হয়। দুজনাই পাই গিছে।
এ্যালায় ফিরিবে।
কনেক বিশ্রাম করিবার নাগিবে ত হে।
শরীল ছাড়ি দিবে, বসি পড়িলে শরীল ছাড়ি দিবে।
বিশ্রাম কেনে হে? যাওয়ায় তানে ত স্রোত ভাসি গেইছে।
স্রোত ভাসিবার আর জোর লাগে না, নাকি হে? ভাসি থাকিবার তানে—
হয়, হয়, রওনা দিছে হে।
কোটত কোটত? ভুরুর ওপর হাতের ঢাকা দিয়ে অনেকেই দেখতে চেষ্টা করে। কিছুক্ষণের স্তব্ধতার পর কেউ বলে, না হে, কাঠ ভাসি যাছে, কাঠখান ভাসি গেলাক আর ভঁয় কইথে ভাসি আইলাক? মদেশিয়া গলায় নিরুত্তেজ রসিকতা, নদীর পানি পিকে মাইত গেলে হে? নদীর ভেতরে ঐ দুইজনের ভেসে যাওয়াটায় নজর রাখতে দৃষ্টি আর মন যে-তীব্রতায় বাধা ছিল, তা এখন শিথিল হয়ে গেছে। ঐ দুইজন নদীর ভেতরের কোনো একটি চরে একটু গা-হাত-পা মেলে দিয়ে যেমন বিশ্রাম নিচ্ছে হয়ত, এই এতগুলো লোকও তেমনি, নদীর ভেতরে ঐ দুজনকে যতক্ষণ আবার দেখতে না-পায় ততক্ষণ, কথায় কথায় একটু এলিয়ে নিচ্ছে।
গয়ানাথই এক বিশ্রাম নিতে পারছে না। সে ভুরুর ওপর একবার ডান হাতের ঢাকা, আর-একবার–হাতের ঢাকা দিয়ে কোনো একটি বিন্দুতে ঐ লোক দুজনকে খুঁজবার চেষ্টা করছে। গয়ানাথ যদি ভুরুটা একটা হাত দিয়েই ঢাকা দিত তা হলে হয়ত তাকে এতটা অস্থির দেখাত না। কিন্তু একবার ডান, আর-একবার বা হাত তোলা ও নামানোর ফলে মনে হচ্ছিল সে বুঝি তিস্তার পুরো বিস্তারটার ওপরই চোখ বোলাচ্ছে। আর, ঐ অত তীব্র স্রোতের অত বিস্তারের দিকে অতক্ষণ এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলে মনে হয়, এই পাড়টাই ভেসে চলেছে, জাহাজের মত, আর গয়ানাথ ডেকে দাঁড়িয়ে সমুদ্রের দূর-দূর দ্বীপে কাকে বা কাদের খুঁজছে।
সবাই চুপ হয়ে গিয়েছিল, অচেতনেই হয়ত। আর ফরেস্টের এত গভীরে, নদীর এত কিনারে চুপ হয়ে গেলে ত এই জায়গাটা তার স্বাভাবিক স্তব্ধতাই ফিরে পায়। তাতে যুক্ত হয় শুধু এতগুলো মানুষের সমবেত শাসপতন শাসগ্রহণ। সেই অবকাশে তিস্তার ওপর থেকে বাতাস লাফিয়ে উঠে গাছগাছড়ার মধ্য দিয়ে গভীরতর বনাঞ্চলে চলে যাওয়ার পথে যেন মুচড়ে দিতে চায় শালগাছকেও।
ফিরি আসিবার ধরিছে, খুব চাপা গলায় কেউ বলে। সবাইকে কথাটা মেনে নিতে হয়, কথটা এমন ভাবে বলা। তারপর খোঁজাখুজি চলে নীরবেই। সুহাসও তার চোখ তীক্ষ্ণ করে দেখে। কিন্তু সে ত জানেই না কোনদিকে তাকাতে হবে। একমাত্র যখন এই ধূসর সমতলের ওপর কাল বিন্দুটা স্থির দেখা যাবে, তখন সুহাস বুঝতে পারবে-সাঁতার কেটে এগিয়ে আসছে।
ঐ যে, ঐ যে, আসিছে, আসিছে সুহাস দেখে সবাই তার বয়ে আঙুল দেখাচ্ছে। তাকিয়ে থেকেও সে কিছু দেখতে পায় না। কতটা দূরত্ব এই স্রোতের বিপরীতে লোক দুটোকে সঁতরাতে হবে?
সুহাসের পাশ থেকে গয়ানাথ বলে, হে-এ মউয়ামারির সীমানায় ঢুকিল। না! সুহাস বলে ফেলে, অ্যাঁ?
তখন গয়ানাথ সুহাসকে জিজ্ঞাসা করে, দেখিছেন ত, উমরায় আসিছে?
কোথায়?
এই যে বা হাতঠে, গয়ানাথ তার ডান হাতটা সুহাসের মুখের ডাইনে আড়াল দিয়ে বলে, এই বার এইঠে বা দিকে ঘাড় ঘুরান ধীরে-ধীরে, ঘুরান, ব্যস, দেখেন, গয়ানাথ সুহাসকে সময় দেয়, দেখিবার পাছেন?
সুহাস যেন খুব নিশ্চিত নয় এমন ভাবে বলে, হ্যাঁ—
গয়ানাথ সুহাসকে আরো কিছু সময় দেয়। তারপর জিজ্ঞাসা করে, দেখিবার পাছেন ত স্যার?
হ্যাঁ হ্যাঁ। হ্যাঁ। সুহাস তার নজর স্থির রাখে। এখন ত ওরা সাঁতরে এদিকে আসছে–তাই কালো বিন্দুটা চোখ থেকে সরে যাচ্ছে না, একবার দেখতে পেলে কিছুটা অপরিবর্তিতই থাকছে।
ঐ যেইঠে সাঁতার কাটিবার ধরিছে ওর বা হাতে, মোর বা হাতে, এই সাইডে, বলে বা-হাতটা তোলে, আঠার নম্বর দাগ মউয়ামারি মৌজা আর ডাইনে, এই সাইডে, পাঁচ নম্বর হাঁসখালি মৌজা। দুইখানই মোর দাগ। ষোল আনা নিজ খতিয়ান। ত মউয়ামারিটা বাদ দেন। ঐঠে তে মউয়ামারি শেষ হয়্যা গেইসে। কিন্তু হাঁসখালিটা ধরেন। হাঁসখালির ত ঐঠে শুরু, ঐঠে ঘুরিঘুরি চলি আসিছে। দু-জনকে এখন বেশ স্পষ্টই দেখা যাচ্ছে। তাদের হাতের আর পায়ের কোনো আন্দোলন বোঝা যাচ্ছে না যদিও, কিন্তু ধীরে-ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠছে তাদের মাথা আর ঘাড়ের আন্দোলন। গয়ানাথ তার বনমোরগের গলাটাকে সবচেয়ে ওপরে তুলে, হে-এ-এ বাঘারু, বা-হাত সরি যা সরি যা, বলে ডান হাতটা নাড়ায় সরে যাওয়ার ইঙ্গিত দিয়ে। গয়ানাথের এত চিৎকার তিস্তার বাতাসে হুমড়ি খায় গাছের মাথায়।
দেউনিয়া, ঐ পাড়ে রংধামালির বাধে গিয়া চিল্লান, শুইনবার পাবে, এই পার থিক্যা চিল্লালে ত আপনার হাতির পাল আবার ডাইনা শুরু করবি নে–, বেশ ভারী উঁচু গলায় পূর্ববঙ্গের উচ্চারণে কথা কটি কানে আসে।
গয়ানাথ কানে নেয় না। ততক্ষণে সাঁতারু দুজনের হাতে তিস্তার জল-ছিটকনো চোখে পড়ে। গয়ানাথ আবার চিৎকার করে–সরি যা, বায়ে সরি যায়, সতের নম্বর দাগ ধর, ধর-দুজনের মধ্যে যে এগিয়ে ছিল সে সত্যি বয়ে ঘুরে যায় একটু, প্রথমে বোঝা যায় না, কিন্তু তার মাথা নিশ্চিত ভাবে বায়ে ঘোরে–ঐঠে একখান পুকুর আছে, ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের সঙ্গে অংশ বন্দোবস্ত, ঐঠে হাতির পাল। জল-খোয়ায় তানে আসিলে হামরালা কিছু করিম না। হে-এ-এ বাঘারু, ডাইনে ঘুর, ডাইনে ঘুর, সিধা আয়।
গয়ানাথ সুহাসকে যেন সময় দেয় সাঁতরে-সাঁতরে লোকটার ঘোরাটা দেখতে ও তার একটা আন্দাজি মাপ নিতে। তারপর বলে, এইঠে শুরু হইল স্যার, সিদাড়োবা, হাতিডোরা, বাঘাড়োবা।
