গয়াডোবা–গলা শুনে সুহাস বুঝতে পারে সেই পূর্ববঙ্গের দলটা হবে। কিন্তু এই দলটা এল কখন, দেখে নি ত সুহাস, নাকি প্রথম থেকেই ওখানে ছিল–আড়ালে-আড়ালে।
শালো, তো বাপাডোবা, সুহাসের পাশ থেকেই গয়ানাথ পেছনে ঘাড় ঘুরিয়ে চেঁচায়। ফলে যে-সমবেত হাসি ওঠে তাতে বোঝা যায় গয়ানাথের এমন আচমকা রাগে সবারই ফুর্তি।
.
০২৮.
গয়ানাথী প্রমাণ
এখন আর নদীর ভেতরে কারো খুব মন ছিল না। লোক দুটি কাছাকাছি এসে গেছে। গয়ানাথ বলে, এইবার দেখেন স্যার, আপনাকে ত দুইখান মৌজা দেখাছি, এ্যালায় দেখেন, এই মৌজার কতখানি আপনারা নদীক ছাড় দিবার ধরিছেন-হে-ই বাঘারু সিধা বায়ে চলি যা। বাঘারু সোজা বয়ে চলতে থাকে। চলতেই থাকে। সুহাস গয়ানাথের দিকে তাকিয়ে বলে, আপনি ওদের উঠতে বলুন, আমি আপনার পয়েন্ট বুঝেছি, কিন্তু বোঝে সে এই জায়গা ছেড়ে না গেলে গয়ানাথও তাকে ছাড়বে না, আমরা ফিরে যাব, আর ফিরে যাচ্ছেই এটা বোঝাতে নদীর দিকে পেছন ফিরে ডাকে, বিনোদবাবু।
সুহাসকে পেছন ফিরতে দেখেই ভিড়টা ফাঁক হয়ে গিয়েছিল। বিনোদবাবুর গলা শোনা গেল, হ্যাঁ স্যার।
চলুন, আমরা ফিরে যাচ্ছি।
হ্যাঁ স্যার।
কিন্তুক হুজুর, মোর ত প্রমাণখান দেখিলেন না, আসল প্রমাণ?
দেখালেন ত সব, আবার কী প্রমাণ? সুহাস দুই পা সরে যায়, ভিড়টাও সরে যায়, গয়ানাথও সরে আসে। তিস্তার ভেতরে দুটো লোক ভাসতে থাকে। সেটা পাছে গয়ানাথ আর সবাই ভুলে যায় সুহাস বলে, ওদের উঠতে বলুন।
কিন্তুক স্যার, আপনি ত নদীখান দেখিলেন, মোর দাগনম্বরখান দেখিলেন না।
পেছন থেকে পূর্ববঙ্গের সেই দলটি বলে, কুঁচকি পর্যন্ত দেখাইয়া ছাড়ছেন ত—
সুহাসের সামনে থেকে গয়ানাথ.ঠাণ্ডা গলায় জবাব দেয়, তোর ধোকর বাপের ঘরখান বাকি আছে রে।
নিশ্চিত ভঙ্গি বা ঠাণ্ডা স্বর বা কথাটির জন্যই এবার গয়ানাথ জিতে যায়। সমবেত হাসিতে সেই অনুমোদন থাকে। সুহাস একটু অপ্রস্তুত হয়েই বোঝে তার ঠোঁটেও হাসিই লেগে আছে। বলাটা ভাল হয়েছে।
এক মিনিট স্যার, এক মিনিট, হে বাঘারু এইঠে আসি খাড়া, এইঠে–সামনে থেকে সবাইকে সরিয়ে দিয়ে গয়ানাথ সুহাসের জন্যে দৃশ্য খুলে দেয়। সুহাস তার জায়গা থেকে নড়ে না। ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়। জলের ভেতর গয়ানাথের বাঘারু দাঁড়িয়ে। লোকটার বুক পর্যন্ত জল। মাথার চুল লেপটে আছে। এই লোকটিই কি…,আর-একজন সাঁতারু বোধহয় উঠে গেছে।
বাঘারু, এইবার হাটা ধর, সিধা হাটা ধর, জলের ভেতর বাঘারু মাতালের মত হাটে, সেটা জলের তলার অসমতলতার জন্যই হোক আর বাঘারুর ক্লান্তির জন্যই হোক।
পেছন থেকে আওয়াজ ওঠে, লেট রাইট, লেফট রাইট যেন বাঘারুকে হাঁটার নির্দেশ দিচ্ছে, লেফট রাইট।
বাঘারু এক জায়গায় ডুব জলে পড়ে গিয়েই ভেসে ওঠে। গয়ানাথ তার পকেট থেকে একগাদা দলিল বের করে বলে, এই যে স্যার, মোর খতিয়ানখান, ষোল আনির খতিয়ান। ভাজ খুলে সুহাস দেখে, এই মৌজার যে-এলাকা এখন নদীর ভেতরে তার বিভিন্ন দাগনম্বরের নানা খতিয়ান। সে দ্রুত উল্টে বলে, ঠিক আছে, আমি ত দেখলাম।
কী দেখিলেন স্যার?
আমার যা দেখার দেখলাম।
দেখিলেন ত স্যার, এ্যানং বিশালিয়া নদী, আর এইঠে ক্যানং হাঁটুজল না বুকজল। এইঠে বৃষ্টির জল আসি বসিবার ধইচছে–এইটা নদী না।
ঠিক আছে। আপনি আপনার খতিয়ানগুলো বিনোদবাবুকে দেখাবেন। আমি ত দেখে নিয়েছি। ঐ লোকটাকে মিছিমিছি অত দূর ঘোরালেন কেন, এখান থেকে বাশ ফেললেই ত আপনার কথা বোঝ যেত, নদী নয়, জল।
কিন্তু স্যার, আপনাকে ত ম্যাপের তানে সব বুঝিবার নাগিবে, তাই মৌজার আসল মাথাঠে শুরু। করিলাম। কোটত মাথা আর কোটত ল্যাজ!
সুহাস হাঁটতে শুরু করে। তাকে ঘিরে ধরা ভিড়টাও তার সঙ্গে-সঙ্গে ঘোরে। দু-পা হাঁটতেই সুহাস বোঝে সে একটা ভিড়ের মাঝখানে, ভিড়টা নড়লে তবে সে নড়তে পারবে। ভিড়টা যাতে নড়ে সে কারণে সে এগিয়ে যাবার ভঙ্গি করে। এমন সময় তার বা পাশ থেকে গলা পরিষ্কার করে একজন বলে ওঠে, স্যার, আপনার নিকট আমাদের কিছু বক্তব্য আছে।
সুহাস সেদিকে মুখ তোলে। এই জায়গা দাও, জায়গা দাও বলে পেছন থেকে কেউ ভিড় সরায়। সেই ফাঁকের মধ্যে একজন এসে দাঁড়ায় রোগা, কোরা কাপড়ের পাঞ্জাবি, বাড়িতে জলকাঁচা ধুতি, বগলে ছাতা, চুল আঁচড়ানো নেই, মুখে বসন্তের দাগ, গলায় কষ্ঠির মালা, লোকটি তার জন্যে নির্ধারিত জায়গায় এসে চোখ বন্ধ ও ঘাড় কাত করে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে, ঠোঁটে হাসির একটা ভাবও আসে। কাত ঘাড়টাই একটু নাড়িয়ে চোখ বুজেই লোকটি বলে, কথাটা হচ্ছে–আমাদের বক্তব্য এই যে মাল থানার ক্রান্তি অঞ্চলে বিভিন্ন কুখ্যাত জোতদার, যথা এই গয়ানাথ বর্মন
খবরদার রাধাবল্লভ, গয়ানাথ আবার মাটির দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে ওঠে, মোক জোতদার কহিবার চাও, কহ, কিন্তুক মোক কুখ্যাত কহিবা না।
রাধাবল্লভ চোখ না-খুলে তার দিকে ঘাড়টা শুধু ঘুরিয়ে আর-একটু হাসি দিয়ে বলে, কী কহিব না? তারপর পাশাপাশি লোকদের দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে জিজ্ঞাসার ভঙ্গিতে তার হাসিতে কোঁচকানো মুখে বোজা চোখের ভুরু নাচায়।
হ্যাঁ বলুন, সুহাস বলে, চলুন না ওখানে গিয়ে একে-একে শোনা যাবে। এভাবে শুধু শুনে গেলে কোনোলাভ ত নেই, দাগ নম্বর ধরে-ধরে কাজ শুরু করা যাক, আপনাদের বক্তব্য বলবেন, সুহাস এবার বাইরে যাওয়ার জন্য হটতে শুরু করে। ভিড়টাও তার সঙ্গে-সঙ্গে চলতে থাকে। পেছন থেকে রাধাবল্লভের গলা শোনা যায়, আমাদিগের তাহাতে আপত্তি নাই। কিন্তু এই সমস্ত কুখ্যাত জোতদার যথা গয়ানাথ বর্মন, নগেন মজুমদার, তারানাথ বসু ও নাউছার আলি ইহাদের কথা অনুযায়ী যদি সেটেলমেন্ট হয়, তবে আমরা আমাদের জমি মাপিতে দিব না।
