ওদিকের প্রথম বাসটা ততক্ষণে পেছনে চলতে-চলতে রাস্তায় উঠে দাঁড়িয়ে আছে। স্টার্ট চালুইবোঝা যাচ্ছে না, বাকি বাসটা ও ট্রাকটার জন্যে অপেক্ষা করছে, নাকি এখনি ছেড়ে দেবে। বাকি বাসটা আর পেছচ্ছে না, মাঠের মধ্যেই একটু-একটু করে গাড়িটা রাস্তার দিকে মুখ করে নিচ্ছে। ট্রাকের ড্রাইভার সিটে বসে স্টিয়ারিঙে হাত দিয়েছে—বাসটা রাস্তাতে উঠলেই সে স্টার্ট দেবে।
ড্রাইভার বাহাদুরকে ওপর দিকে হাত দেখায় আর তখনই ওপর থেকে সেই ছেলেটি গলা বাড়িয়ে ধমকে ওঠে, কী ব্যাপার, চেঁচাচ্ছেন কেন?
ঘাড় হেলিয়ে বাহাদুর বলে, ইমরাক ফেলি যাছেন, কায়ও উঠিবার দিছে না।
এতক্ষণে সময় হল? দিন, ছেলেটিকে তুলে দিন–ছেলেটি হাত বাড়ায়। বাহাদুর ব্যাটনটা মাটিতে ফেলে মাদারিকে মাথার ওপর তুলতেই মাদারি পায়ের এক দুলুনিতে পায়ের ট্রাকের তলায় ডালা পেয়ে যায়। ওঁকে এখান দিয়ে তুলুন, ড্রাইভারের দরজার পাশে লোহার ধাপ দেখিয়ে দেয় ছেলেটি।
.
২০৮.
ট্রাকে শ্লোগান ও নির্জনতা
রাস্তার ওপর উঠে রওনা হতেই ছেলেটি ট্রাকের ওপর শ্লোগান দেয়–ইনকিলাব জিন্দাবাদ। এই শ্লোগানটার জবাবে সবাই-ই জিন্দাবাদ দিতে পারে, বেশ জোরেই। তার পরেও চেনাজানা শ্লোগানই ওঠে, বামফ্রন্ট জিন্দাবাদ। গরিবের সরকার বামফ্রন্ট সরকার। পঞ্চায়েত আইন করল কে, বামফ্রন্ট সরকার আবার কে? গ্রামের মানুষের বন্ধু সরকার, বামফ্রন্ট সরকার।
বেশ খানিকক্ষণ ট্রাকের ওপর থেকে উৎসাহের সঙ্গে হাত নাড়িয়ে নাচিয়ে শ্লোগান চলে। যারা শ্লোগানগুলো জানে না, কয়েকবারের পর তারাও শ্লোগান ধরতে পারে। ট্রাকটা জোরে চলছে, মাথার ওপর দিয়ে বাতাস বইছে, দুপাশের ফরেস্টের গাছ-গাছড়া কোথাও-কোথাও মাথার ওপরই প্রায় ঝুঁকে আসে। বিশেষত বাশগাছের হাত থেকে বাঁচার জন্যে বাসের মাথার লোকজনকে পরস্পরের পিঠের ওপর মাথা রাখতে হয়। শ্লোগান দিতে খুব ভাল লাগে। আর এত মানুষের গলায় শ্লোগানও এত, বাতাসে যেন মুহূর্তে উড়ে চলে যায়, ভারী হয়ে আটকে থাকে না।
সেই ছেলেটি শ্লোগানগুলোকে ধীরে-ধীরে সাধারণ থেকে নির্দিষ্টে নিয়ে আসে। এই শ্লোগানগুলি নতুন, তিস্তা ব্যারেজের উদ্বোধন উপলক্ষেই তৈরি। সরকারি দলগুলো টাড়িতে-টাড়িতে, বাগানে-বাগানে, বস্তিতে বস্তিতে গত মাসখানেক ছোট-ছোট মিটিং করেছে, স্কোয়াড তুলেছে, ইউনিয়নের সভা, হাট মিটিং, হাট স্কোয়াড করেছে। ফলে, এই নতুন শ্লোগানগুলিও কিছু লোকের জানা হয়ে গেছে। কিন্তু স্থায়ী শ্লোগানগুলি যেমন না-জানলেও বলা হয়ে যায়, এই শ্লোগানগুলি তেমন নয়। এগুলো মনে রেখে বলতে হয়। আর, মনে যদিবা রাখা যায়, বলতে গেলেই একটার পিছে আর-একটা চলে আসে।
ছেলেটি এই সব শ্লোগান প্রথমে পুরোটাই নিজে নিজে দিচ্ছিল। একটা-একটা করে। প্রথমবার দিয়ে হাতের ইশারা করছিল, পরের বার সবাই যেন একসঙ্গে দেয়। তারপর খানিকক্ষণ সেই শ্লোগানটিই পর পর চলে মুখস্থ করানোর মত। তারপর আবার সেই বামফ্রন্ট সরকার জিন্দাবাদ,…আবার কে এই সব স্থায়ী শ্লোগানের পর আবার নতুন শ্লোগান।
ছেলেটি বলে, উত্তরাখণ্ড-গোখাল্যান্ড নাহি চলে গা নাহি চলে গা। হিন্দি শ্লোগান বলেই বাগানের লোকজন আগে গলা মেলায়। গ্রামের লোকজন প্রথমে একটু ইতস্তত করে এটা তাদের শ্লোগান কিনা বুঝে নিতে। তা ছাড়া, এই একই শ্লোগান গ্রামে দেয়া হয়েছে, উত্তরাখণ্ড-গোর্খাল্যান্ড চলবে না চলবে না। যারা সেটা জানে তারা বাংলাতেই জবাব দেয়। ছেলেটি এই শ্লোগান খানিকক্ষণ চালানোর পর এই একই বিষয় নিয়ে নতুন শ্লোগানে যায়, উত্তরবঙ্গে বিচ্ছিন্নতাবাদ রুখবোই রুখবো। একই ছন্দে এই শ্লোগানের একটা হিন্দি চেহারাও আছে রুখনে হোগা, রুখনে হোগা।
কিন্তু বিচ্ছিন্নতাবাদ এই একটি আওয়াজের জন্যে শ্লোগানটা যেন জমে না। পরের শ্লোগানটা হিন্দিতে-বাংলায় দুটোতেই জমে যায়, বাংলাকো পাঞ্জাব বানানা রোখনা হি রোখনা। রুখবই রুখব।
এদের শ্লোগান বলার নিজস্ব একটা ধরন আছে–সে গ্রামেরই লোক হোক আর বাগানেরই হোক। প্রথমে কিছুক্ষণ চেঁচামেচি করে গরম-গরম ভাব হয়ত কিছু ছেলেছোকরা এনে দেয়। কিন্তু যখনই দরকার হয়ে পড়ে অনেকক্ষণ ধরে টানা শ্লোগানের, তখনই এদের গলা একটা অদ্ভুত খাদে নেমে আসে, আর প্রায় গুনগুনের চাইতে সামান্য একটু উঁচু গ্রামে শ্লোগান চলতেই থাকে, চলতেই থাকে, কখনো না-থামার মত করে চলতে থাকে। এক দিকে যেমন সেই স্বরগ্রামকে কিছুতেই উঁচু করা যায় না, তেমনি, যেন এদের শ্লোগান দেয়া থামানোও যায় না।
ছেলেটি এবার তার শ্লোগানগুলোকে আরো নির্দিষ্টতায় আনতে চায়। সে সেই স্থায়ী শ্লোগানগুলি আউড়ে এবার বলে, তিস্তা ব্যারেজ করল কে, বামফ্রন্ট সরকার আবার কে? তিস্তা ব্যারেজকা পানিলেক নয়া দিন আগেলাক, পাহাড় ও সমতলের ঐক্য জিন্দাবাদ, গোখা-রাজবংশী ভাই ভাই জিন্দাবাদ জিন্দাবাদ, গোখা-দেশিয়া-মদেশি একাই, জিন্দাবাদ জিন্দাবাদ, চা বাগিচা কা মজদুর বস্তিলোককা দোস্ত ভুলো মত, ভুলো মত।
কিন্তু এই শ্লোগানগুলির মধ্যে এমন রাজনীতি নিহিত আছে যে কিছুতেই স্বচ্ছন্দ হতে চায় না। বেশ খানিকক্ষণ শ্লোগান চালানোর পর ছেলেটি থামে, পকেট থেকে রুমাল বের করে মুখ মোছে। সে থেমে যাওয়ার পরও কিন্তু ট্রাকের ভেতর থেকে শ্লোগানের দোহারকির গুঞ্জন উঠতেই থাকে–সে যে থেমে গেছে ওটা টের না পেয়ে কেউ-কেউ জিন্দাবাদ জিন্দাবাদ নাহি চলেগা নাহি চলেগা বলেই যায়। এ-রকম দু-চারবার বলবার পর তারা বোঝে শ্লোগান থেমে গেছে।
