মাদারি বসে ছিল ড্রাইভারের চালের ওপরে আরো অনেকের সঙ্গে। সে বাচ্চা বলে, তাকে একটু পেছনে সকলের মাঝখানে বসানো হয়েছে, যাতে আচমকা ধাক্কায় সামনের দিকে হোঁচট না খায়, বা ট্রাকটা গর্তটর্তের মধ্যে পড়ে দুলে উঠলে পিছলে না যায়। পেছন দিকে গেলে ত লোকের মাথায় পড়বে, কিন্তু সাইডে হড়কালে ত রাস্তায়।
ট্রাকে বাসে যেমন হয়-চলার আগে মনে হয় আর-একটা লোকও আটবে না, আর চলা শুরু করলে দেখা যায় প্রত্যেকেই একটু না-একটু জায়গা পেয়েই গেছে আর কিছুটা জায়গা যেন ফাঁকা থেকে যায়। কিন্তু সবটাই ঘটে, একটা সীমার মধ্যে। যেমন, যারা ট্রাকে ডালার ওপর বসে আছে লাইন দিয়ে, তারা ডালাটাকে দুই হাতে চেপে, সামনে ঝুঁকে ট্রাকের ঝাঁকুনি সামলাচ্ছে। সে-ভাবে খানিকটা যাওয়া যায় কিন্তু এরকম মাইলের পর মাইল কি আসা যায়? গয়েরকাটা পর্যন্তই ত প্রায় বিশ মাইল, তার পর এই রাস্তা আরো কত মাইল কে জানে। ডালার ওপর বসে থাকতে-থাকতে ব্যথা লাগে। তখন পা-দুটো ছড়িয়ে দিতে ইচ্ছে হয়। ছড়িয়ে দেয়ার জায়গাও আছে। কিন্তু তারপরই ট্রাক এমন ঝাঁকি খায় যে পা গুটিয়ে এনে শরীরের ভার সামলাতে হয়। এর মধ্যে দু-একজন ডালার ওপর থেকে পিছলে পাটাতনের ওপর বসে পড়েছে। জায়গাও হয়ে গেছে। অনেকে দাঁড়িয়ে পড়েছে–সামনের কারো ঘাড় ধরে টাল সামলাতে-সামলাতে। কিন্তু ট্রাকের ওপর দাঁড়িয়ে টাল সামলানো মুশকিল–একটা লোহার শক্ত কিছু থাকলে ভাল হয়। ড্রাইভারের কেবিনটার পেছনের দেয়ালে হেলান দিয়ে যারা ট্রাকের মাথার দিকে বসেছে তারা ঐ লোহার রডগুলো ধরতে পারে, যা দিয়ে ট্রাকের ডালাগুলো এটে রাখা।
রাস্তায় এমনি ট্রাক বাসের চাইতে মিলিটারির গাড়ি যেন বেশি। খাকি রঙের মিলিটারি ট্রাকগুলো ছুটতে-ছুটতে ফাঁকা চলে যাচ্ছে। একটা জায়গায় মিলিটারির তাঁবু পড়েছে, অনেকগুলো ট্রাক মাঠটার একপাশে লাইন দিয়ে; এক জায়গায় মিলিটারিরা গোল হয়ে বসে, আর একটা মিলিটারি কিছু বলছে।
বিন্নাগুড়ির কাছাকাছি আসতেই রাস্তার চেহারা বদলে যায়, আরো ঝকঝকে আর চওড়া। রাস্তার মুখে-মুখে চায়ের বড় বড় পেটির মত কাঠের বাক্স উপুড় করা, তার ওপর আবার একটা তেকোনা কাঠের ফলকে কী সব লেখা। এই সব বাক্স আর লেখা প্রায়ই দেখা যায়, ঘন-ঘন। বেশ খানিকটা মাঠ পরিষ্কার ঝকঝক করছে, তাতে রঙিন খুঁটি পোতা–এক-একটাতে এক-একভাবে। রঙ যেন সদ্য লাগানো হয়েছে এতই জ্বলজ্বলে। এরকম মাঠ প্রায়ই দেখা যায়।
বিন্নাগুড়ির মোড়েই আর-একটা রাস্তা পুবে বেরিয়ে এসেছে, যে-মাদারিহাট থেকে এই ট্রাক এল সেই মাদারিহাটেরই দিকে, কিন্তু নিশ্চয়ই মাদারিহাট থেকে খানিকটা উত্তরে। এই রাস্তাটি অনেক প্রাচীন। জলুশ ছাড়া, বাস ছাড়া, এমন-কি হাটবার ছাড়াও যাদের বন-নদী এই সব পেরিয়ে-পেরিয়ে এই সব জায়গায় ঘুরতে হয়েছে কখনো পায়ে হেঁটে, কখনো সাইকেল ঠেলে, তারা জানে, এই রাস্তা গেছে দেওবুড়াপাড়া, শোভারাম দিয়ে, তিনি নদী, বানগুড়ি নদী পেরিয়ে টোপাভাসা। এখন এখানে নেমে গেলে এই রাস্তা দিয়ে হেঁটে-হেঁটে মাদারিহাট পৌঁছে যাওয়া যাবে। এই পথে মাদারিহাট থেকে নিয়মিত যাতায়াত করেছে এমন লোক এই ট্রাকে দু-চারজন আছে। আজকাল এ রকম যাতায়াত লোকজনের কমে আসছে। এখন বাসরাস্তা অনেক বেড়েছে। এক বাস থেকে আর-এক বাস ধরে লোকে যাতায়াত করতে চায়।
কিন্তু অনেক দিন ধরেই নাকি এই রাস্তাটা পিচ ঢেলে বড় করার কথা চলছে। তা হলে বিন্নাগুড়ির সঙ্গে হাসিমারার একটা সরাসরি আলাদা রাস্তা চালু হতে পারে–আরো ফাঁকায়-ফাঁকায়, আরো গোপন। বিন্নাগুড়িতে, হাসিমারাতে–দুই জায়গাতেই দরকারে এমন-কি প্লেনও নামে। যদি এই রাস্তাটা তৈরি হয়ে যায় তা হলে আর ন্যাশন্যাল হাইওয়ে দিয়ে সেই সব দরকারে চলাচল করতে হয় না। বরং সকলের চোখের আড়ালে সহজেই এই রাস্তাটা ব্যবহার করা যায়।
আর, তাতে ত শুধু বিন্নাগুড়ি-হাসিমারা সংযোগই হবে না। আসলে সেই চালসার মোড় থেকে ল্যাটারাল রোড ধরে বিন্নাগুড়ি পর্যন্ত এসে যেসব কনভয়ের যাবার দরকার, সোজা হাসিমারা চলে যেতে পারে কারো চোখে না পড়ে। শিবক পাহাড়ের পরে তিস্তার পশ্চিম পারে ফরেস্টের মধ্যে বিরাট ক্যাম্প ফরেস্টের ভেতর দিয়ে-দিয়ে সেই বাগডোগরা প্লেন ঘাটির কাছে ব্যাঙডুবি পর্যন্ত গেছে। পশ্চিমে ব্যাঙডুবি আর পুবে হাসিমারা–শিলিগুড়ির কাছ থেকে জলপাইগুড়ির প্রায় পুব সীমার কাছাকাছি পর্যন্ত সেনাবাহিনীর কর্তৃত্বাধীন অঞ্চলটা তাহলে নিজেদের রাস্তাঘাট ও যানবাহন নিয়ে স্বাবলম্বী হয়ে যেতে পারে। এখন বিন্নাগুড়ি পর্যন্ত সেই স্বাবলম্বন ঘটেছে কিন্তু তার পুরে আর এগতে পারছে না। বা, হয়ত ইচ্ছে করেই এগচ্ছে না। শোনা যায়, কয়েকটা নদীর ওপর ব্রিজের জন্যে নাকি রাস্তাটা আটকে আছে। এদিকের কোনো রাস্তাই ত ব্রিজ ছাড়া, ক্যালভার্ট ছাড়া তৈরি করা যায় না। মিলিটারি ইচ্ছে করলে ডাবড়ব আর শুখাতিতির মত নদীর ক্যালভার্ট বানাতে কতক্ষণ?
বিন্নাগুড়ি দেখলে চোখ একটু জুড়োয় সত্যি। কিন্তু এদিককার ফরেস্টে-ফরেস্টে বা বাগানে-বাগানে যারা ঘোরে, কাজ করে, এই ফরেস্ট আর বাগানই যাদের জীবিকা জোগায়, তাদের কাছে নতুনত্ব যা তা মিলিটারির খাকি রঙে। বাকিটা অনেকখানিই চেনা। ফরেস্টের রেঞ্জ অফিস, রেঞ্জার ও অন্যান্যদের কোয়ার্টারগুলো ত এরকমই দেখতে ঝকঝকে। এগুলো ইটের, সিমেন্টের, ওগুলো কাঠের। কিন্তু প্রত্যেকটিরই সামনে তারের বেড়া, কাঠের দেয়ালে বছর বছর রঙ পড়ে, টিনে লাল রঙ।
