঘাড়ে, মাথার পেছনে। রাধাবল্লভ চোখ বন্ধ করে, ঘড়িটা একদিকে হেলাতেই হৃষীকেশ পাশ থেকে বলে, রিপিট দিবেন না, যা বলা হই গিছে তার পর থিকা বলেন–
যেন এই কথার জবাবেই রাধাবল্লভ শুরু করে, কথাটা হচ্ছে আমাদের এই মাল-লাটাগুড়ি-ক্রান্তি অঞ্চলে বহু কুখ্যাত
এই পার্টটা ত হয়া গিছে কমরেড।
রাধাবল্লভ চোখ খোলে, আমাকে বলতে দাও হৃষীকেশ।
বলেন, কিন্তু রিপিট দিবেন না।
রাধাবল্লভ আবার চোখ বন্ধ করে। সামান্য সময় নিয়ে ঘাড় হেলিয়ে শুরু করে, কথাটা হচ্ছে আমাদের এই মাল-লাটাগুড়ি-ক্রান্তি অঞ্চলে বহু কুখ্যাত জোতদার আছে। তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য কৃষকদের শোষণ করা। কিন্তু কথাটা হচ্ছে কেন? ধরেন, আনন্দপুর চা বাগানের জোতের জমিও আছে, চায়ের জমিও আছে। কিন্তু এই মালিকলোক চায়ের জমিতে ধান চাষ করেন আর ধানের জমিতে চা চাষ করেন। এই মালিকলোক চা বাগানের মজুরদের দিয়ে ধান চাষ করান আর জমির আধিয়াদের দিয়ে চা বাগানের কাজ করান। কিন্তু এই কৃষকরা মজুরদের মতন মাহিনা পায় না। ঠিকা মজুরি পায়। আর মজুররাও কৃষকদের মতন আধি-ভাগ্য পায় না। মজুরির পয়সা পায়। কোম্পানির সব দিকেই লাভ-জোতদারিতেও লাভ, ডিরেক্টরিতেও লাভ। আর মজুর-কিষানের সব কিছুতেই ক্ষতি মজদুরিতেও ক্ষতি, হালুয়াগিরিতেও ক্ষতি রাধাবল্লভ, বোধহয় দম নেয়ার দরকারেই একটু থামে, সেই ফাঁকে হৃষীকেশ বলে, এ কোন লেকচার দিছেন কমরেড, ই ত মজুর কৃষককের মিটিং না হয়, সার্ভের, জমির সার্ভে হছে, জমির কথা কহেন, হৃষীকেশের কথা শুনেই হয়ত, বা হয়ত জমির কথাতে কিছুতেই আসতে পারছিল না বলেই রাধাবল্লভ জোর করে একটা বিরতি নিয়েছিল, আবার শুরু করেই সে সরাসরি জমির কথাতে চলে আসতে চায়, আগের কথার প্রসঙ্গসূত্র ছাড়াই।
আমরা কৃষক সমিতির পক্ষ থেকে সমস্ত জমির বন্দবস্ত চাই কৃষকের স্বার্থে। যে কৃষকরা খাশ জমি দখলে রেখে চাষ করিছেন, জোতদারের লাঠিগুলি, পুলিশের অত্যাচার, জেল-মামলা-মোকদ্দমা সহ্য করিছেন, তাদের সেই সব জমিতে বন্দোবস্ত দিতে হবে। যে কৃষকরা ফরেস্টের জমি দখলে রেখে চাষ করিছেন, যেখানে শুধু ছিল হায়-হায়-পাথার, সেখানে বানি দিছেন হলহলা ধানের খেত, সেই সব জমি দখলদার কৃষকের নামে বন্দোবস্ত দিতে হবে। কিন্তু ফরেস্টের জমিতে যে-সমস্ত জোতদার চাষ করে তাহাদের হাত হইতে এই সব জমি কাড়ি লইয়া হালুয়া-আধিয়ারের মধ্যে বিলি করিতে হইবে। রাধাবল্লভের কথাগুলিতে আবেগ সঞ্চারিত হয়ে যাচ্ছিল–তাদের কৃষক সমিতির প্রত্যক্ষ নানা অভিজ্ঞতার স্মৃতির আবেগ। আর সেই আবেগের টানে, স্মৃতির প্রবলতায় কেমন অবান্তর হয়ে যায় তার নানা বক্তব্যের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য নানা যুক্তি। তার অব্যবহিতকে রাধাবল্লভ চরম গুরুত্বেই সামনে এনে দেয়–যুক্তির পরম্পরায় নয়, অভিজ্ঞতার সবল চাপে। সে একটু ধামে। আপাতত মনে হয় বটে, দম নেয়ার জন্যে, কথাটা শুনে বোঝা যায় সে আর-একটি সমস্যার মুখোমুখি দাঁড়াচ্ছে।
আর আমাদের একটি বিশেষ বক্তব্য আছে চরুয়াভাই কৃষকদের উদ্দেশ্যে। আমাদের এই তিস্তানদীর স্রোত সব সময়ই বদলায়। আজ যেটা কায়েম, কালি সেইটা চর। তাই জোতদারের দল তাদের জমি তিস্তার ভিতর গেলেও সেইখানে দখল রাখে। চরজমিতেও সাধারণ কৃষক দখল পায় না। আবার অন্যদিকে তিস্তার এমন-এমন চর আছে, যাহা শক্ত পাকা, নদীতে ভাসিবার কোনো আর ভয় নাই, কায়েমের থিকাও কায়েম। কিন্তু সরকারের নিয়ম যে পঞ্চাশ বছর ধরি চর যদি চর না থাকে তাহা হইলে কায়েম বলিয়া ডিক্লেয়ার হইবে না। সেই সুযোগে আমাদের পূর্ববঙ্গের হিন্দুভাইগণ আসিয়া এই তামান-তামান চর জমি চাষ করিবার ধরিছেন। যেইঠে আছিল ভামনি বন, বাঘের বাসা সেইঠে এখন ধান, পাট, তরকারি, তরমুজ হছে। কিন্তু এই পূর্ববঙ্গের ভাইরা আমাদের এইঠেকার রাজবংশী আর মদেশিয়াদের চরে ঢুকিতেই দেন না। যেন চরটা একটা
