.
০৩০.
কৃষক সমিতির ‘প্রোগ্রাম’
দলবল নিয়ে রাধাবল্লভ এসে এই ভিড়ের মধ্যে দাঁড়ায়।
তার বা বগলে ছাতা, ডান হাতটা মাথার ওপরে কনুইয়ে ভাজ ফেলে, ডান হাতের আঙুলগুলো ঘাড়ের কাছে, চোখদুটো প্রায় সব সময়ই বোজা, বোধহয় কোনো অসুখ আছে, চোখের কোণে ময়লা জমে।
সকালে দলবল নিয়ে সার্ভের জায়গায় পৌঁছতে দেরি হয়ে যাওয়ায় রাধাবল্লভ যেন ঠিক ভূমিকা পাচ্ছে না। এমনকি জুতমতো একটা দাঁড়ানোর জায়গাও পাচ্ছে না। ঠিক ছিল, সকালবেলা এখানে ঝাণ্ডা গেড়ে, ভোটর দিন বুথ অফিসের মত একটা অফিসই খোলা হবে, চাটাই-মাদুর পেতে। অন্তত একজন উকিল বা মোক্তারবাবু যাতে অবশ্যই আসেন, কাল কোট আর শাদা প্যান্ট পরে, সেই ব্যবস্থা করতে শহরের পার্টি অফিসে দুদিন আগে তোক গিয়েছিল। শহর থেকে বলেও ছিল, নিশ্চয়ই পাঠাবে। সকালে এখানে একটা ঝাণ্ডাটাণ্ডা নিয়ে অফিস করে বসলে, তাতে উকিল বা মোক্তার একজন থাকলে, লোকজন বুঝত তাদের জোরও আছে, আইনও আছে।
ঠিক ছিল, সার্ভে শুরু হওয়ার আগেই শ্লোগানটোগান দিয়ে রাধাবল্লভ একটা বক্তৃতা করবে। বক্তৃতায় এখানকার কুখ্যাত জোতদারদের নাম বলবে ও অফিসারদের সাবধান করে দেবে যে এদের সঙ্গে যেন কোনো আপস করা না হয়। তা হলে কৃষক সমিত এই জরিপের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ আন্দোলনে নামতে বাধ্য হবে। অর্থাৎ এই সেটেলমেন্টকে কৃষকদের ও আধিয়ারদের পক্ষে প্রথম থেকেই নিয়ে আসতে হবে। আরো সব বক্তৃতায় সারা দিন ধরে এখানকার চা বাগানের জোতদারি, ফরেস্টের জোতদারি, খাশজমির দখলদারি নিয়ে সব বলবে–কিন্তু ধীরে-ধীরে। প্রথমে শুধু সাবধান করে দেবে, তারপর আবার শ্লোগান হবে। হৃষীকেশ বলেছিল, শুধু শ্লোগান কেউ শোনে না, গানও হওয়া চাই। তা করো, তুমি গান বাঁধো আর গাও, ভালই ত, অফিসার বুঝিবে আমরা গানও জানি।
কিন্তু তাদের পৌঁছতে-পৌঁছতে অনেক দেরি হয়ে গেল। ভগতের এঁড়ে বাছুরটা কাল রাত্তিতে ফেরে নি–সন্ধ্যায় আনতে গেলে দড়ি ছিঁড়ে পালিয়েছে। সেটাকে খুঁজে বের না করে আর সার্ভের এখানে আসে কী করে। গরু অবশ্য পাওয়া গেল পাশের বাড়িরই একজনের গোয়ালে। ভগতের বাছুর চিনে সে রাত্রিতে রাস্তা থেকে বেঁধে এনে রেখেছে। কিন্তু দেরি যখন হয়েইছে তখন জলপাইগুড়ির প্রথম বাসটাতে, উকিল-মোক্তার যেই শহর থেকে আসুক, তাকে নিয়েই ক্যাম্পে যাওয়া ভাল। সেবাসে কেউই এল না। হৃষীকেশ ঠাট্টা করে বলল, ভগতের কোটটা মুই পড়ি যাছ, উকিলের নাথান লাগিবে। ভগতের একটা কাল, কোট আছে–সারাটা শীতকাল নেংটির ওপর সেই কোটটা পরে থাকে।
ওরা দলবল নিয়ে যখন ক্যাম্পে পৌঁছেছে তখন ক্যাম্প পার্টি বনের ভেতর সেঁধিয়ে গেছে। ওদের ঝাণ্ডা গাড়াও হল না, বক্তৃতাও হল না, শ্লোগানও হল না, গানও হল না। গয়ানাথ যখন বাঘারুকে। ডাকতে এল তখন যেন ওরা এতক্ষণের অপেক্ষার পর হাতে শিকার, পেলবনের মধ্যে গয়ানাথের সঙ্গে অফিসার একা-একা কী করে। ওরাও সকলের সঙ্গে বনের মধ্যে ঢুকল। তারপর ওখানেই রাধাবল্লভ বক্তৃতাটা শুরু করেছিল, প্রোগ্রামের বক্তৃতা অংশটা অন্তত হোক, কিন্তু তখন সবাই বেরচ্ছে। বক্তৃতাটা শেষ হল না। বন থেকে বেরনোর মুখটিতে আবার সেই বক্তৃতাই শুরু করেছিল একটু। কিন্তু তাদের পাশ কাটিয়ে আর-সবাই যে-যার মত বন থেকে বেরিয়ে যায়। তখনো বক্তৃতাটি শেষ হল না। এখন দলবল নিয়ে রাধাবল্লভ এই আসল জায়গাটিতে ঢুকল। ওপরে নীচে তাকিয়ে সে পুরো জায়গাটি, সেই তিস্তাপাড় থেকেঐ ওদলাবাড়ি রোড পর্যন্ত, একবার দেখে–ঐ সীমায় মোটরগাড়ি, জিপগাড়ি, আর, এই সীমায় সার্ভের টেবিলচেয়ার।
চায়ের দোকানের সামনে এসে ওদের দলটা দাঁড়ায়। একে চায়ের দোকানের ভিড় উপচে পড়েছে। তার ওপর চরের লোকজন এসেও ওর সামনেই বসেছে। তদুপরি জ্যোৎস্নাবাবু–আমিন। ফলে ওরা আর এগতেই পারে না প্রায়। রাধাবল্লভ চায়ের দোকানের দিকে পেছন ফিরে জমির ঢাল দিয়ে সোজা পুরে তাকিয়ে থাকে। তার বগলের ছাতাটা নামায় না। ডান হাত দিয়ে একবার চোখ মোছে। বুদ্ধিমান এদিক-ওদিক ঘুরে রাধাবল্লভের পেছনে এসে বলে–কমরেড় লেকচার এইখানেই দাও, এত লোক, ঠিক শুনিবার পাবে, চাও খাছে, কায়ও নড়িবে না, শুনিবার হবে। বলে বুদ্ধিমান আবার হে হে করে হেসে হাততালি দেয়, যেন এই এতগুলি লোককে সেই বুদ্ধি করে এখানে নিয়ে এসে আটকে রেখেছে, এখন কমরেড বক্তৃতা শুরু করলেই হয়। বুদ্ধিমানের ডাকে রাধাবল্লভ ফেরে না। রাবণ এক গ্লাশ চা এনে রাধাবল্লভকে ধরিয়ে দেয়। রাধাবল্লভ সন হাতে চাটা নিয়ে চুমুক দেয়। তারপর বগল থেকে ছাতা না-সরিয়েই বা হাতটা দিয়ে পকেট ঝাঁকিয়ে দেখে পয়সা আছে কি না, একটা পান খেলে হয়। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে আলবিশ ভগত আর হৃষীকেশ চা খাচ্ছে। হৃষীকেশ ত কোথাও চুপ করে থাকতে পারে না ওখানেই চেঁচামেচি শুরু করেছে।
চা খাওয়া শেষ হলে আলবিশ এসে রাধাবল্লভের কাছে দাঁড়ায়। আলবিশ ভগত পুরোহিত। তাই মাছমাংস খায় না, চুলগুলো কানের দুপাশ দিয়ে কাঁধের ওপর থোকায়-থোকায় পড়েছে। কপালটা বড়। চুলে নিয়মিত তেল ও চিরুনি দেয়। দাড়ি বোধহয় রাখার চেষ্টা করে। কিন্তু কম থাকায় দেখার মত হয়ে ওঠে না। জুলপির কাছ দিয়ে খানিকটা নেমে এসেছে আর গোফটা ঠোঁটের ওপর ছেড়-ঘেঁড়া হয়ে ঝুলে আছে। আলবিশের চোখদুটো আর সামনের দাঁতগুলো বড় বড়। সে যখন কথা বলে তখন তার ঘাড়টা সামনে দোলায় আর দাঁতগুলো বের করে চোখটা নাচায়। হে কমরেড, তা এইখানে একখান লেকচার ঝাড়খে চলো, আলবিশ আবার ঘাড় দুলিয়ে হাসে, লেকচার ঝাড়খে, ঘরকে চলো।
