এই উঠো না কেনে, তোমরালা যেইঠে আসিছেন সেই বাসত যান, হামরালার বাসত উঠিছেন কেনে। এই ওঠো, নামো–মাদারির মায়ের দুপাশ থেকে এই কথা শুরু হলেও মাদারির মা নড়েনি। কিন্তু এই সমর্থন পেয়েই মহিলা মাদারির মার একটা হাত ধরে এমন হ্যাঁচকা টান দিল যে মাদারির মা উঠে পড়ে। মহিলার এটা হিশেবে ছিল না। আরো গোটা কয়েক টান দিলে মাদারির মা উঠবে, এরকম ভেবেই তার টানাটানি শুরু। কিন্তু তার প্রথম টানের মাঝামাঝিই মাদারির মা উঠে পড়ে। মহিলা হঠাৎ হুড়মুড় করে পেছনে পড়ে যায়। তবে বাসে এতই গাদাগাদি ভিড় যে কাউকে পড়ে যেতে হলেও বাচ্চাকাচ্চার ওপর, বা, উল্টো দিকের বেঞ্চে যারা বসে আছে, তাদের ওপর পড়তে হবে। মহিলা পড়ে যাওয়া মাত্রই হে-ই মাই গে বলে কান্নাকাটির একটা আভাস তৈরি হতেই, মাদারির মা বাস থেকে নেমে যেতে পারে, আর মহিলাকে পেছনের মেয়েরা ঠেলে সোজা করে বাসের ভেতর দাঁড় করিয়ে দেয়। বাসের ভেতর ত আর দাঁড়ানো যায় না। মহিলার মাথাটা কাঠে একটু ঠক করে লাগতেই মাথায় হাত দিয়ে নিজের পায়ের ওপর সোজা হয়ে গিয়ে, ঘুরে, মাদারির মায়ের ফাঁকা জায়গাটাতে বসে পড়ে।
মাদারি বাসের বাইরে মাকে জিজ্ঞাসা করে মাই গে, নামিবার ধরিছিস কেনে?
মাদারির মা খুব আস্তে বলে, মোক নিছে না, নামি দিছে।
কায় নামি দিছে? মাদারি তার মায়ের সামনে এসে, তার পেটে হাত রেখে জিজ্ঞেস করে।
সগায় ত নামি দিছে–কহিছে এ-বাসত হামরালাক নিবে না, মাদারির মা নিরাসক্ত ভাবে তার ছেলের দিকে তাকিয়ে বলে, যেন সে তাকে নামিয়ে দেয়ার যুক্তিটা বোঝে। জলুশ মানে ত সবাই মিলে একসঙ্গে যাওয়া। মাদারির মা ত সেখানে সত্যি একা, তার ত আর কোনো দল নেই। যাদের দল আছে, তারা ত তাকে নাও নিতে পারে। মাদারির মা ত আর কোনো বস্তিতে থাকে না–তাকে বস্তির লোকরা দেখেই ভাবে কোনো বাগানের লোক। কেউ যদি তার সঙ্গে কোনো কথা বলত, তা হলেও কি তারা, গ্রামের লোকরা, বুঝতে পারত সে তাদেরই লোক? শুধু কথা শুনেই কি আর তারা মেনে নিত?
মাদারি ব্যস্ত হয়ে ওঠে, তুই জলুশত যাবু না?
মাদারির মা একটু হেসে বলে, ক্যানং করি যাম? কোনো বাস নাই রে।
মাদারি হঠাৎ ব্যস্ত হয়ে তার হাত ধরে টানে, চ, মোরা ঐ বাসঠে যাই—
মাদারির মা তার সঙ্গে-সঙ্গে যায়। কিন্তু সেই বাসের পেছনের দরজায় মানুষ ঝুলে আছে, বাস ছাড়ার আগেই! জানলা দিয়ে বাগানের মেয়েরা কিছুটা মুখ বাড়িয়ে আছে। মাদারি তাদের দিকে তাকিয়ে বলে, হে-এ দিদি, মোর মাইটা আর হামাক নে কেনে, হে দিদি, মোক নে কেনে, মোর মাইটা নে কেনে।
এত চেঁচামেচির ভেতর মাদারির কথা কারো কানে ঢোকে না। কিন্তু একটা মেয়ে হাত বাড়িয়ে বলেই ত বাগানকা বাস হলেক, ঐ ট্রাকমে চড়ি যা, সে আঙুল দিয়ে ট্রাকটা দেখায়ও।
মাদারির মাকে দেখে বাগানের মেয়েরা ভেবেছে, গ্রামের থেকে এসেছে। মায়ের হাত ধরে টানতে-টানতে মাদারি তখন ট্রাকের দিকে ছোটে। সে ছোটে বলেই তার মাকেও একটু ছুটেই হাঁটতে হয়। আবার প্রথম বাসটা পেরিয়ে ট্রাকটার কাছে যেতেই মাদারি দেখে বাহাদুর। ব্যাটন হাতে বাসের ওপরে লোক তুলছে।
হে-এ বাহাদুরদা, এক হাতে মার হাত ধরা, আর এক হাতে বাহাদুরের বেল্ট ধরে মাদারি টানে, হে-এ বাহাদুরদা, হে-এ
বাহাদুর মাথা না ঘুরিয়ে চিৎকার করে, চোপ যাও, তারপর বাসের সিঁড়ির মাঝামাঝি পর্যন্ত যে-লোকটা উঠেছে, কিন্তু, বাসের ছাদে আর পা রাখার জায়গা পাচ্ছে না, তার পেছনে ব্যাটনের খোঁচা দিয়ে বলে, উঠো, উঠো কেনে, উঠো।
লোকটি বিপদে পড়ে। সে সত্যিই পেছনে ব্যাটনের খোঁচা খেয়ে বাসের ছাদে একটা পা রাখে তাড়াতাড়ি। পাটা একজনের গায়ের ওপর পড়ে, সে কায় রে বলে পাটা সরিয়ে দেয়, কিন্তু পাটা পড়ে ছাদের ওপরই। লোকটা তাড়াতাড়ি হামাগুড়ি দিয়ে উঠে পেছন ফিরে বাহাদুরকে বলে, পাছত কাঠি সিন্ধাইছেন কেনে?
বাহাদুর নীচে থেকেই চিৎকার করে, যান, ভিতরত যান।
লোকটার তখন হামাগুড়ি-দেয়া অবস্থা, সে পায়ের ওপরে বসতে গেলে গড়িয়ে পড়ে যাবে, কিন্তু সামনেও বসার জায়গা নেই।
বাহাদুর উঠো উঠো করে ব্যাটন ঘুরিয়ে পেছন ফিরেই দেখে, মাদারি। দেখে সে চিৎকার করে ওঠে, হেই গে, এ্যালায়ও উঠিস নাই গে।
মাদারি বাহাদুরের দিকে মুখ তুলে বলে, মোক নামি দিছে, মাঅক নামি দিছে, মোর যাইবার বাস নাই রো
কায় নামি দিছে? বাহাদুর চিৎকার করে ওঠে। কিন্তু ততক্ষণে ওদিককার বাসটা স্টার্ট দিয়েছে। এই বাসের ক্লিনার গাড়ির গায়ে জোরে-জোরে চড় মারে। বাহাদুর হঠাৎ সচকিত হয়ে বলে, খাইছে, খাইছে, সব স্টার্ট নিবার ধরিছে, চল কেনে, চল্।
বলেই বাহাদুর ব্যাটনটা বা হাতে নিয়ে, ডান হাতে মাদারির হাত ধরে টানে আর মাদারি তার মার হাত ধরে টানে। বাহাদুরের টানে তাদের, মাদারি ও তার মাকে, দৌড়তে-দৌড়তেই ট্রাকের কাছে গিয়ে দাঁড়াতে হয়।
ট্রাকের পেছনের ডালা তখন উঠে গেছে। বাহাদুর সেই ডালার ওপর তার ব্যাটন মেরে চিৎকার করে, হে-ই খুলি দাও কেনে, মানষি পড়ি আছে, খুলি দাও, খুলি দাও।
ট্রাকটায় তখন অনেকে দাঁড়িয়ে, বাগানের অনেক ছোকরা তিনটি ডার্লর ওপর বসে। নীচে থেকে। কে চেঁচাচ্ছে, সেটা শোনার মত অবস্থাও কারো নেই। বাহাদুর আবার মাদারির হাত ধরে সামনে চলে আসে, ড্রাইভারের দরজায় ধাক্কা দিয়ে বলে, আরে মানষি পড়ি আছে, তুলি নেন কেনে।
