বিনোদবাবুও খানিকটা চুপ করে থেকে বিহুলের মত বলেন, হ্যাঁ, তাই ত স্যার। আপনি বললেন, আমিও আর ভাবলাম না, থেমে যোগ করেন, এখনো আমরা চলে যেতে পারি, ওরা ওখানে যাবে।
আচ্ছা এখানেই আসুন, যখন গেছেন বলে সুহাস সেই গাছটার ওপর বসে, হেসে বিনোদবাবুকে বলে, কি, মৌজার নাম বদলে দেবেন নাকি কী বললেন, গয়ানাথের জোত?
না স্যার, এমনি বলছিলাম, বিনোদবাবু যেন কৈফিয়ৎ দেন। কিন্তু সুহাস আবার বলে, মন্দ হত না নামটা–গয়ানাথের-জোত, এদিকে ত এরকম নাম থাকে।
হ্যাঁ স্যার, থাকে–
তাই কি সুহাসের মনে হচ্ছিল নামটা যেন তার শোনা, অনেকদিন আগে কেউ শুনিয়েছিল, স্মৃতিতে কোথাও আছেনকশালবাড়ি, বুড়ার জোত, মঙ্গলবাড়ি জোত, কালীর জোত? সেদিন এমন কোথাও চলে যাওয়ার বদলে, দশ বার বছর পরে, এখন, সুহাস বসে আছে এমন একটা জায়গায় যার নাম হতে পারে–গয়ানাথের জোত। সে ইচ্ছে করলেই এই নাম দিয়ে দিতে পারবে। দিয়ে দিতে পারে। আর গয়ানাথ জোতদার গেছে তার সামনে হাজির করার প্রমাণ-দলিল আনতে। সুহাস এখন জোতদারের বিচারক। এ ত সুহাসের একটা জিতই, বেশ বড় জিত। কিন্তু জয় বোধ করতে পারে না সুহাস, গয়ানাথের জোত এই একটা নামের অনুষঙ্গেই জয়বোধ উধাও হয়ে যায় তার মন থেকে। সে অপেক্ষা করে থাকে, গয়ানাথের। গয়ানাথ তাকে বসিয়ে রেখে গেছে, আবার ফিরে আসছে, দশ বছর আগে তাকে দেখে গয়ানাথ পালাতে-পালাতে এখন তাকে হাকিম বলে মেনে নিয়েছে। এখন গয়ানাথ আসছে–তার হাত দিয়ে এই নদী আর নদীর জল আর নদীর ভেতরের মাটি আর এই জঙ্গল সব গয়ানাথের বলে মানিয়ে নিতে। মেনে না নিলে আপিল হবে। আপিলের আপিল হবে। আপিলের আপিলের আপিল হবে। সেখানে সুহাস ত একটা ধাপ মাত্র। আত্মকরুণা থেকে নিজেকে বাঁচাতে সুহাস আবারও নদীর দিকে তাকায়। তাও ভাগ্যি তিস্তা গয়ানাথের এতটা জমি পেয়েছে–তাই সুহাস অন্তত জোতদারের হাকিম হয়ে বসতে পেরেছে। সুহাস আবার একটা কুটো ছেড়ে নদীর জলে। জোতদারবিরোধী মিত্রশক্তি, না, শ্রেণীসংগ্রামের মিত্রশক্তি, আবার বামফ্রন্ট সরকার কৃষকের মিত্র সরকার, আবার, সুহাস কৃষকের মিত্র হাকিম। চার পাশেই মিত্র। কিন্তু যার মিত্র, তাকেই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
.
০২৬.
ভিড় ও গয়ানাথ
অনেক মানুষের পায়ের চাপে পচা ভেজা পাতা দলে পিষে যাচ্ছিল। তার একটা হিস হিস শব্দ পাওয়া যায়। সুহাস তাকিয়ে দেখে বহু লোক আসছে। বিনোদবাবু বলেন, কী ব্যাপার, ওখানকার সবাইকেই নিয়ে এল নাকি?
তাই ত মনে হচ্ছে, বলে সুহাস ভাবে, আগে থাকতেই তৈরি ছিল নাকি। তা হলে সকাল থেকে সার্ভের ওখানে যে এত লোক জমা ছিল, সে সবই গয়ানাথের লোক? যেন গয়ানাথের কোনো বিপরীত পক্ষ আছে, এমন করে সুহাস ভাবে, কেউ নদীর লোক নয়?
সুহাস ভাঙা গাছের ওপর বসেই ছিল। সমস্ত দলটা এসে সামনে দাঁড়িয়ে যায়। সুহাস বসে সই তাকিয়ে থাকে। গয়ানাথকে দেখতে পায় না। তাতে যেন একটা যুদ্ধ-যুদ্ধ ভাব আসে। এখানেই বনের মধ্যে ত ছড়িয়ে যাওয়ার জায়গা নেই। ছড়িয়ে যাওয়ার জন্যে সবাই এখানে আসেও নি। বসার জায়গা নেই–বর্ষার জঙ্গলে। সমস্ত দলটাই ভিড় করে সামনে, দাঁড়িয়ে। তাতে, বাধ্য হয়েই ভিড়টাকে কয়েকটা লাইনে দাঁড়াতে হয়েছে। আর ভিড়টার মুখোমুখি একা-একা সুহাস, নদীকে পেছনে নিয়ে, বসে। বিনোদবাবু দাঁড়িয়ে, সুহাসের থেকে একটু দূরে, কিন্তু ভিড়ের সামনেই। এখানে, এরকম করে দাঁড়াতে হয়েছে বলেই সবগুলো মুখই মিশে গেছে। সাজানো-গোছানো ঠেকে, প্রায় ক্যালেণ্ডারের জাতীয় সংহতির ছবির মত সাজানো-গোছানোতামাটে মোঙ্গলীয় মুখের পাশেই খাটো নেপালি মুখের তীক্ষ্ণতা, পেছনে লম্বা সঁওতালি মুখ। সুহাস এখানে নতুন বলেই, ও এ-অঞ্চলের সঙ্গে তথ্যে আর ম্যাপে আর রিপোর্টেই তার পরিচয় বলে, এই মুখগুলোর পার্থক্য তার কাছে এত সহজে ধরা পড়ে। নইলে পোশাকে-আশাকে এ-ভিড়ের ভেতর বৈচিত্র্য এত কম যে লোকগুলিকে একটা ভিড় বলেই মনে হয়, আলাদা-আলাদা আদিবাসী-উপজাতির বলে মনে হয় না।
কিন্তু এতগুলো মানুষ এতটা ঘনিষ্ঠ হয়ে এই জঙ্গলের মধ্যে সুহাসের সামনে দাঁড়িয়ে, যেন, গয়ানাথ তাকে লোক জুটিয়ে ভয় দেখাচ্ছে। সুহাস উঠে দাঁড়ায়, তারপর একটু কড়া গলায় জিজ্ঞাসা করে, গয়ানাথবাবু কোথায়? হঠাৎ যেন সুহাস সতর্ক হওয়ার দরকার বোধ করে–এই জঙ্গলের ভেতর তাকে আর বিনোদবাবুকে এতটা আলাদা করে এনে কি গয়ানাথ কোনো ফাঁদে ফেলছে। বিনোদবাবুর দিকে তাকায় না সুহাস, কিন্তু বুঝতে পারে, তার ভঙ্গিতেও অনিশ্চয়তা আছে। সুহাস ভুলতে পারে না, তার ঠিক পেছনেই তিস্তা, বর্ষার। আর সামনে এত, মানুষ, আদিবাসী।
কিন্তু এত অনিশ্চয়তা-অস্থিরতা নিয়েও সুহাস সামনের এই মুখগুলোর দিকে তাকায়, এই যেরকম মুখের সমাবেশের স্বপ্ন বছর দশ বার আগে তারা দেখত নানা ঘটনার, ইতিহাসের, এখন মনে হয় রূপকথার, অনুষঙ্গে। ব্যক্তিত্ব নয়, সমষ্টিই যে-মুখের আয়তনে আর রেখায়, নাক-মুখ-চোখ-কানের মত ব্যক্তিগুলোর সব শারীরিকেও, খোদাই করা, তেমনি এত মুখের সারি সুহাসকে কোনো এক লুপ্ত সমাবেশের সামনে হাজির করে। কে জানত, এমন প্রতিপক্ষতায় তার এই আবিষ্কার ঘটে যাবে?
