তারা যে তিস্তা ব্যারেজের কাছে চলে আসছে, সেটা মনে হওয়ার আর-একটা কারণ এই রাস্তাটায় নদীর পর নদী, ব্রিজের পর ব্রিজ। ডান দিকটাতে পাহাড় আর চড়াই, বা দিকটাতে খাদ। ফলে, একটু পর-পরই দেখা যাচ্ছে ডান দিক থেকে শাদা ফেনা-তোলা জল বড় বড় পাথরে ধাক্কা খেয়ে লাফিয়ে উঠে এক-একটা রঙিন ব্রিজের তলা দিয়ে বা দিকে খাদের মধ্যে গিয়ে পড়ে বয়ে যাচ্ছে। এতগুলো নদীর ঝর্না হয়ে ঝরা আর নদী হয়ে বওয়া দেখতে-দেখতে এক-একটা ব্রিজ সঁ সঁ করে পেরিয়ে যায়–লংতি, চুয়া পাথাং, ডায়না, জলঢাকা, মূর্তি, নেওরা, জুর্তি। মনে হয়, এই রাস্তা গিয়ে থমকে শেষ হবে যেখানে তিস্তা পাহাড় থেকে পাহাড় ভেঙে নামছে।
চালসার মোড়ে পুলিশ ট্রাক থামাল। মাদারিহাট ছাড়ার পর সেই প্রথম থামা। সামনেও অনেকগুলি ট্রাক। থামল বলেই অনেকে উঠে দাঁড়িয়ে হাত-পা ছড়ায়। দু-এক জন নামতেও গিয়েছিল কিন্তু পুলিশ দেখে আর নামে না।
পুলিশ এসে জিজ্ঞাসা করে–কোথ থেকে আসছে ট্রাক? কোথা থেকে? গলার স্বরে ব্যস্ততা বোঝ যায়।
যারা ডালার ওপর বসে ছিল, তারা তখন দাঁড়িয়ে, প্রায় এক সঙ্গেই বলে ওঠে, মাদারিহাট।
ড্রাইভার কোথায়? পারমিট দেখি–পুলিশ ড্রাইভারের কেবিনের পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। ড্রাইভার একটা কাগজ হাতে-হাতে এগিয়ে দেয়। সেটা দেখে ফেরত দিতে-দিতেই চিৎকার করে জিজ্ঞাসা করে, লিডার কে আছে, ট্রাকে, লিডার কে। এর জবাব কী হবে বোঝার জন্যেই পুলিশ যেদিক থেকে কথা বলছে সেদিকে বসা লোকজন সেই ছেলেটির দিকে তাকায়। ছেলেটি দাঁড়িয়েছিল উল্টোদিকে, সে মেয়েদের ভিড়ের মধ্যে সাবধানে একটা পা দেয়, তারপর আর-একটা পা দেয়ার জায়গা খুঁজতে-খুঁজতে সামনের একজনের ঘাড় ধরে মুখ বাড়িয়ে দেয়–কী ব্যাপার?
আপনি নিয়ে যাচ্ছেন? নাম বলেন—
সুখেন্দু রায়
বাগানের লোক সব, নাকি বস্তির লোক—
দুইই আছে—
একটু নাম দিতে পারবেন?
কী? এই প্রত্যেকের নাম?
না। গ্রামের আর বাগানের। আচ্ছা, বাদ দেন। ওদলাবাড়িতে যদি চায় দেবেন। নেন, এই শিপটা রাখেন–পুলিশের বাড়ানো হাত থেকে একজন কাগজটা নেয়।
.
২১৩.
শতাব্দী-সহস্রাব্দীর স্বাদ
চালসার মোড়ে পুলিশ সব গাড়ি আটকে চেক করে বলে গাড়ির একটা ভিড় হয়ে যায়। এই ল্যাটার্যাল রোডে আর ওদিককার ন্যাশনাল হাইওয়েতে গাড়ির লাইন পড়ে যায়–মাটিয়ালির দিকের রাস্তাটা ফাঁকাই। আর সব গাড়িই ত সোজা মাল হয়ে ওদলাবাড়ি যাবে–তাই ওদিক থেকে যে-সব গাড়ি এদিকে আসছে, সেগুলোকে পুলিশ আটকাচ্ছে না।
পুলিশ অবিশ্যি গাড়িগুলো বেশিক্ষণ আটকায় না। মিছিল-ছাড়া কোনো গাড়ি থাকলে সেটাকে রাস্তার পাশে সাইড করতে বলে মিছিলের গাড়ি ছেড়েই দেয়। কিন্তু ঐখানে দাঁড়ানোর ফলে আর পুলিশের শ্লিপ নিয়ে ছাড়ার ফলে চালসা থেকে মালবাজার পর্যন্ত রাস্তা মিছিলের ট্রাকেই ভর্তি হয়ে যায়। মনে হয়, আজ এ রাস্তায় আর-কোনো কিছুই ঘটবে না। আর, এতগুলো ট্রাক একসঙ্গে যাচ্ছে, এখন আর কেউ কাউকে পেরিয়েও যাচ্ছে না, তাতে মনে হয় যেন ট্রাক দিয়েই মিছিলটা সাজানো হচ্ছে। মালবাজারের ভেতরে ত আর এই ট্রাকের মিছিল ঢোকে না–ন্যাশনাল হাইওয়ে দিয়ে সোজা বেরিয়ে যায়। মালবাজারের মোড়ে বিরাট গেট বানানো হয়েছে, তার ওপর বামফ্রন্টের লাল ঝাণ্ডাই উড়ছে। আর মোড়ের মাথাতেও লোকজন সারি দিয়ে দাঁড়িয়ে। সেখানেও কিছু-কিছু ট্রাক, কিছু-কিছু মিছিল তৈরি হচ্ছিল বটে কিন্তু তখন রাস্তার মিছিলটাই প্রধান হয়ে উঠেছে। মালবাজার থেকেই আবার শ্লোগান শুরু হল।
কিন্তু এবারের শ্লোগানের জোর আলাদা। এক-একটা ট্রাকে কেউ বসে নেই–সবাই দাঁড়িয়ে, গায়ে গা লাগিয়ে, এক হাতে পরস্পরের কাধ ধরে ট্রাকের ঝুঁকি সামলাচ্ছে, আর-এক হাত আকাশে তুলে শ্লোগান দিচ্ছে। এমন ভাবে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে যে তাদের মুখটা বাইরের দিকে ঘোরানো। শ্লোগানের সঙ্গে সঙ্গে নাচের ভঙ্গিতে কোমরের ওপর অংশ আর হাঁটু দোলাচ্ছে।
কোনো-কোনো ট্রাকে আবার শুধুই মেয়েরা। তারা তীব্র স্বরে গান গেয়ে যাচ্ছে, শ্লোগানেরই গান কি না কে জানে কিন্তু এই সারি-সারি ট্রাকের নানা ধরনের শ্লোগানের ফাঁকে সেই সমবেত স্বরের তীব্রতা বাতাস চিরে দিচ্ছে।
দু-তিনটি ট্রাকে এন-সি-সিরা পপাশাক পরে যাচ্ছে। দু-তিনটি ট্রাকে ইস্কুলের ছেলেমেয়েরা তাদের পোশাক পরে।
এখন মনে হচ্ছে তারা সেই ব্যারেজের কাছাকাছি চলে এসেছে–সবাই মিলেই সেখানে পৌঁছনো হবে। আর, এই পৌঁছনোর একটা নিয়ম-শৃঙ্খলা আছে, একটা ছন্দ আছে–ইচ্ছে করলেও সেই শৃঙ্খলা বা ছন্দ কেউ এড়িয়ে যেতে পারবে না। মাদারিহাটের ট্রাকের ভেতর ওরা মালবাজারের পর থেকেই একটা বৃহৎ ব্যাপারে নিজেদের একটু-একটু করে হারিয়ে ফেলতে শুরু করে।
ওদলাবাড়িতে এসে ট্রাকটা থামে–কারণ, আগের ট্রাকটা থেমেছে। থামার পর এই ট্রাকের ওপর থেকে উঁকিঝুঁকি মেরে দেখা যায়, আরো সামনেরটাও থেমেছে। চালসার অভিজ্ঞতাটা আছে বলেই হয়ত এখানে একজন ট্রাক থেকে চাকা বেয়ে নেমে যেতে সাহস পায়। কিন্তু এগয় না। ট্রাকের কাছেই রাস্তার পাশে পেচ্ছাপ শুরু করে। করে আর মাঝে-মাঝেই উদ্বিগ্ন ভাবে বায়ে তাকায়–আগের ট্রাকগুলো চলতে শুরু করল কিনা। ট্রাকের ভেতর থেকে একজন চিৎকার করে–হে বেঙ্গু, কলখান খুলি রাখি চলি আয়। আর-এক জন প্রায় নিদ্রিতস্বরে যোগ করে, বেঙ্গুর কলখান পাবলিক হেলথের কল না-হয়, ঘোষমশাইয়ের টিউবওয়েল, হ্যান্ডেল খাড়াই থাকে, নামিবার না-পারে। যে-স্বরে এই মন্তব্য আসে তা শ্লেষ্মজড়ানো। কিন্তু বেঙ্গুর পেচ্ছাপ শেষ হতে না-হতেই আরো কয়েকজন ট্রাক থেকে নামে–কেউ ডালার ওপর দিয়ে লাফ মেরে, কেউ চাকা বেয়ে, কেউ পেছনের ডালা ধরে ঝুলে। একজন বুড়োমত দেউনিয়া নামতে পারে না। সে চাকার ওপর পা রাখতে পারে না, উঠে আসে, আবার ডালা ধরে ঝুলতেও পারে না। নীচের থেকে একজন বলে, হে-এ তালই, তোমার নামিবার নাগিবে না, ঐঠে ছাড়ি দাও, মায়ের কোলত ছাওয়াছোটর আর নাজ্জা কী?
