লোকটি চলে যাওয়ার পর ভিড়া একটু আলগা হয়। অনেকে ওর সঙ্গে-সঙ্গেই উত্তর দিকে চলে যায় ঝোঁপের আড়ালে-আড়ালে। আবার অনেকে ঐ জায়গাতেই বসে পড়ে, হাঁটু জড়িয়ে হেলে, আর কেউ-কেউ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বিনোদবাবু, সুহাস আর গয়ানাথকে লক্ষ্য করে।
স্যার, আপনি ত এই জিলার ম্যাপট্যাপ সব দেখি নিছেন?
জেলার? হ্যাঁ। কেন?
না, এমনিই, ধরেন, হামরালা ত তিস্তার খুব পাখে খাড়ি আছি, আমাদের পাছত, মানে ধরেন কি না আরো উত্তরে আর পুবে চালসা, হায়হায়পাথার।
হ্যাঁ, সে ত জানিই।
সে ত জানিবেনই স্যার। আপনারা না জানিলে কায় জানিবে? আর এই যে তিস্তাখান, এর সরাসরি ঐ পারে, পচ্চিমে, বৈকুণ্ঠপুর ফরেস্ট। এই তামানটাই ত ফরেস্ট আছিল–সেই চালসাঠে হেই বোদাগঞ্জ।
তখন নদী ছিল না?
সেইটাই ত বলি স্যার, নদী থাকে, ফরেস্টও থাকে, মৌজাও থাকে, কিছুই যায় না–
.
০২৭.
জমি জরিপ : গয়ানাথী পদ্ধতি
গয়ানাথ নদীর দিকে আঙুল দেখায়। আর সুহাস দেখে, দূরে নদীতে দুজন মানুষ ঘাসকুটোর মত ভেসে যাচ্ছে। সুহাস একটু অপ্রস্তুত চিৎকারই করে ওঠে, আরে আরে।
ছাড়ি দেন স্যার, অ ত বাঘারু।
মানে? জিজ্ঞেস করেই সুহাস যেন বুঝে ফেলে, কী ব্যাপার, এরা কি নদীতে নামল নাকি?
হ্যাঁ স্যার। যেইঠে এ্যালায় ভাসি যাছে ঐঠে ত মোর এই মৌজাখান শুরু।
তাই বলে আপনি এই বর্ষার তিস্তায় ওদের নদীতে নামালেন?
ও ত বাঘারু স্যার, এ্যালায় উঠি আসিবে। আর মুই ত এক বাঘারুক নামিবার কইছি; আর-একটা কায় নামিছে রে? গয়ানাথ গলা তুলে জিজ্ঞেস করে।
মইনুদ্দিন। ডোয়া-ডাবরির।
অ? মইনুদ্দিন। অয় ত চ্যাম্পিয়ন সাঁতারু স্যার। এ্যালায় মোর কাথাটা শুনেন স্যার। ঐ যেইঠে বাঘারু আর মইনুদ্দিন এ্যালায় পাক খাছে–ঐঠে বৈকুণ্ঠপুরের বোদাগঞ্জ আর এই আপলাদ এক হয়্যা আছি, মোর বুড়া ব্যাপার, মানে মোর ঠাকুরবাবার, মানে ঠাকুরদাদার মৌজাখান ঐঠে আছিল। কিন্তুক মুই এ্যালায় কি কছি যে ঐ যে মৌজাখানঐঠে মোর নামে লিখি দেন? মোরঠে ওর দলিল আছে, ঠিকঅ। কিন্তু ঐঠে ত নদী। তিস্তা নদী। ঐ নদীখান ত আমি মানি নিছি। কিন্তু তাই বলি কি এইঠেও নদী মানিব্বর নাগিবে? বলে সে পাড়ের তলায় জল দেখায়–এইঠে নদী না হয়, বর্ষার জল। বাঘারু এইঠে আসি গেলে দেখিবেন এইঠে জল নাই, সোতা নাই। যার জল নাই, সোতাও নাই–সেইটা কি নদী হবা পারে? এইটা নদী না হয়। এইটে আপনার দাগ নম্বর দিবা নাগিবে।
এতক্ষণে সেই পুরো ভিড়টাই নদীর পাড়ে ঘেষাঘেষি করে ওদের সাঁতার দেখছে। সুহাসের কেমন অপ্রস্তুত লাগে।
গয়ানাথ তাকে সঁতারে ফাঁসাবে সে ভাবতেও পারে নি। বিনোদবাবুও কি পারেন নি? নাকি তাঁর সঙ্গে গয়ানাথের বোঝাপড়া হয়ে গেছে কোনো! এই দুজনকে তার সামনে নদীতে নামানোর পেছনে গয়ানাথের কোনো মতলবও থাকতে পারে। যদি ঐ দুইজনের কিছু হয়? গয়ানাথের মতলবটা কী? সরকারি অফিসার হিশাবে তাকে কি কোনো কিছুর সাক্ষী রাখতে চাইছে? কিন্তু এখন কি সুহাস এখান থেকে সরে যাবে? সেটা যাওয়া যায়? ঐ লোকদুটো ওঠার আগে?
সুহাসের বাঁ পাশে গয়ানাথ। সুহাস তাকে বলে, আপনি এভাবে সময় নষ্ট করছেন কেন? আমাদের আজ সার্ভের প্রথম দিন। আমাদের ড্রাফট বেরলে আপনি যা প্রমাণ-সাক্ষ্য দেয়ার তা দিতে পারতেন। ওদের উঠতে বলুন।
ও ত এলায় উঠি আসিবে। কিন্তু তার টাইম ত দিবা নাগিবে। ওরা কী আর স্রোত কাটাইয়া আসিবার পারিবে? স্রোত ধরি-ধরি আসিবার নাগিবে।
এই তিস্তাটাকে আজ সকাল থেকে কতবারই না দেখতে হচ্ছে সুহাসকে। মাঝে-মধ্যে ত সে এমনিও তাকিয়ে-তাকিয়ে দেখল। কিন্তু তিস্তার পেটে গয়ানাথের জমিতে গয়ানাথ তার দখলের প্রমাণের কথা তুলেছে যখন থেকে, যেন এই নদী আসলে নদী নয়–গয়ানাথের জোত, তখন থেকেই তিস্তা যেন আর দৃশ্য থাকছিল না, হয়ে উঠছিল তার এই সার্ভেরই ঘটনাস্থল। আর, এখন তিস্তা নদীর এই দিগন্ত-ছাপানো বিস্তারে, ঐ দুটো প্রায় অদৃশ্য মানুষ জলের ফেনার মত ভেসে যেতে-যেতে তিস্তাকে যেন ঢুকিয়ে দিচ্ছিল সার্ভে ম্যাপের লাইনের মধ্যে। সুহাস আবার বলে, ওদের পাড়ে উঠতে বলুন।
উঠিবার বলিলেই কি আর উঠিবার পারিবে স্যার? এ ত স্রোতে ভাসি-ভাসি ঘুরি-ঘুরি উঠিবার লাগিবে। উজানে গিয়া নদীতে নামিয়া শরীরখান ছাড়ি দিছে। এলায় ভাটিত গিয়া, ধরেন কেনে মাইলটাক ভাটিত গিয়া, বায়ত মোড় নিবার পারিবে, ঐঠে একটা চরা আছে। সেইঠে সাঁতার কাটি এইঠে আসিবে।
সুহাস দেখে তিস্তার ভেতরে লোক দুটিকে আর দেখা যাচ্ছে না। সে তাদের মাথায় চুলটকুও দেখতে পাচ্ছে না। কিন্তু তার পেছনের ও পাশের সেই ভিড়ের কেউ আঙুল তুলে দেখাচ্ছে–ঐঠে ঐঠে, ভাসি গেলাক, আগত বাঘারু, হে-ই ডুবি গৈলাক হে। ঐ আঙুল ধরে-ধরে তাকিয়ে সুহাস দু একবার দুটো কাল বিন্দু দেখতে পায় বটে কিন্তু দেখামাত্র ঐ কাল বিন্দু দুটি এত দূরে ভেসে যায়, সে আর চোখ ঠিক রাখতে পারে না। কিন্তু যখন দু-এক মুহূর্তের জন্যে দেখে, তখন তার মনে হয় না ওরা কখনো ফিরতে পারবে, বা ফেরা সম্ভব–তিস্তার এই ধূসর বিস্তারে ঐ দুটি কাল বিন্দু এতই অবান্তর। হে-ই আর দেখা না যায়, চরটা পাই গেইসে।
কে-একজন মদেশিয়া ভাষায় জিজ্ঞাসা করল, দুই মানুষ চর পাই গেলাক?
