স্যার, আমরা এখন ওটাকেই পয়েন্ট ধরে করে রাখি। তারপর একারেজ দেখে আর নর্থের হলকার ম্যাপ দেখে অ্যালাইনমেন্টটা ঠিক করা যাবে।
আচ্ছা, তাই করুন। মৌজা মাপের ওপর বিনোদবাবু পেন্সিলের নতুন লাইন টানতে থাকেন আর প্রিয়নাথের পাশ থেকে পুরো শিকলটার লাইনটা দেখে দেখে নেন।
গয়ানাথবাবু, এর বাদে ত ওদলাবাড়ি চাবাগান? গয়ানাথকে জিজ্ঞাসা করেন বিনোদবাবু।
হ্যাঁ। কিন্তু নদী আর বন, কতটা খাবে, কতটা থাকিবে, তার হিশাব ম্যাপে করিবেন কেমনে? গয়ানাথ তার প্রত্যক্ষতাকে এদের আনুমানিকতার বিরুদ্ধে দাঁড় করায়, যে-আনুমানিকতা আবার মাপজোখে অনড়, প্রায় আদালতের রায়ের মতই। বিনোদবাবু কোনো উত্তর দেন না।
সেই ফাঁকে সুহাস দৃশ্য হিশেবেই দেখে–তিস্তার দিগন্ত থেকে দিগন্ত, যেন জলস্রোত নয়, একটা কঠিন জলভূমির বিস্তার। একটুক্ষণ তাকিয়ে থাকলে মনে হয়, তিস্তা চলছে না, এই পারভূমিটাই চলছে। তখন আবার চোখ বুজে ভাসার বিভ্রমটা কাটাতে হয়। তিস্তার স্রোত এতই খর যে প্রায় কোনো আলোড়নও হয় না, স্টিলের পাতের মত একই তলে নদীটা বিস্তৃত হয়ে আছে। হঠাৎ মাঝে-মাঝে, এক-একটা কাঠের গুঁড়ির ভাসমান মাথাটুকু কুটোর মত ভেসে গেলে বোঝা যায় নদীস্রোতের বেগ কতটা। কিন্তু নদীর গর্জনকে তার চার পাশ থেকে বিচ্ছিন্ন না করে শোনা যায় না, বিশেষ করে ফরেস্টে দাঁড়িয়ে, চারদিকের সমস্ত শব্দের সঙ্গে নদীর শব্দ এতটাই মিশে থাকে। কিন্তু নদীর দিকে তাকিয়ে-তাকিয়ে, স্রোত দেখতে-দেখতে, নদীর আওয়াজটাকে চার পাশের আওয়াজ থেকে আলাদা করে নিলে, সিনেমায় যেমন স্মৃতিভ্রংশের নষ্টস্মৃতির পুনরাগমন বোঝাতে সাইরেনের আওয়াজ ক্রমবর্ধমান হয়ে ওঠে, অবিকল যেন তেমনি, তিস্তার গর্জনটাই বাড়তে বাড়তে প্রধান হয়ে ওঠে। তখন মনে হয়, এই প্রচণ্ড পরিব্যাপ্ত আওয়াজটাকে না-শুনে কী করে থাকা যায়। তবু আওয়াজটার মধ্যে বিরতিহীন মেঘগর্জনের মত একটা দূরত্বের ইঙ্গিত আছে–যেন ভেসে আসতে হচ্ছে। কিন্তু অবরুদ্ধ গুম-গুম ধ্বনি জলের তলা থেকে আরো তলায় নেমে যাচ্ছে। পাহাড় থেকে বিরাট-বিরাট বোন্ডার জলস্রোতে ভেসে-ভেসে জলের তলা দিয়ে গড়িয়ে-গড়িয়ে যাচ্ছে। টানা গড়গড় আওয়াজে যেন পাহাড়ে ধস নেমেই চলেছে। জলের তলায় বোরে-বোল্ডারে যখন ধাক্কা লাগে তখন জলের তলা থেকে যেন কামান গোলার আওয়াজ হয়। লোকমুখে এই আওয়াজটার নামও তাই তিস্তার কামান। সুহাস যখন জলস্রোতের দিকে তাকিয়ে-কিয়ে দৃশ্য-শব্দ শব্দের-ভেতরে-শব্দ শুনতে পাচ্ছিল তখন সে আর-কিছু শুনতে পায় না, দেখতেও পায় না। আর এই দৃশ্য ও শব্দ তার সমগ্রতা নিয়ে তাকে যেন সম্পূর্ণ অবশ করে দিচ্ছিল। সে দেখতে পাচ্ছিল, তিস্তা যে এখান থেকে উত্তরে, পশ্চিমে বেঁকে গেছে সেখানে ঐ ঘোলা জলের স্রোত প্রায় একটা তৈরি করা স্রোতের মত নিটোলতায় উজানে বাক নিচ্ছে। সেই বাক থেকে জলটা বয়ে আসছে সুহাসের দিকে। আর সুহাস চোখে-চোখে স্রোতটা উজিয়ে-উজিয়ে সেই বাক পর্যন্ত পৌঁছচ্ছে। তার দৃষ্টিতে ঘোর লাগে–এই স্রোতের প্রবলতা দৃষ্টি দিয়েও উজনো যায় না। সুহাস এই ঘোর সামলাতে প্রথমে চোখ বোজে। তারপর বসে পড়ে।
.
০২৪.
নদী আছে কি নাই : গয়ানাথী তর্ক
চোখ বন্ধ করতেই নদী আর নদীর আওয়াজ দুটোই মিশে যায় পরিবেশের সঙ্গে। এই ভাবে নদীর সামনে বসেই নদী থেকে নিজেকে আলাদা করে নিতে বা নদীকে আবার তার পরিবেশের সঙ্গে মিলিয়ে অস্পষ্ট করে নিতে স্বস্তি বোধ করে সুহাস। সে নদীর দিকে পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখে বিনোদবাবু নোট নিচ্ছেন, গয়ানাথ তার দিকে তাকিয়ে, প্রিয়নাথবাবু নেই।
প্রিয়নাথবাবু কোথায়?
চেইন গোটাচ্ছে।
এবার গয়ানাথ সুহাসের দিকে এগিয়ে আসে, স্যার, এইখানে আপনাদের মাপামাপিতে কী পাইলেন? নদীখান কি ভাঙিছে? মাপামাপিতে!
সুহাস বসে বসেই বলে, আপনি যা দেখছেন আমরাও তাই দেখছি। আমরা শুধু এইসব মেপেটেপে একে রাখছি।
সেইটাই ত কহিতে চাই স্যার। আটষট্টির ফ্লাডে নদীখান এইঠে আসি গেইছিল, ঢুকি গেইছিল, ঠিকই। কিন্তু তারপর আর ভাঙে নাই। এ্যালায় ফরেস্টখানই ঐদিকে, নদীর দিকে, এর বাদে বাড়ি যাবে।
সে যখন যাবে, তখন যাবে, এখন ত আর যাচ্ছে না, বিনোদবাবু তার খাতা থেকে চোখ নাসরিয়ে বলেন।
কিন্তুক, স্যার, এই ভরা বর্ষায় ত নদী সবঠেই ঢুকি যাবে। যেখানে যাবে সেইটাই কি বাতিল? স্যালায় ত তামান মৌজা বাতিল হবা ধরিবে–গয়ানাথ উত্তেজনা প্রকাশ করে ফেলে, আর সাধুভাষা বলতে পারে না। আর এতক্ষণে গয়ানাথের কথাতে সুহাসের মনে হয়, এইটুকু গ্রামে সারাজীবন ধরে থেকে এইখানকার নদীটা দেখে-দেখেই গয়ানাথ কোনো সর্বজনীন দার্শনিকতার বুলি আওড়াচ্ছে না, তার যেন আরো নির্দিষ্ট কিছু বলার আছে। সে তাই গয়ানাথকে জিজ্ঞাসা করে, তা হলে আপনার বক্তব্যটা কী, মানে, আপনি কিছু বলছেন?
না স্যার, আমি কহিছি আপনার মৌজার ম্যাপখান বদলিবার ত কিছু নাই। য্যানং ম্যাপ আছে, থাউক– কথাটা গয়ানাথ শেষ করতে পারে না। কিন্তু বোঝা যায় সে শেষ করতে চায়।
সুহাস জিজ্ঞাসা করে, মানে, আমরা দেখছি গাজোলডোবা নেই, হাঁসখালি নেই, চুরাশি নম্বর নেই, এতগুলো দাগ নেই আর আমরা মৌজা ম্যাপে লিখে দেব সব ঠিক আছে!
