এই সরি যা, সরি যা-বনমোরগের গলায় গয়ানাথবাবুর এই চিৎকারটা দঙ্গলের ভেতর থেকে আগে শোনা যায়। তারপর সামনের সারির লোকজন একটু ফাঁক হয়ে যায় আর সেই ফাঁক গলে পেছন থেকে গয়ানাথ এদিকে আসতে গিয়েও আটকা পড়ে যায়। তাকে দেখতে না পেয়ে সামনের একজন বায়ে সরে ফাঁকটা বন্ধ করে দেয়। গয়ানাথকে কাত হয়ে, আগে মাথাটা বের করে, তারপর পিছলে, বেরিয়ে আসতে হয়। তার কাপড়ের একটা দিক ভিড়ের ভেতর কোথাও আটকে যায় বলে তার উরু পর্যন্ত খুলে যায়। পাছে কাপড়টাও খুলে যায় তাই গয়ানাথ কাপড়টা ধরে থাকে। ভিড়ের ভেতর থেকে কেউ খুঁজে পায় না কাপড়টা কোথায় আটকেছে। আর ঐ অবস্থায় গয়ানাথ বনমোরগের গলায় চিৎকার করে ওঠে, শালো চুতিয়ার ছোঁয়াগিলান, শালো জঙ্গলত আসি জঙ্গলিয়া হবা ধইচছিস, পাছত না দেখিস কায় আছে আর কায় না-আছে? এইঠে কি সার্কাস আসিবার ধইচছে, না, নাটঙ্গি হবা ধইচছে?
ততক্ষণে ধুতি গয়ানাথের কাছেই ফিরে এসেছে। গয়ানাথ সুহাসের সামনে দাঁড়িয়ে দঙ্গলটাকে আবার গালাগাল করে। তার খর্বতার জন্যেই ভিড়টার মুখোমুখি তাকাতে তার ঘাড়টা অনেক হেলাতে হত। অতটা হেলিয়ে এতটা রাগা যায় না। বা, ঘাড় হেলিয়ে গলার এই স্বরটা বের করা তার পক্ষে সম্ভব নয়। তাই ভিড়টার সামনে দাঁড়িয়ে, ঘাড় নুইয়ে, মাটির দিকে তাকিয়ে, গলার সবচেয়ে বেশি যে-জোর দেওয়া সম্ভব সেই জোর জোগাড় করে, গয়ানাথ গালাগালি চালাতে থাকে–কায় আসিবার কইছে সগাক? সগায় আসি গেইছে শালো ভূতের দল। শালো পিপিড়ার নাখান নাইল বানাও, নাইল করি চলো, শালো গরুর দল।
গয়ানাথের প্রথম চিৎকারে সবাই একটু ঘাবড়ে গিয়েছিল। কিন্তু কাপড়টা আটকে যাওয়ায় সবারই একটা কাজ জুটে গেল। আর, কোথায় আটকেছে সেটা খুঁজে না পেয়ে কাজটা বেড়ে গেল। এর ভেতর কাপড়টা পুরোই খুলে যেতে পারে গয়ানাথের এই ভয় দেখে সবাই মজাও পেয়ে যায়। এখন, গয়ানাথের মাথানোয়ানো চিঙ্কারের ওপরে ভিড়ের লোকজন এ ওর পায়ে ধাক্কা দিয়ে হাসে। কিন্তু হেসে ফেলে এ ওর আড়ালে মুখ লুকোতে চেষ্টা করে। ভিড়ের ভেতরে কেউই যে গয়ানাথকে দেখতে পায় নি, আর গয়ানাথই যে ভিড়ের আড়াল থেকে সামনে বেরতে পারছিল না–এর চাইতে বড় মজা ভিড়ের পক্ষে আর কী হতে পারে?
গয়ানাথ ওয়াক থু করে সশব্দে থুতু ফেলে। কোঁচা দিয়ে মুখটা ও ঠোঁটটা মুছে নিয়ে খুব দ্রুত কোঁচার তলাটা আবার উল্টো করে তুলে শার্টের নীচে গুঁজে দেয়। তারপর, আবার মুখটা নামিয়ে কোঁচাটা একটু তুলে মোছে। এ সবটাই সে করে সুহাসের দিকে পেছন ফিরে, ভিড়টার সামনে দাঁড়িয়ে, যেন ভিড়টা তার অন্দর। শেষে ভিড়টার দিকে পেছন ফিরে সুহাসের মুখোমুখি দাঁড়াবার আগে সে সামনের সারির লোকগুলোর চোখে চোখ রেখে নিজের মূল কণ্ঠস্বরে হিসিয়ে ওঠে, মহিষের বাথান।
সুহাস বসে পড়েছিল। বসেই থাকে। সে গয়ানাথকে জিজ্ঞাসা করে না। তার জিজ্ঞাসা করার কিছু নেইও। তা ছাড়া, সুহাস বোঝে, গয়ানাথ একটু আগে একা-একা, ধীরে-ধীরে কথা বলে, সুহাসদের সামনে নিজেকে বেশ ভাল ভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল, ফলে কিছুটা জোরও পেয়েছিল। এখন, যে-ভিড়টা তার সাক্ষ্য-প্রমাণ তাতেই সে চাপা পড়ায় তার এত চেষ্টা নষ্ট হল। এখন, সুহাসও তাকে আর জোর ফিরে পাওয়ার সময় দেবে না। তাকে তার প্রমাণ সোজাসুজি হাজির করতে হবে। যে-প্রমাণই হোক, সুহাস কী বলবে ঠিক করেছে–আপনার কথা শুনলাম, আমাদের যা সিদ্ধান্ত তা ড্রাফটে, খশড়ায় থাকবে। তখনো দেখে যদি আপনার আপত্তি থাকে দরখাস্ত করবেন।
গয়ানাথ বলে, স্যার।
হ্যাঁ, কই কী এনেছেন? সুহাস হাত বাড়ায়।
প্রমাণ দেখাম, স্যার? গয়ানাথ জিজ্ঞাসা করে।
প্রমাণ দেখাবেন বলেছেন আপনি, দেখাবেন কিনা সেটা ত আপনার ব্যাপার, সুহাস আইনি ভাষায় কথা বলে।
স্যার, মুই ডাকিছু দুই জনাক, ইমরা সগায় আসি গেইসে।
সে আসুক না। কী দেখাবেন দিন না।
আপনি কিছু মনে করিবেন না স্যার।
কেন?
এই জংলিগিলান এই জঙ্গলের ভিতর চলি আসিছে।
তাতে আমার কাজের ত কোনো অসুবিধে হচ্ছে না–আপনি কী দেখাবেন, দেখান না।
দেখাছি স্যার, কিন্তুক মোর কুনো দোষ নিবেন না।
দোষগুণের ব্যাপারই নেই কিছু। এ ত আইনের ব্যাপার।
না, এই জংলিগিলান আসি গেইসে।
ঠিক আছে, দিন না কী দেখাবেন।
হে-এ-এ বাঘারু, আবার বনমোরগের গলায় চিৎকার করে গয়ানাথ।
গয়ানাথের ডাক শুনে ভিড়টাকে ঠেলেঠুলে একজন সামনে এসে দাঁড়ায়। ভিড়টাকে পেছনে ফেলে সে বেশি দূর এগিয়ে আসে না বলে বোঝা যায় না, গয়ানাথের ডাক শুনে সেই সামনে এল কি না। গয়ানাথ বলে, যা কেনে, ঝট করি যা, মৌজার লাইনখান ধরি যাবি, বুঝিলু? নীরবেই সেই লোকটি উত্তর দিকে চলে যায়, নদীর পাড় ঘেঁষে, নদীভাঙার লাইন পরীক্ষা করতে একটু আগে যেদিকে সুহাস গিয়েছিল। সেই লোকটি এ রকম চলে যাওয়ার কিছুক্ষণ পর সুহাসের মনে হয়–আগে কি এই লোকটিই চেয়ার মুছছিল আর গাছে উঠেছিল? কিন্তু সেই লোকটিই কি? ভিড়ের দিকে তাকিয়ে সুহাস বুঝতে পারে না। এতবার গয়ানাথবাবুর মুখে এই নামটা উচ্চারিত হতে শুনেও সে যেমন লোকটির নাম বুঝতে পারছে না, তেমনি এই এত লোক সামনা-সামনি দল পাকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলেও সে চিনতে পারছে না–একটি মুখও। বা, একটি মুখ থেকে অপর মুখকে আলাদা করতে পারবে না।
