রাজবংশী মেয়েরা বসে ছিল ট্রাকের পেছন দিকটাতে। সেখান থেকে সেই একক গুনগুনে একটা গানের মত আওয়াজ ওঠে। গানের সুরে সবাই ভাবে, দেবপাড়ার মেয়েরাই বুঝি আবার গান ধরল। কিন্তু সুরটা একটু এগতে-পেছতেই বোঝা যায় না, এখন গাইছে রাজবংশী মেয়েরা। গলার কী একটা খাজে তারা ধরা পড়ে যায়। দেখতে-দেখতে সে-গানটাতেও সুরের পর সুর এসে জড়ো হয়। মাথা নিচু করা, মাথায় ঘোমটা দেয়া ঐ ভিড়টা থেকে গানটা যেন ওপরে উঠে আসে। একটা মেয়ে মার কোলে শুয়ে পড়েছিল, সেও উঠে গান ধরে।
আকাশ ত পরিষ্কার হয়ে গেল,
কাল মুরগিটা শাদা হয়ে গেল,
নাকি কাল মুরগিটাকে ঢাকা দিয়ে।
শাদা মোরগটা তার পাখনা মেলে দিল
আর ঝুঁটিটা ফোলাল।
আর সারা রাতের পর তোর সময় হল রে বিদেশিয়া বন্ধু,
পান-সুপুরি নিয়ে আমার গোসা ভাঙানোর?
চাপা কান্নার সুরে এই গোসা-ভাঙানো চলতেই থাকে ট্রাকে আঁকি-দুলুনির সঙ্গে-সঙ্গে। কিন্তু বানারহাট আসতেই গোসা ভেঙে যায়। ডান দিক দিয়ে সোজা চামুর্চির রাস্তা চলে গেছে, সামনে বানারহাট বাজার, রেল স্টেশনের ইশারা পাওয়া যায়, প্যাক প্যাক করে কিছু রিক্সা যায়, তারপরই খোলা মাঠে তিনটি ট্রাক আর অনেক লোক, ঝাণ্ডা, ফেস্টুন। এই ট্রাকটাকে দেখেই মাঠের লোকরা দৌড়ে রাস্তার পাশে আসে, চিৎকার করে হাত নাড়াতে থাকে-এই ট্রাকটার গতি একটু কমে আসে। এতটাই কমে যে ট্রাকের আর মাঠের লোকজনের মনে হয়, ট্রাকটা বোধহয় থেমেই যাবে। ট্রাকের লোকজনও দাঁড়িয়ে পড়ে মাঠের লোকজনের দিকে হাত নাড়ায়।
মাঠে ঢোকার ক্যালভার্টটা পেরিয়ে যেতেই বোঝা গেল ট্রাকটা দাঁড়াবে না। তখন মাঠের লোকজন আবার দৌড়ে এগিয়ে এসে হাত নাড়ে। মাঠের ভেতর থেকে হঠাৎ শ্লোগান ওঠে, বামফ্রন্ট সরকার জিন্দাবাদ, চলো, চলো, ব্যারেজ চলো, ব্যারেজমে আজ কিয়া হোগা, লহর লহর লহর দেগা।
ট্রাকের লোকজনও দাঁড়িয়ে উঠে শ্লোগান দিতে থাকে। কে কোন শ্লোগান দিচ্ছে বোঝা যায় না, কিন্তু অতগুলো মানুষের সমবেত গলার আওয়াজে এতক্ষণকার নির্জনতা ভেঙে যায়। একে বানারহাটের আধা-শহুরে চেহারা, তার ওপর সারি দিয়ে উঁড়ানো একই মিছিলের ট্রাক, মাঠভর্তি লোক–সব মিলিয়ে হাটখোলার সকালের অবস্থাটা যেন ফিরে আসে-সবাই মিলে যেন কোথাও যাওয়া হচ্ছে, কিছু করা হচ্ছে। এই ট্রাকের এতগুলো মানুষ এতক্ষণ যেন বড় একলা ছিল, এখন তাদের সেই একলা ভাবটা কেটে যায়। বানারহাটটা পেরনোর পর আবার চা-বাগান শুরু হয়। সেই চা বাগানের পাশ দিয়ে একটা ট্রাক রঙে ঝলমল করতে করতে এগিয়ে যাচ্ছে। যেমন নদীতে হয়, পেছনের নৌকো সামনের নৌকোর সঙ্গ নিতে চায়, এই ট্রাকটা গতি বাড়ায়। আর ট্রাকের ওপরের লোকজন শ্লোগান ধরে—…জিন্দাবাদ জিন্দাবাদ। কিন্তু বাতাস ত ট্রাকের শ্লোগান পেছনে উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
৬.৩ মাদারির মা মানুষের গন্ধ শোঁকে, আওয়াজ শোনে
সেই শুরু, বাকি পথটা আর তাদের কখনো সঙ্গীর অভাব হয় না। বানারহাট থেকে সোজা গিয়ে ল্যাটারাল রোডে উঠতে হবে। বানারহাটের পর থেকেই তারা দেখে সামনে দূরে কোনো ট্রাক যাচ্ছে, বা, তাদের পেছনে কোনো ট্রাক আসছে। গয়েরকাটা থেকে ল্যাটারাল রোডের মাইল পনের-ষোলর দূরত্বে বানারহাট পার হয়ে দূরে দূরে ছড়ানো-ছিটনো ট্রাকের সঙ্গ সংখ্যার দিক থেকে হয়ত তেমন কিছু নয় কিন্তু আর-একটা ট্রাক দেখলেই কেমন উৎসাহ আসে। সবগুলো ট্রাক একই দিকে যাচ্ছে, সবাই একই শ্লোগান বলছে, যে-কোনো ট্রাকের সঙ্গে যে-কোনো ট্রাক বদল করে নিলেও কিছু এসে যাবে না–এতে দূরত্ব আর দূরত্ব থাকে না। মাদারির মার খুব ভালো লাগে।
তাকে ট্রাকে তুলে যেখানে বসিয়ে দেয়া হয়েছিল, সে সেখানেই বসে আছে। এটা দেবপাড়ার মেয়েদের ভেতরেই একটা কোণ। কোণ হওয়ায় মাদারির মার খুব সুবিধে হয়েছে। সে ড্রাইভারের কেবিনের পেছনের দেয়ালটাতে হেলান দিতে পারছে। নইলে, সে হেলান দেয়ার জন্যে আর-একটা ঘাড় পেত কোথায়? আর, মাদারিটা আছে তার মাথার ওপরে–ইচ্ছে করলেই ডেকে মুখটা দেখে নিতে পারে, বা দাঁড়িয়ে ছুঁয়ে আসতে পারে।
এই এত লোক, এত ট্রাক, এত মিছিল, এত আওয়াজ, এত কথা–এর ত কোনো মানেই নেই তার কাছে। তাকে যেমন কেউ আজকের মিছিলে যেতে ডাকত না, তেমনি সে-ও ত আজকের মিছিলে আসত না, কোনোভাবেই আসত না। মিছিলের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্কই নেই। ফরেস্টের অজস্র লতাপাতা, গাছ, ঝোরা–এর সঙ্গে তার সম্পর্ক এমন সর্বাঙ্গীণ ও দৈনন্দিন যে সেই সম্পর্কের বাইরে তার পক্ষে আসা সম্ভবই নয়। নেহাত মাদারি জেদ ধরল। আর মাদারির মা এখনই মাদারিকে একা-একা মিছিলে যেতে দিতে চায় না। এখনই যদি মিছিলে চলে যায় মাদারি, তা হলে সে আর-একটা ছেলে পাবে কোথায়? একটা ছেলে ছাড়া ত তার চলবে না। আজ না-হয় সে সঙ্গে এল কিন্তু আর বড় জোর বছর দুয়েক, তারপর ত মাদারি চলে যাবেই–হাসিমারা, শিলিগুড়ি বা নেপাল–তখন? তখন মাদারির মা ছেলে পাবে কোথায়? একটা ছেলে পাবে কোথায়? একটা ছেলে হতে ত বছর লাগে না, কিন্তু আবার একটা ছেলে পেটে নেয়া যেন তার পক্ষে ক্রমেই কঠিন হয়ে গেছে।
আরো একটা কথা মাদারির মায়ের মনে এসেছে। সে কোনোদিন এত দূরে আসেনি, এত বড় মিছিলে আসেনি! এত দূর-দূর থেকে যখন এত-এত লোক আসছে, তার মধ্যে ত তার আট-না-দশটা ছেলেও থাকতে পারে, অন্তত কয়েকটা ত থাকতেই পারে। তারাও ত দূরে-দূরেই গেছে।
