এতজন লোক তাড়াতাড়ি হাঁটতে পারছিল না। রাধাবল্লভ প্রায় সুহাসের ঘাড়ের পেছন থেকে বলে যাচ্ছে। সে যে কথাটা শুরু করেছিল, সেটা শেষ করে থেমে যায়।
সগায় কুখ্যাত আর এক রাধাবল্লভ সাহা সাচা-স্যার, এই ডাকাতিয়া মানষিটার কাথা না-শুনিবেন। গয়ানাথ বলে।
সুহাস একটু সন্দিগ্ধ হয়। আসলে কি এদের জবরদখল জমি, তাই মাপতে দিতে চায় না বলে একটা ওজর দিয়ে রাখছে? কিন্তু কথাটা তুলতে চায় না বলেই কিছু জিজ্ঞাসা করল না। এবার অবশ্য সরকার জোর দং, অনুমতি দং, বর্গা দং সবই রেকর্ড করাচ্ছে। শুধু খাশজমির জোর দং রেকর্ড না করার অর্ডার দিয়েছে। সুহাসের ধারণা, এ-অর্ডারও বদলাবে। প্রাইভেট ল্যান্ডের জোরদখল যদি রেকর্ড হয়, খাশ ল্যান্ডে কেন হবে না। তাই সে ঠিক করেছে শাদা কাগজে খাশজমির জবরদখলদারদের লিস্ট রাখবে।
সুহাসকে ঘিরে চলা ভিড়টার ভেতর থেকে কমরেড, কমরেড শব্দটা দু-একবার শোনা যায়। কিন্তু সুহাস বুঝতে পারে না, কে কাকে বলছে। রাধাবল্লভ কোনো পাটির লোক নিশ্চয়ই। কিন্তু কোন্। এক হতে পারে কংগ্রেস-আই। আর এক হতে পারে কমিনিস্টরা কেউ। সরকারি পার্টি ছাড়া এত জোর পাবে কোত্থেকে যে বলবে–সেটলমেন্টের শেকল ফেলে দেবে? কিন্তু কমরেড বললে ত আর কংগ্রেস-আই হবে না, যদি অবশ্য রাধাবল্লভকেই ডেকে থাকে। তাহলে কি এখানে অনেক পার্টি আছে? নাকি কংগ্রেস-আই আজকাল কমরেড বলাও ধরেছে?
এই সমস্ত দলটার পথ আটকে, সুহাসের একেবারে সামনে এসে দাঁড়ায় লোকটি–পায়ের নখ থেকে মাথার চুল পর্যন্ত ভেজা, সারা গায়ে জল, পরনের কানিটা ঊরুর সঙ্গে লেপটে গেছে। লোকটা একটা ভেজা শালগাছের মত দাঁড়িয়ে থাকে–বানের জল নেমে যাওয়ার পর ডাঙা জমির একটা বিচ্ছিন্ন শালগাছের মত এই ভিড়ের সামনে দাঁড়িয়ে থাকে। তার পাশ কাটিয়ে ভিড়টাকে এগতে হয়।
.
০২৯.
জনসমাবেশ
আদিবাসী-উপজাতি ভিড়টাকে নিয়ে সার্ভে পার্টি যখন বন থেকে বেরিয়ে আসে তখন এখানে, সার্ভে টেবিল আর গয়ানাথের চেয়ার যেখানে পাতা, একটা বেশ সাজানো-গোছানো জনসমাবেশই হয়ে আছে। সমাবেশটা লম্বালম্বিই ছড়িয়েছে। এই জায়গাটা ডাঙার ওপরে, পুবে ঢাল বেয়ে নিচু জমি, একটু দূর থেকেই কাদায় ভরা। এখান থেকে ডাঙাটা বনের পাশ দিয়ে বেঁকে-বেঁকেই সোজা উত্তর-পুবে গেছে। দেখলে মনে হয় এটা যেন ফরেস্টেরই বর্ডার, যেন এই হাত দশ-পনের জমি ছাড় দিয়ে ফরেস্ট ডিপার্টমেন্ট ফরেস্ট বানিয়েছে।
এই রাস্তার মত জমিটার ওপর মোটা মুথাঘাস অসমভাবে বেড়ে উঠেছে। ফলে কোথাও ঘাসের আস্তরণ খুব পাতলা, তলার মাটিই প্রায় বেরিয়ে পড়েছে। আর কোথাও আস্তরণ এত মোটা, যে বসলে ঘাসে লেগে থাকা জলে পেছনের কাপড় চুপসে যায়। এই রাস্তার মত ডাঙার ওপরটা পরিষ্কার, যেন যত্ন করে নিয়মিত পরিষ্কার রাখা হয়। দু-পাশে–ডাইনের নিচু জমিটাতে বা বায়ের ছোট নালীর ওপারে বনের গাছগাছড়ার মধ্যে লম্বা ঘাসের জঙ্গল ঘন ও বড় হয়ে উঠেছে। এ-সব ঘাসবনে বাঘ থাকে। ঝোঁপঝাড়-জঙ্গলও দুপাশে মাটি কামড়ে, গাছ কামড়ে ছড়িয়েছে, বেড়েছে। অথচ রাস্তাটার ওপর কোনো ঝোঁপঝাড় বা ঘাসবন নেই। হাতির পাল এখান দিয়ে জল খেতে আসে। ফরেস্টের নানা জায়গা। থেকে সল্ট লিক এসে এই রাস্তায় মিশেছে। এখন বর্ষাকাল। ফরেস্টের ভেতরেই জল পাওয়া যায়। কিন্তু হাতির পাল অভ্যাসে কখনো কখনো আসা যাওয়া করে। আর সেই আসা যাওয়ায় এই রাস্তার মত ডাঙা পরিষ্কার হয়, হাতির পাল লম্বা নালীঘাস খেয়ে আর ঝোঁপঝাড় মাড়িয়ে সাফসুরত করে দিয়েছে। কিন্তু হাতির শুড়ের নাগালের বাইরে একদিকে ফরেস্টের আর-একদিকে নিচু জমির ঢালে সেই লম্বা নালীঘাস বেড়ে উঠেছে। হাতির পাল ঐটুকু নালী পেরতেও পারে না, আবার ঢাল বেয়ে নীচে নামতেও পারে না।
এখন এই হাতি-লাইন জুড়ে সেই মানুষজন লম্বা হয়ে ছড়িয়েছে। একটু দূরে আপলাদের ভেতর দিয়ে যে রাস্তা ওদলাবাড়ি গিয়ে ন্যাশন্যাল হাইওয়ের সঙ্গে মিশেছে সেই পাকা রাস্তার ওপরই একটা জিপগাড়ি দাঁড়িয়ে–আনন্দপুর চা বাগানের। আর ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের অ্যামবাসাডার আর-একটু এগিয়ে। দুই গাড়ির বাবুরা ও সাহেবরা কেউ গাড়ির ভেতরে বসে; কেউ গাড়িতে হেলান দিয়ে, কেউবা গাড়ির ওপর পা তুলে দিয়ে বাইরে, দাঁড়িয়ে। দুই গাড়ির মাঝখানের জায়গাটাতে ঢালের ওপর পা ছড়িয়ে ড্রাইভাররা ও একজন গার্ড গল্প করছে। গার্ডের পিঠে বন্দুক ঝোলানো। দুটো গাড়ির দাঁড়াবার জায়গা থেকে ফরেস্টের দিকে একটা এরকমই পরিষ্কার সল্ট লিক ভেতরে ঢুকে গেছে–সেই ফাঁকাটাতে দুটো-একটা ভাঙা গাছ ছাড়া গাছগাছড়া নেই, সামান্য একটু ঝোঁপঝাড় কোথাও-কোথাও। অনেক দূর পর্যন্ত এই এত ঘন সবুজ শূন্যতা দেখতে কেমন লাগে। ঠিক সল্ট লিকটার মুখে একদল মদেশিয়া বসে, গোল হয়ে। তাদের কারো পরনে গামছার মত রঙিন কাপড়ের ফালি, কারো পরনে হাফপ্যান্ট। কারো উদোম গা, কারো স্যান্ডো গেঞ্জি–ধবধবে, দু-একজনের গোলগলা নাইলনের। অনেকের হাতে ছোটখাট লাঠি।দু-জনের কাঁধে ছোট কুড়ল ঝোলানোকুড়লটাই আংটার মত ঘাড়ে লাগানো।
এই মদেশিয়ার দল আসল ভিড়টা থেকে একটু দূরেই আছে–সামনে যেখানে ম্যাপ-চেয়ার-টেবিল, সেখান থেকে। তারপর খানিকটা ঝোঁপ পেরিয়েই সেই জায়গাটি যেখান দিয়ে সার্ভে পার্টি ঢুকেছিল। এই এত মানুষের পায়ের চাপে জলেভেজা ঘাসগুলোর ওপরও যেন পায়ে চলা পথ তৈরি হয়ে গেছে। নেপালিদের একটা দল গলিটার পাশেই দাঁড়িয়েছিল, এখন সেখান থেকে সরে উল্টোদিকে এল। সকালে শুরুতে লোক ছিল না। তখন যেন, চায়ের দোকানটা বেশ দূরেই ছিল। কিন্তু এখন চায়ের দোকানটার সামনে-পাশে দুদিকেই মানুষজন। জ্যোৎস্নাবাবুও ঠিক এর পাশেই তার সেরেস্তা খুলে বসেছেন। ফলে সবচেয়ে বেশি ভিড় এই জায়গাতেই। চওড়া জায়গাটার ঠিক মাঝখানে চরের কৃষকদের একটা বিরাট দল বসে আছে। চা খাচ্ছে, বিস্কুট খাচ্ছে। দেখে মনে হয় তারা যেন এখানে সারাদিন থাকতেই এসেছে।
