তারপর আড়ালে পড়ে যায়।
.
২১২.
পাহাড়, খাদ, নদী, ব্রিজ
ট্রাকটা একটা আওয়াজ করে খানিকটা উঁচুতে ওঠে, তারপর বা দিকে ঘুরে যেতেই সামনে চকচকে এক কাল রাস্তা আর ডান দিকে, হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যায় এমন দূরত্বে পাহাড়, নীল পাহাড়। মাদারি, তার সানে যারা বসেছিল তাদের দুজনকে দুহাতে একটু সরিয়ে মাঝখান দিয়ে মাথাটা গলিয়ে দেয়, তারপর ডান দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে একবার পাহাড় দেখে, আর একবার রাস্তা দেখে। মাদারি যেন বুঝে উঠতে পারে না, তার পক্ষে কোনটা বেশি আকর্ষণীয়। রাস্তা ত তার কাছে নতুন কিছু নয়, ফরেস্টের মতই চেনা, তবু এ রাস্তাটা নতুন লাগে কেন? খোলা রাস্তা–ওপরে আকাশ আর নীচে রাস্তা, এটা ত সে সেই বিন্নাগুড়ি থেকেই দেখে আসছে। কিন্তু এখানে রাস্তাটা যেন আরো খোলা হয়ে যায়–কারণ বা দিকে খাদ, সেই। খাদের ভেতর দিয়ে নদী বয়ে যায় মাঝে-মাঝেই, আর, সেই খাদটা দিয়ে বহুদূরে তাকানো যায়–বহুদূরে নীলচে ফরেস্ট। সঙ্গে সঙ্গে ডান দিকে মেঘের মত পাহাড়। খানিকটা যেতেই মাদারি বোঝে পাহাড়টা, খুব কাছাকাছি নয়। কিন্তু পাহাড়ের গা বেয়ে যে-থিকথিকে জঙ্গল নেমে এসেছে সেটা বোঝা যায় অথচ তার সবুজ রঙ চেনা যায় না। ট্রাকটা নতুন রাস্তায় এত জোরে চলে যে মনে হয় সঙ্গে সঙ্গে পাশের পাহাড়টাও দিক বদল করছে। মাদারি সামনের দুজনের ফাঁক দিয়ে তার গলা এতটাই বাড়ায় যে দুই। হাত দিয়ে তাকে সামনে ভর সামলাতে হয়। বায়ের যুবকটি বলে, কী দেখিছিস রে?
পাহাড়, পাহাড়
আগত দেখিস নাই কোটত?
না দেখি। এই এত উঁচা পাহাড়ত কায় থাকে?
মানষি থাকে—
নামিবার নাগে না? ঐঠে ঢুকে ক্যানং করি? এ্যানং ফরেস্ট যে নদীও সিন্ধাবার পারিবে না, নদীও ঢুকতে পারবে না–এমন জঙ্গল মাদারি বলে। লোকটি হাসে, এইঠে দেখাছে এ্যানং। ঐঠে তুইও যাবার পারবু।
মাদারি নিজে এরকমই একটা ফরেস্টের একেবারে ভেতরে থাকে কিন্তু সে ত কোনো দিন এতটা দূর থেকে সে-ফরেস্ট দেখেনি।
পারবু? মাদারি, যেন সম্ভাবনাটাকে যাচিয়ে দেখতে চায়। তারপর সেই পাহাড়ের দিকে তাকিয়েই গভীর প্রশ্ন করে, নামিবু ক্যানং করি, এ্যানং উচা?
পথ আছে, পথ ধরি নামিবু, ঐঠেও ত মানষি থাকে—
থাকে? মানষি? ঐঠে? মাদারি জিজ্ঞাসা করে, তারপর একটু চুপ করে গিয়ে নিজে অপরিবর্তিত থেকেই চেঁচায়, হে মা, মা-ই-গে-এ।
মাদারির মা সোজা হয়ে বলে, ক কেনে। কিন্তু মাদারি শুনতে পায় না। সে ওপর থেকে চেঁচায়, হে মা, মা-ই-গে-এ, পাহাড় দেখছু, উচা পাহাড়?
মাদারির কথায় ট্রাকের সবাই হেসে ওঠে। মাদারির মা আস্তেই জবাব দেয়, দেখছু। মাদারির জিজ্ঞাসায় সকলেই মাদারির মায়ের দিকে একবার তাকিয়ে নেয় যেন। মাদারির মা একটু অস্বস্তি বোধ করে–এতগুলো লোক তার দিকে তাকিয়ে আছে। সে চোখ নামায়, আবার চোখ তোলে।
মাদারির মা যেখানে বসেছিল সেখান থেকে দেখায় যেন পাহাড়গুলো পেছন থেকে ছুটে আসছে। তাতে অনেক সময়ই পাহাড়ের চূড়া দেখা যায় না, মনে হয় আকাশ পর্যন্ত ঢাকা পড়ে আছে পাহাড়ে। আবার, কোনো-এক সময় পাহাড়ের দেয়ালটা ভেঙে যায় যেন। বরং বা দিকে তাকালে সে দেখে টানা খাদ চলেছে, আর সেই খাদের ভেতরে, নদী, ঝোরা, চা-বাগান, চষা খেত, দূরে দূরে ফরেস্ট। নাগরাকাটার কাছাকাছি আসার পর দেখা যায়, আরো দুটো-একটা ট্রাক একই ভাবে চলেছে। তাদের কোনোটাকে এই ট্রাক পার হয়ে যায়, আবার কখনো পেছনের একটা ট্রাক, এই ট্রাকটাকে পার হয়ে যায়। পার হওয়ার সময় সেই আগের মতই হাত তুলে হৈ হৈ হচ্ছে, কখনো শ্লোগান বিনিময়ও হচ্ছে, কিন্তু, এই ট্রাকের লোকজন ত ততক্ষণে মাইল চল্লিশেক পার হয়ে এসেছে, প্রায় ঘণ্টা দেড়েক হল, ফলে এরা অনেক সময় হাত তুলেই সারছে।
বানারহাটের পর দূরে-দূরে ট্রাক দেখা যাচ্ছিল, কিন্তু, এই রাস্তায় ওঠার কিছুক্ষণ পর মনে হল সব ট্রাকই এই রাস্তা দিয়ে চলেছে। অনেক জায়গায় দাঁড়ানো ট্রাকের পাশেও লোকজন দাঁড়িয়ে। তারা ট্রাকে করে ব্যারেজেই যাবে, নাকি কোনো হাটে, নাকি ওখানকার পাতি তুলে ট্রাকে করে ওজনের জায়গায় যাবে, তা বোঝা যায় না। কিন্তু হাত নাড়ানাড়ি, একটু চেঁচামেচি হয়েই যায়।
সেই মাদারিহাট থেকে বেরিয়ে এই রাস্তাটায় পড়ার পর মনে হচ্ছে তারা সেই তিস্তানদীর ব্যারেজের কাছাকাছি যেন চলে আসছে। তিস্তা ব্যারেজের উদ্বোধনের দিন এই জলুশের কথা তারা যখন থেকে শুনেছে, টাড়ির বৈঠকে, লাইন মিটিঙে, হাট মিটিঙে, তখন থেকেই ত এই নদী, বাঁধ, জলের একটা কল্পনাকে তারা লালন করেছে। এই ট্রাকটা ত আসছে তোর্সা পার থেকে। তোর্সা থেকে তিস্তা। তিস্তার সঙ্গে ত তাদের দৈনন্দিন চেনাজানা নেই। সে-নদী তোর্সা থেকে বড় ও ভয়ংকর–পাহাড়টাহাড় ভেঙে, বনজঙ্গল উপড়ে, গ্রাম-শহর ভাসিয়ে চলে যায়। প্রত্যেক বছরই তাদের তিস্তার বন্যার কথা শুনতে হয়। সেই সব শোনা থেকে তাদের কাছে তিস্তা ব্যারেজের যে কল্পনা প্রশ্রয় পেয়েছে, এই পাহাড় আর এই খাদ, এই অপরিচিত প্রকৃতি যেন সেই কল্পনাটিকে সত্য করে তুলেছে। মনে হতে শুরু করেছে যে এই সব পাহাড়েরই একটা ব্রাক থেকে তিস্তা একেবারে আকাশ ছাপিয়ে নামছে, তাদের ট্রাকটা হঠাৎ সেদিকে মুখ করে ঘুরে দাঁড়িয়ে যাবে আর তাদের দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে দেখতে হবে, তিস্তা, এই পাহাড়গুলির মতই, তিস্তা ব্যারেজ।
