সেই নাচার দলের বাঁশিওয়ালা এই ট্রাকেই উঠেছিল। সে এই শ্লোগান পরবর্তী নীরবতার সুযোগে হঠাৎ হাত উঁচু করে বলে ওঠে, জিন্দাবাদ, জিন্দাবাদ, তারপর আবার চুপ করে যায়। কিন্তু, সে হয়ত আশা করেছিল আবার কিছুক্ষণ শ্লোগান চলবে। তেমন শ্লোগান চলছে না দেখে সে যেন কিছু করার উৎসাহ পায়। সে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে কিন্তু পা দুটো এক করতেই বসে বসে টলে যায়। সে বসে ছিল মেয়েদের কাছে–টলে পড়তেই বাগানের এক বুড়ি তার পিঠ ধরে সোজা করে দিয়ে বলে, বাঁশি বাজাগে, বাজা। আর মেয়ের দল খিলখিল হেসে ওঠে। বুড়ি পেছন থেকে লোকটার বাঁশি ধরা হাতটি তার ঠোঁটের কাছে তুলে বলে, হে-ই আওয়ারা বাঁশি বাজাগে, বাজা, হামরামন নাচ করবেক, বাজা।
লোকটি বাঁশি ধরা হাতটি সরিয়ে নিয়ে বলে, হাম বাঁশি নাহি বাজায়গা, হাম লেকচার দেগা, বড়া লেকচার।
তো দে কেনে, লেকচার দে, বৈঠকে দে ঝুবরু, বৈঠকে দে, বুড়ি পেছন থেকে আস্তে-আস্তে তাকে সমর্থন দেয়।
হ দেগা। হামরামন ইউনিয়ন তোেড় দেগা। কাহে? না, হামরামন আউর ই লাল ইউনিয়ন নাহি করেগা। হামরামন আদিবাসী হ্যায়। আদিবাসীরাজ কায়েম করনে হোগা। হামরামন ঝাড়খণ্ড পাটিকা মদত করেগা। বুঝলেক? দেবপাড়া বাগানমে সব কোই ঝাড়খণ্ড হো গেলাক। হলেক কি না-হলেক, কহ, কহ, হলেক কি না-হলেক?
সেই বুড়ি পেছন থেকে বলে, হলেক, হলেক, ব্যাস, লেকচার খতম কর দে।
একটা মেয়ে বলে ওঠে, হে ঝুবরু, খাড়া হোকে লেকচার লাগা দে।
ঝুবরু তার বাঁশিসহ হাত বাতাসে খেলিয়ে বলে, নাহি, হাম আউর লেকচার নেহি দেগা, আভি হাম প্রেসিডেন্ট হোগেলাক, অউর ইউনিয়ন বাবু লেকচার দেগা। ইউনিয়ন বাবু, বোল দেও, লেকচার দেও। বলতে বলতে কুবরু নেতিয়ে পড়ে। পেছনের বুড়ি একটু সরে গিয়ে তাকে আরো নেতিয়ে পড়ার কিছুটা জায়গা দেয়। ঝুবরু পুরো শোয়ার জায়গা পায় না বটে কিন্তু এর হাতের ফাঁক দিয়ে, ওর পায়ের ফাঁক দিয়ে নিজের শরীরটাকে এলিয়ে দিতে পারে। সকালের হাড়িয়ার নেশা এই আধো ঘুমে কেটে যাবে, বিশেষত ট্রাকের ওপরের এই বাতাসে, যদি যেখানে নামবে সেখানে পৌঁছেই আবার হাড়িয়া না খায়।
শ্লোগান থেমে যাওয়াতেই খানিকটা যেন দূরযাত্রার একঘেয়েমি ট্রাকটার মধ্যে এসে গিয়েছিল। অনেক দূর যেতে হবে, তাই কারো কোনো উত্তেজনা নেই। বুবরুর বক্তৃতার আয়োজনে একটু বদল আসতে না-আসতেই শেষ হয়ে যায়, কুবরু যে এত তাড়াতাড়ি তার বক্তৃতা শেষ করে দেবে, তা যেন ঠিক প্রত্যাশিত ছিল না। এখন এই ট্রাকের ভেতরকার ঝাঁকি, ট্রাকের ওপরের ঝোড়ো বাতাস, মাঝে-মাঝে ডালপালা থেকে বাঁচাতে মাথা নুইয়ে ফেলা–বিশেষত তাদের যারা ড্রাইভারের ছাদে বসেছে, এমন-কি বাগানের মেয়েদের একটু-আধটু হেসে ফেলাও, যেন একঘেয়ে হয়ে এসেছে, এরই মধ্যে।
প্রথম প্রথম বাস দুটোর পেছন-পেছন ট্রাকটা যাচ্ছিল, আস্তে-আস্তেই। কিছু দূর চলার পরই বোঝা গেল-বাসদুটোর পক্ষে আর-গতি বাড়ানো সম্ভবই নয়, আর ঐ গতিতে গেলে তিস্তা ব্যারেজে পৌঁছবে যখন, তখন, সবাই ফেরার ট্রাকে বাসে উঠছে। এটা বুঝে ফেলার পর ট্রাক ড্রাইভার কয়েকবার হর্ন দিয়ে বাসদুটোকে পেরিয়ে এগিয়ে যায়। তখন দুই বাস থেকেই আবার আওয়াজ ওঠে, হাত দেখানো হয়, বিশেষত বাসের ছাদে যারা বসে আছে তারা হাত নাড়ায়। তারপর থেকে এই ট্রাকটা একাই যাচ্ছে।
দলগাঁও পেরিয়ে গেল।
.
২০৯.
চা বাগান ঘিরে মিলিটারি
গয়েরকাটার কাছাকাছি এসে ডান দিকে মোড় নিয়ে ন্যাশন্যাল হাইওয়ে ছাড়তে হল। এটা চামুর্চির রাস্তা–বিন্নাগুড়ি-বানারহাট হয়ে চামুর্চি গেছে। এই রাস্তা ধরে অনেকখানি গিয়ে ট্রাক বায়ে ঘুরবে। আবার কিছুটা গিয়ে ল্যাটার্যাল রোড ধরবে–দুই ন্যাশন্যাল হাইওয়েকে যুক্ত করেছে যে-ল্যাটার্যাল রোড।
এই রাস্তাটা সরু, বোধহয় গর্তটৰ্তও একটু বেশি। তাই ট্রাকটাও আস্তে-আস্তে চলে, ঝাঁকি আর। দুলুনিও একটু বেশি লাগে। কিন্তু একেবারে ফাঁকা। যতদূর চোখ যায় ঝকঝকে রাস্তা চলে গেছে, সামনে কিছুই নেই। মাঝেমধ্যে উল্টো দিক থেকে দুটো-একটা ফাঁকা ট্রাক আসে–বাগানের। সেই ট্রাকের দু-একজন কুলি মাথা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে এই লোকভর্তি ট্রাকটাকে দেখে। কোনো বিস্ময় নেই। কিন্তু এত প্রাকৃতিক দৃশ্যের বিস্তৃতির মধ্যে মানুষকে নিয়ে দৃশ্য বড়,কম। তাই, কোথাও একজন মানুষ দেখলেও তাকাতে হয়।
রাস্তার পাশ দিয়ে গয়েরকাটা নদী অনেক দূর পর্যন্ত চলে। নদী বলে বোঝা যায় না, তা ছাড়া ঝোপঝাড়ে ঢাকাও থাকে অনেকখানি। হঠাৎ এক-একটা জায়গায় ঝোপঝাড়হীন, খোলা, ছোট নালার মত নদীটাকে দেখা যায়, একটু উঁচু জায়গা থেকে বেশ মোটা ধারায় নীচে ঝরে পড়ছে, আর সেখান থেকে জল নিয়ে কেউ-কেউ কোথাও-কোথাও যাচ্ছে। খানিকটা এমন খোলামেলা বয়ে গিয়ে নদীটা আবার ঝোপঝাড়ে ঢেকে যায়।
কিন্তু নদীর ঐ খাতটা মাঝেমধ্যে দেখেই চমকে বুঝতে হয়, গাড়িটা একটু ওপর দিকে উঠছে, ঠিক পাহাড়ে না হলেও পাহাড়ের তলার দিকে যেন। নদীটার উল্টো দিকে ট্রাকটা চলেছে, তাই যেন আরো বিশেষ করে বোঝা যায় কী ভাবে জমির একটু পাথুরে ঢাল বেয়ে নদীটা অত কম জল নিয়েও, অত সরু খাত দিয়েও লাফিয়ে লাফিয়ে চলেছে, আয়তনের চাইতে একটু বেশি খর বেগে।
