বরং মিলিটারি ক্যাম্পগুলো যেন অনেকটা চা বাগানের মতই দেখতে, ফরেস্টের মত ততটা নয়। চা বাগানগুলোতে দেয়াল ইটের আর সিমেন্টের, চালের টিন লাল রঙের। স্কুল, হাসপাতাল, ফ্যাক্টরি অফিস, ওজনের জায়গা–এই সবের সামনেই অনেকখানি করে সবুজ মাঠ, তার দিয়ে ঘেরা। দু-একটা জায়গায় ফুলবাগানও। রাস্তাগুলোও পিচ ঢালা, বা অন্তত কাঁকর ঢালা।
একই রকম দেখতে এই চাবাগানগুলোই মিলিটারি ক্যাম্পগুলোকে ঘিরে রেখেছে, নাকি, মিলিটারি ক্যাম্পগুলোই চা বাগানগুলোকে ঘিরে রেখেছে?
.
২১০.
ট্রাকের ভেতরে নির্জনতার গান
গয়েরকাটা থেকে ডান দিকে ঘুরে এই রাস্তাটা ধরতেই কিছুক্ষণের মধ্যে যেন ট্রাকটার ওপর নির্জনতা। চেপে বসে–যে-নির্জনতা থাকে দূরযাত্রী ট্রেনের কামরায়। ন্যাশন্যাল হাইওয়ে দিয়ে, আসতে-আসতে নানা গাড়ির পাশ কাটাতে হয়, তাদের পাশ কাটিয়ে নানা গাড়ি যায়, উল্টো দিক থেকে কত গাড়ি গায়ে বাতাস ছুঁড়ে দিয়ে চলে যায়। কিন্তু এ রাস্তায় তেমন কিছুই নেই, প্রায় একা-একা মাইলের পর মাইল যাওয়া, মাইলের পর মাইল। কখনো কখনো পাওয়া বাগানের ট্রাক আর মিলিটারির ট্রাকে সেই একাকিত্ব ঘোচে না। বরং মনে হতে থাকে যে তারা এই নির্জনতা দিয়ে আরো নির্জনতায় যাবে। ফরেস্টের ভেতর দিয়ে একা-একা মাইলের পর মাইল হাঁটতে এরকম নির্জন লাগে, বা পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসতে, বা, এমন-কি চা-বাগানের ভেতর দিয়ে ভেতর দিয়ে কোথাও যেতে, বা বর্ষায় জল এসে ভাসায় এমন এক শুখা নদীর খাত ধরে-ধরে নিধুয়া কোনো পাথার পার হতে। এই ট্রাকে উঠে। যারা এখন দল বেঁধে তিস্তা ব্যারেজে যাচ্ছে, তাদের সবাইই এমন নির্জনতায় আজন্ম অভ্যস্ত। তারা নিজের নিজের মত করে জানে, এই নির্জনতা কেমন করে কাটাতে হয়। যে-মেয়েগুলো হাটখোলাতে নাচছিল, তারা এখন পরস্পরের কাঁধে মাথা দিয়ে হেলে থাকে। কেউ-কেউ আবার পরস্পরকে জড়িয়ে.. ধরে ট্রাকের টাল সামলায়। চোখ খোলা রাখে যেখানে চোখ যায় সেখানে। সেরকম ভাবেই কেউ একজন গান ধরে কেমন গুনগুন কান্নার মতন সুরে। কে গায় বোঝা যায় না, কিন্তু সুরটা বোঝা যায়। সেই সুরটা যেন দীর্ঘ একা যাত্রার সঙ্গ দেয়।
এই ট্রাকের ঝাঁকানিতে গানের সুর কেটে যায়, হঠাৎ একটা জায়গা উঁচু হয়ে যায়, আর একটা জায়গা পড়ে যায়, কিন্তু তা সত্ত্বেও সুরটা সুরই থাকে। যে গানটা শুরু করেছিল, তার গলা থেকে কখন আর-একজন সুরটা নিয়ে নিয়েছে বোঝাই যায় না–গুনগুনানি কান্নার সুরের পার্থক্য এতই কম। কিন্তু, তারও পরে, কখন, দেবপাড়া চা বাগানের এই সব মেয়েরাই একে অন্যের পিঠে বা ঘাড়ে মাথা হেলিয়ে ট্রাকের ওপর দুলতে-দুলতে একসঙ্গে কান্নার সুরে সেই গানটা গেয়ে যায়।
মাসি, তুই আর ভাল কম্বল খুঁজিস না,
সব কম্বলে–একই লোম,
সব লোমে একই উকুন,
সারা রাত জেগে থাকি আর উকুন কুটুস কুটুস করে কামড়ায়,
নাকি উকুন কামড়ায় বলেই সারা রাত জেগে থাকি।
মাসি তুই আর হাট থেকে।
উকুন মারা তেল আনিস না।
নইলে, সারা রাত আমাকে কামড়াবে,
এমন উকুন আর আমি কোথায় পাব?
এমন উকুন আর আমি কোথায় পাব?
এই গান অনেকক্ষণ ইনিয়ে-বিনিয়ে চলে। কখনো দশজন গলা দেয়, কখনোবা দশজনই এক সঙ্গে থেমে যায়, নতুন দুজন নতুন লাইনটা গেয়ে ছেড়ে দেয়; আবার হঠাৎ সবাই মিলে পুরনো লাইনটাতেই ফিরে যায়–সবাই যেন ডুকরে ওঠে উকুনের শোকে, আবার সবাই একজনের কাছে গানের সুতো ছেড়ে দেয়। এ যেন তাদের অলস সময়ের খেলা–দীর্ঘপথ হাঁটতে-হাঁটতে যে-আলস্য আসে।
হঠাৎ একটা মেয়ে সোজা হয়ে বসে বলে, চা বাগানের গ্যামাক্সিন এখন আবার উকুনও খেয়েইছে, থাকার জন্যে পোকারা এখন গাছের পাতাও পায় না, হায় রে এর পর পোকাগুলো থাকবে কোথায়?
মেয়েটি কথা বলার মত করেই বলে, বলেই তার মাতৃভাষায় সে গানটি গায়। কিন্তু সে-ভাষা শোনা যেতে পারে মাত্র, তার অর্থ ত বুঝতে হবে এই বৃত্তান্তপাঠকের নিজের ভাষায়। হায়, সেই মেয়েটি ত এ বৃত্তান্তের পাঠক নয়। মেয়েটির মুখের কথার মানেটা গানের মানের সঙ্গে এমনই এক হয়ে যায় যেন মনে হয় মেয়েটা তার মা-ঠাকুমা, ঠাকুমার ঠাকুমার কাছে মধ্যপ্রদেশ থেকে বিহার পর্যন্ত অরণ্য-পাহাড়ে ছড়ানো এই যে-গানটি পেয়েছিল সেটাতে নতুন লাইন যোগ করে দিচ্ছে। অথবা হয়ত এই ট্রাকে সেই প্রাচীন গানটাও একঘেয়ে লাগছে, সেই গান গেয়েও আর একঘেয়েমিটা কাটছে না। তাই সে আসলে ঐ পুরনো গানটাকেই বাতিল করছে এই কথাগুলো বলে। গানের সম্প্রসারণ, না, বর্জন, তা বুঝতে না-দিয়ে, বা নিজেরাও না বুঝে, মেয়েদর দলটা একসঙ্গে হেসে ওঠে, হেসে উঠতে-উঠতে সোজা হয়ে বসে, আবার হাসে, তাদের গায়ে গা ঘষা একাকিত্বেই।
কিছুক্ষণ দল বেঁধে হেসে মেয়েরা গানটা ছেড়ে-ছেড়ে দেয়। এখন, তারা গানের চাইতে হাসতে যেন আনন্দ পায় বেশি। তারপর এক সময়ে সেই হাসিটাও থামে। ট্রাকটার ভেতরে কিছুক্ষণের জন্যে যে-পরিবর্তন এসেছিল, তা বাতাসে বাতাসে ঝাঁকুনিতে ঝাঁকুনিতে শেষ হয়ে যেতে থাকে। আবার সেই দোলা, পা ছড়ানো, পা গুটানো, কিছু ধরে নিজের শরীর সামলানো। আবার সেই নির্জনতার ভেতর ট্রাকটা ঢুকে যায়।
