না, না, তা লিখিবার কাম কী আছে স্যার, কিছুই লিখিবেন না, য্যানং আছে, থাকুক কেনে।
তা হলে ত সেটা রেকর্ড করতে হবে। আমি দাগ নম্বরই বা দেব কোথায়, আর দাগ নম্বর শুরুই বা করব কোথায়?
সে ধরেন, ফরেস্টের জমি হাসিল হছে যেইঠে।
ফরেস্টের জমি হাসিল হয়েছে, মানে?
মানে, আগে ফরেস্ট ছিল, এ্যালায় চাষ হওয়া ধরিছে, সেটা ত আপনারা চাষজমি ধরিবেন?
কে চাষ করছে? ফরেস্টের জমি ত ফরেস্টের। কারা চাষ করতে দিয়েছে? বরং উল্টোটা হতে পারে, আগে আবাদ ছিল, এখন ফরেস্ট হয়েছে।
হ্যাঁ। তাও হবা পারে। কিন্তু এইঠে ত সব জমিই ফরেস্টের ছিল, তার থিকা চাষ হওয়া ধরিছে।
বিনোদবাবু এতক্ষণে মুখ তুলে বলেন, সাত পুরনো কথা তুলে কী লাভ? সে যখন ফরেস্ট হাসিল হত, তখন হত। এখন আমরা দেখছি নদীটা এতদূর এসেছে, সেটা লিখব না? বিনোদবাবু উঠে দাঁড়ান, তারপর সুহাসকে বলেন, আপনি বুঝলেন না স্যার, ফরেস্টের জমি যখন গয়ানাথবাবুরা চাষ করবেন তখন সেটা চাষে দেখাতে হবে আর গয়ানাথবাবুর জমি যখন নদীর ভেতরে যাবে তখনো গয়ানাথবাবুরই থাকবে। কী বলেন গয়ানাথবাবু?
কথাটা আপনি সিধা বলিলেন আমিনবাবু, কিন্তু ঠিকই। জমিনের ত আর পাখনা নাই যে উড়ি যাবে, যেখানকার জমি সেইঠেই থাকে, সে জমির উপর জঙ্গলই হোক আর জলই হোক।
সুহাস বুঝতে পারে পাশাপাশি থেকে, পিছু-পিছু এসে, প্রথমে আনমনা ভাবে, এখন বেশ জোর দিয়ে গয়ানাথবাবু একটা কোনো কথা প্রমাণ করতে চাইছেন। সে কথার সমর্থনে আইনের প্রকাশ্য কোনো বিধান নেই বলেই তার কথাটা হয়ত এতটা ঘোরানো-প্যাচানো মনে হচ্ছে। কিন্তু হয়ত আইনের সমর্থন নিহিত আছে বা থাকতে পারে। সুহাসের সামনে কথা বলছে বলেই এ-রকম ভাবে বলছে। কিন্তু তাতে লাভটা কী আপনার? মানে আপনাদের? আমরা যদি নদীটা এঁকে নাও নেই, তা হলেও ত নদীটা এখানেই থাকবে।
কিন্তু নদী ত এইঠে সরি যাবে স্যার, আর মাস দুই বাদেই নদী সরি যাবে।
না, সে ত যাবেই, বর্ষায় নদী যতটা আসে, শীতে ত আর ততটা থাকে না, কিন্তু আপনি শুধু শীতের নদীটাকেই নদী বলবেন নাকি, বর্ষার নদীটাও ত নদী, বর্ষার জল যাবে কোথায়?
সে ত স্যার, যদি আপনি এইটাক নদী বলি ডিক্লার করি দেন, নুটিশ দেন, তার বাদেও ত নদী আরো ছড়ি পড়িবার পারে, বৃষ্টি বেশি হইলেও বাড়িটাড়িত ঢুকিবার পারে, তখন কি কহিবেন, যে-যে-টাড়িত নদীর জল সিন্ধাইছে স্যালায় সর্ব টাড়ি নদীবাড়ি হয়্যা গেইল? গয়ানাথের এই কথা শুনে সুহাস বুঝতে পারে–উত্তর দেয়া মুশকিল এমন কথা না-শোনা, আর নিজের পক্ষে জোরদার কথা বার বার বলা–তর্কের এই বেশ অভিজ্ঞ প্যাঁচ গয়ানাথের ভাল আয়ত্তে আছে। সুহাসের ঐ সন্দেহ কেটে যায় যে গয়ানাথ তার কথাটা হয়ত বলতে পারছে না। বিনোদবাবু বলে ওঠেন, আমরা এখন যা দেখছি তাই লিখছি। এর পর অ্যাটেশটেশনের সময় বলবেন, তখন ত আর বর্ষা থাকবে না, যাচের সময় বলবেন, ভুল হলে ভুলের লিস্ট বের হবে। চলেন স্যার, আমাদের দেরি হয়ে যাবে। এক জায়গাতেই ত সময় গেলে চলবে না।
সে ত করা যাইবেই আমিনবাবু। কিন্তু, এইঠেও ত স্যারের কাছে মোর কাথাটা কহা যায়। যায় কি না-যায়?
সুহাস তাড়াতাড়ি বলে, নিশ্চয়, নিশ্চয়, আপনি বলুন না, আমি ত শুনছি আপনার কথা।
সুহাস টের পায় গয়ানাথ তার মত করে আইনের বিধান শুনিয়ে দিল। বিনোদবাবুও চুপ করে যান। গয়ানাথ তখন বলে, মোর কাথাটা ত সিধা স্যার, আপনারা যেইঠে নদী আঁকিলেন, ঐঠে নদী নাই, ঐটা বর্ষার জল।
যেন গয়ানাথের কথাটা যাচাই করে দেখার জন্যই সুহাস নদীর দিকে ফেরে। নদীর আরো একটু কাছে যায়। তারপর নিচু হয়ে সে পাড়ের মাটি ভাঙার লাইনটা দেখে। সে এবার ঐ লাইন বরাবর উত্তরে হাঁটে, নিচু হয়েই পাড় ভাঙার লাইন দেখতে-দেখতে, পরীক্ষা করতে করতে। মাঝখানে সেই উপড়নো গাছটার বাধা। ফলে সেই গাছটাকে ঘুরে পার হতে হয়। গয়ানাথ আর বিনোদবাবু পেছনেই থাকেন। সুহাস বুঝে গেছে গয়ানাথ আইনের জোরেই কথা বলতে চায়, সুতরাং সুহাসও তার যুক্তিটা আর-একটু যাচাই করতে চায়। সে একটা বাক পর্যন্ত দেখতে চায়–যে বাকটা এর চাইতেও ডাইনে নিয়ে গেছে নদীকে। এই পাড়ের লাইন নিশ্চিতভাবেই নদীর পাড়ভাঙার লাইন। বর্ষার জলে নদী যদি এতটা উঠে এসে থাকে তা হলে কি এ ভাবে পাড় ভাঙত? সুহাস নদীর পাড়ভাঙা খুব একটা দেখে নি। সামান্য দেখে থাকলেও, মাত্র সেটুকুর ভিত্তিতে তার পক্ষে এমন বর্ষা তার ধারণারও বাইরে। সুহাস সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে তিস্তার দিকে একবার তাকায়। তার সামনে একটু-আধটু পাতলা ঝোঁপঝাড়। তার ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছে তিস্তা। দূর ঘোলাটে বিস্তারের ওপর আকাশের আর আলোর বিচিত্র সমিপাতে ছায়া আর রোদেরও কত অজস্র বিন্যাস। সেই বিন্যাসের মধ্যে কোথাও স্রোত নেই, ভাঙন নেই, আক্রমণ নেই, আওয়াজ নেই। সুহাসের ইচ্ছে হল, সে তিস্তার আওয়াজ শোনে। চোখ বুজে সে তিস্তার দিকে মন দেয়। প্রথমে ফরেস্টের ঝিঁঝির ডাকের সঙ্গে মিশিয়ে শুনতে পায়। তারপর ধীরে ধীরে সে শব্দ আলাদা হয়ে যায়। আলাদা হতে-হতে যেন জলতলের নির্ঘোষটা স্রোতের ওপরে উঠে আসে। তিস্তা যেন আবার, জলস্রোত থেকে ধ্বনিস্রোত হয়ে যায়। অবিরত ধ্বনি। বোল্ডারের সঙ্গে বোল্ডারের ঘর্ষণের কামানগর্জন মাটি ভেদ করে উঠে আসছে। অদৃশ্য জলগর্ভ জীবন্ত হতে থাকে। সুহাস চোখ খোলে। আওয়াজটা অনেকখানি মিলিয়ে যায়।
