সুহাস ফেরে। সে তার যুক্তি ঠিক করে ফেলেছে। যদি কোনো প্রমাণ হাজির করতে পারে, গয়ানাথ করুক। নইলে সে যা লিখল, তাই পাকা।
গয়ানাথ, বিনোদবাবু তার দিকেই তাকিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। সুহাস তাঁদের কাছে গিয়ে ড়ায়। দুজনের কেউই কথা বলেন না। সুহাস বলে, না গয়ানাথবাবু, নদী এই পর্যন্তই এসেছে।
গয়ানাথ যেমন দার্শনিক ভাবে শুনছিল, তেমনি শোনে। কথা বলে না। কিন্তু গয়ানাথ বা বিনোদ কেউ নড়েও না। সুহাস যখন বলতে যাবে, তা হলে চলুন বিনোদবাবু, তখনই বিনোদবাবু বললেন, স্যার, বলছিলাম গয়ানাথবাবু যখন এতই আপত্তি তুলছেন তখন আর-একবার দেখে নিতে ক্ষতি কী?
আমি ত সেজন্যেই দেখে এলাম। এটা নদীরই আউটলাইন। স্পিল এরিয়া নয়। গয়ানাথবাবুর যদি কোনো প্রমাণ দাখিলা থাকে তবে হাজির করুন, বিনোদবাবুর এই কথায় সুহাস একবার গয়ানাথের আর-একবার বিনোদবাবুর মুখের দিকে তাকায়। সুহাসও এই কথাটিই ভেবে রেখেছিল বলবে বলে, কিন্তু গয়ানাথ কোনো কথা বললে তার উত্তরে বলবে, নিজে থেকে বলবে না। বিনোদবাবু আগেই বলে দিলেন? প্রমাণের কথা একবার উঠলে আর পেছুনো যায় না। তবু বিনোদবাবু বললেন কেন? গয়ানাথবাবু সুহাসের কথা শুনতেই দাঁড়িয়ে থাকে। সুহাস বলে, আপনার কোনো প্রমাণ থাকলে, বলুন।
আমাকে একটু টাইম দেন স্যার। মোক ঐঠে যাবা নাগিবে। তারপর প্রমাণ দিম।
নিশ্চয় দিম। হ্যাঁ, আপনি যান। তাড়াতাড়ি আসবেন।
হ্যাঁ স্যার। যাম আর আসিম। যাম আর আসিম।
গয়ানাথ মুহূর্তে সরসর শব্দ তুলে পাতা কাদার ভেতর দিয়ে বেরিয়ে গেল।
.
০২৫.
দশ বছর আগে-পরে ‘গয়ানাথের জোত’
সুহাস গয়ানাথের প্রস্থানের দিকে তাকিয়ে আছে। গয়ানাথ অবিশ্যি নেহাতই ছোটখাট, পাতলা। তার যাতায়াতে কোনো শব্দ না-হওয়ারই কথা। কিন্তু গয়ানাথ যেন তার চাইতেও নিঃশব্দে ফরেস্টের মধ্যে মিলিয়ে গেল খুব দ্রুতগামী জন্তুর মত। এতক্ষণ সুহাস, গয়ানাথের এমন তৎপরতা আছে, ভাবতেও পারে নি। সে খুব আস্তে জিজ্ঞাসা করে, কে ভদ্রলোক?
গয়ানাথ জোতদার। রায়বর্মন। তিনপুরুষের। দেখেন নি? এই মৌজার সবটাই ত ওর। এর নীচের মৌজাও আগে ত ওদেরই পুরোটা ছিল।
গয়ানাথ রায়বর্মন। সুহাস যেন কোন স্মৃতি থেকে নামটা মনে আনার চেষ্টা করছে। দলিলদস্তাবেজে নয়, রেকর্ডে নয়, দাখিলাপচায় নয়, গয়ানাথ নামটা তার কারো মুখে শোনা হয়ে আছে, এর কি ফরেস্টেরও দখল আছে না কি?
কোথায় নেই স্যার,? এটা ত গয়ানাথের জোত বলেই সবাই জানে। আপনি মৌজার নাম বদলেও দিতে পারেন, মৌজা গয়ানাথের জোত-ও লিখতে পারেন। কেন? তা লিখব কেন? সুহাস একটু আনমনা ভঙ্গিতে বিনোদবাবুকে বলে বটে কিন্তু কথাটার মধ্যে একটা কোনো জোর ছিল। বিনোদবাবু তাড়াতাড়ি বলেন না, স্যার, এমনি বলছিলাম।
এখন সুহাসের কাছে যেন অনেক কিছুই পরিষ্কার হয়। একটু হেসে নদীর দিকে আঙুল দেখিয়ে বলে, ওঁর জমি সব? বিনোদবাবু একটু হেসে মাথা হেলান। তা হলে নদীরও দোষ, আমাদেরও দোষ।
গত বারের সেটলমেন্টের পঁচিশ বছর পর এই সেটলমেন্ট হচ্ছে। মাঝখানে আটষট্টির বন্যার মত ঘটনা ঘটে গেছে। তিস্তা ব্যারাজের কাজ শুরু হবে। এই সার্ভে তিস্তা ব্যারাজের জন্যেও হচ্ছে। তিস্তা ব্যারাজ বাধা হলে নদীর অনেক কিছু বদলে যাবে। এখন, এই সার্ভেতে এই মৌজার ম্যাপ থেকে ঐ পুরনো দাগনম্বরগুলো চিরতরে বাদ চলে যাচ্ছে। হালের দাগ নম্বর নতুন করে শুরু হবে। তার মানে নদী যা খেয়েছে তা নদীরই সম্পত্তি হয়ে গেল। এখন যদি দু-চার আট-দশ বার-চোদ্দ বছর পর এখানে চর জাগে, বা ব্যারাজের ফলে পাড়টা আরো এগিয়ে যায় তা হলে তাতে গয়ানাথের কোনো অধিকার থাকবে না, পুরোটা পোয়াস্তি হয়ে যাবে। যার ইচ্ছা সেই তখন দখল নিতে পারবে ও সরকারও সেই পোয়াস্তির বন্দবস্ত যার সঙ্গে ইচ্ছা তার সঙ্গে করতে পারবে। কিন্তু যদি নদীর সীমা এতদূর পর্যন্ত মানা না যায়, পুরনো মৌজা ম্যাপটাই যদি চালু থাকে, তা হলে পঁচ-সাত, আট-দশ, বার-চোদ্দ বছর পরও চর পড়লে গয়ানাথ আইনত বলবে এটা চর নয়, তার নিজ খতিয়ানের অন্তর্গত কায়েম। আর, এবারের সেটলমেন্টে একজনের নামে একটা খতিয়ানই দেয়া হবে। মানে, ঐ নদীর তলের মাটির জন্যেও হালখতিয়ান পেতে চাইছে গয়ানাথ। সুহাস কয়েক পা এগিয়ে ঝুঁকে, নদীর পাড়টা আরো মন দিয়ে দেখে। এইবার নদীর এই ভগ্ন লাইনের একটা অন্য ব্যক্তিগত তাৎপর্য ধরা পড়ছে। এখানে যে-জমি ভাঙছে সেটা ফরেস্টের। কিন্তু আরো দক্ষিণে-দক্ষিণে যে-জমি ভাঙছে বা ভেঙেছে সে সব গয়ানাথের জমি। তিস্তার জলের তলের মাটিটা আর প্রাকৃতিক থাকে না, জলের তলার রহস্য থাকে না, অন্তস্রোতে আর খরস্রোতে যেন অমানবিক কোনো শক্তি থাকে না। তিস্তার জল, বিশেষত এই তীরবর্তী জল, তিস্তার মাটি, বিশেষত এই তীরবর্তী মাটি একটা খুব প্রাকৃত মানবিক শক্তি হয়ে ওঠে। ঝুপ ঝুপ করে যে-মাটি পড়ে, বা স্রোতের আঘাতে-আঘাতে যে-তীরের তলা ফাঁক হয়ে যায়, সেই সব মাটি আর তীরভূমি গয়ানাথের।
সুহাস তিস্তার দিকে তাকিয়ে থাকে। কিন্তু দূরের বিস্তারের অতিঅনির্দিষ্টতা থেকে চোখ গুটিয়ে আনে প্রায় চোখের তলার নিকট নির্দিষ্টতায় তিস্তার জল যেখানে ঘনিষ্ঠ মিত্র। সুহাস খুব কাছে তাকায় কাদাগোলা জলে ফেনার একটা সূক্ষ্ম শাদা রেখা, দুলছে, কয়েক হাত দূরে তিস্তার পাহাড় ধসানো স্রোতের টান এখানে পৌঁছয় না। মাটি থেকে একটা কুটো তুলে নিয়ে সুহাস ঐ জলে ছুঁড়ে দেয়, যেন পরিচিত আত্মীয়তায়। তারপর বিনোদবাবু বলে, তা, ওর যা প্রমাণ তা ওখানেই দিতে পারেন, এখানে আসার দরকার কী?
