মাদারির মায়ের কাছে এই এত মিছিল, এত মানুষজন, এত হৈ-চৈ একদিক থেকে অর্থহীন হলেও সেই হাটখোলা থেকেই তার কেমন ভাল লাগছিল। প্রথম দিকে না–যখন সে আর মাদারি চা খায়। কিন্তু দেবপাড়ার দলটা এসে যাওয়ার পরই ঐ ভিড়ের মধ্যে ঘুরে-ঘুরে বেড়াতে তার ভাল লাগছিল। প্রত্যেকদিনই ত সকাল থেকে তাকে এরকম হটাই হাঁটতে হয় কিন্তু সে ত গাছপালার লতাপাতার গা ঘেঁষে-ঘেঁষে। আর যদি, সে ফরেস্টের ভেতর ঢুকতে কোনো-কোনো দিন একটু দেরিও করে, ঐ শ্যাওড়াঝোরায় তার ঘরের মধ্যেও ফরেস্টের গন্ধটা ত তাকে ছাড়ে না, এমন-কি ঘুমের মধ্যেও ছাড়ে না। সবুজের তীব্র এক কষা গন্ধ, তার সঙ্গে মিশে যায় ফরেস্টের ভেতর কত পচনের গন্ধ-শুকনো পাতা পচে, মৃত পশু পচে, কাল রাতে গাছ চাপা পড়া লতা পচে। তার সঙ্গে থাকে এমোনিয়ার ঝাঁঝ। আর মাদারির মাকে সেই মিশ্র গন্ধের মধ্যে সব সময় শ্বাস টানতে হয়।
সে যে এই গন্ধ সম্পর্কে সচেতন, তা নয়। এমনকি গন্ধটা যে আছে, তাও তার খেয়াল থাকে না। এরকম অপ্রয়োজনীয় খেয়াল রাখার অবকাশ তার জীবনযাপনে নেই। কিন্তু সেই হাটখোলা থেকেই এত মানুষের ভিড়ে ঘুরতে-ঘুরতে তার কখন যেন হালকা লাগতে শুরু করে, একটু হালকা ভাবে শ্বাসও টানতে পারে যেন। তার পর এই ট্রাকে এত মানুষজনের ভেতরে বসে রাস্তা দিয়ে মাইলের পর মাইল চলে আসতে-আসতে তার শাসটা আরো হালকা হয়, আরো হালকা। তার জীবন কাটানোর নকশা এমন নয় যে একটু দুঃখবিলাস করে, শ্যাওড়াঝোরার কথা তার মনেও আসে না, বা, তার বর্তমান এই মুক্তির সঙ্গে সে শ্যাওড়াঝোরার তুলনাও করতে যায় না, কিন্তু, তার বড় ভাল লাগে এত মানুষের সঙ্গ, এত মানুষের চামড়ার গন্ধ।
মাদারির মা ত মানুষের এই সঙ্গটাই পায় না। এখন, এই মিছিলে, এই ট্রাকে মানুষই তার কাছে প্রধান। যে-মানুষের কাছ থেকে তার দৈনন্দিনের আহার জোটে না বলেই সে ফরেস্টে গিয়ে গাছপালা পশুপাখি কীটপতঙ্গ আর নদীঝোরার সঙ্গে থাকে, সেই মানুষেরই গায়ের গন্ধ তাকে এক মুক্তির স্বাদ দেয়, তার এখনকার দৈনন্দিনের গন্ধের চাপ থেকে তাকে সরিয়ে আনে। সেই সরে আসাটা আস্বাদ করতে মাদারির মা, মাঝে-মাঝে গভীর শ্বাস টানে। একজন লোকও নেই যার সঙ্গে সে এখানে কথা বলতে পারে। হাটের দু-চারজন দোকানদার এলে হয়ত তাকে মাদারির মা বলে অন্তত চিনত, এখন, এক বাহাদুরই চেনে বা দরকার হলে ডাকতে পারে। তার নাম ধরে ডাকতে পারে এমন একজনও না থাকা এই ভিড়ে তাকে ত চুপচাপই বসে থাকতে হয়, এক কোণে। বা, হাটখোলায় যেমন ভিড়ের মধ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছিল, এই জলুশ যেখানে নামবে সেখানেও হয়ত একা-একা ঘুরেই বেড়াবে অথচ সঙ্গ পাবে, মানুষের।
যেমন মানুষের গায়ের গন্ধ থেকে মাদারির মা সঙ্গ পায়, তেমনি সঙ্গ পায় মানুষের আওয়াজ থেকে। ফরেস্টের প্রত্যেকটা আওয়াজ ত তার জানা। শুধু শ্যাওড়াঝোরায় তার পাতার ঘরের চারপাশের আওয়াজ নয়, তার ঘর থেকে অনেক দূরে ফরেস্টের ভেতরের আওয়াজগুলোও তার চেনা-মাদারির শ্বাসের মতন চেনা। ফরেস্টে কোনো আওয়াজ অকারণ ঘটে না। প্রত্যেকটা আওয়াজের একটা কারণ। থাকে, ইতিহাস থাকে। ফরেস্টের পশুপাখি পোকামাকড় এই প্রতিটি আওয়াজের কারণ ও ইতিহাস জানে, বোঝে। তাদের শরীর দিয়ে জানে, শরীর দিয়ে বোঝে। আর, শরীর দিয়েই সেই আওয়াজের অর্থের সঙ্গতিতে নিজেকে বদলায়। শরীর দিয়ে যে ফরেস্টের আওয়াজ চেনে না আর শরীর দিয়ে সে-আওয়াজের প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে না–সে ফরেস্টে থাকতে পারে না। কিন্তু মাদারির মা ত আর পশুপাখি কীটপতঙ্গ নয়। তার মানুষের শরীরে ফরেস্টের ঐ আওয়াজ নিশিদিন গ্রহণবর্জনের ত একটা শারীরিক সীমাও আছে। কত লক্ষ বছর আগে মানবজাতির শরীর থেকে যে-আওয়াজ শোনার অভিজ্ঞতা লুপ্ত হয়ে গেছে, এক মাদারির মার শরীরে তা ত আর সঞ্চিত রক্ষিত থাকতে পারে না, শুধু এই সুবাদে যে গ্রাম-শহর ইত্যাদি কোথাও কোনো মানববসতিতে তার জায়গা জোটেনি এবং এক ফরেস্টই তাকে জায়গা দিতে পেরেছে। সব বাদর ত আর মানুষ হয়ে যায়নি, তেমনি, সব মানুষই ত আর গ্রামশহরে চলে যায়নি–এই যুক্তিতে মাদারির মা ত আর নিজের শরীরে লক্ষ বৎসর আগের আরণ্যক স্মৃতি বহন করে যেতে পারে না। মিছিলের এই মানবিক কলরোল তার ভাল লাগে। এই যে সবাই মিলে একটা কথা ধরে গানের মত চেঁচিয়ে ওঠে–তার ভাল লাগে। বর্ষার নদীর চাইতেও, বা আকাশের মেঘের চাইতেও, গমগমিয়ে এই আওয়াজ যে আকাশে উঠে যাচ্ছে–তার ভাল লাগে। এত মানুষের গলার এত কথা–তার ভাল লাগে।
রাতদিন, দিনরাত, মাসবছর, বছরমাস ঝিঁঝির ডাকে আচ্ছন্ন তার কানে এই মানবিক সমবেত স্বর এক পরিচিত বিভ্রম আনে, জেগে-জেগে স্বপ্ন দেখার মত বিভ্রম। এই এত মানুষের এত আওয়াজ তাকে সেই বিভ্রমে জাগায়।
আর, এখন যেন এই আওয়াজটা আরো দূরে-দূরে ছড়িয়ে যাচ্ছে। একটা পাহাড়ের ইশারা মাঝেমধ্যে সামনের ফরেস্টের গাছপালার ওপর দিয়েও কখনো কখনো দেখা যায়। ট্রাকের চাকার তলার মাটিটা ইতিমধ্যেই হয়ত চড়াই ধরেছে। হঠাৎ-হঠাৎ ডাইনে বায়ে:একটু উঁচু দিয়ে যেন একটা ট্রাক চলে যায়। চা বাগানের সবুজ বা মাঠের সবুজের সঙ্গে ট্রাকের সবুজ মিশে থাকে, শুধু উজ্জ্বল হয়ে ওঠে কোনো-কোনো ট্রাকের ওপরের ঝাণ্ডা আর মানুষজনের রঙিন পোশাক। মাঝখানে সবুজের পার্থক্য রেখে এই ট্রাক আর দূরের সেই ট্রাকটা যেন অনেকক্ষণ সমান্তরালে চলে।
