এই মেয়েরা বাসে-ট্রাকে উঠে যাবার পর বাকিরা বুঝতে পারে ওরা তাড়াতাড়ি ভাল জায়গা নিয়ে নিল। তখন গ্রামের লোকজন, ছেলেপিলে, বেউবুড়িরাও দৌড়ে বাস আর ট্রাকের ভেতর উঠতে শুরু করে। উঠতে গিয়ে একজনের সঙ্গে আর-একজনের ধাক্কা লেগে যায়, একজনের ছাতা আর-এক জনের পেটে লাগে, কারো হাত থেকে বাচ্চাছেলে খসে গেছে বাচ্চাটা তারস্বরে কাঁদে।
আর, বাহাদুর তার ব্যাটন উঁচিয়ে একবার প্রথম বাসটার সামনে দাঁড়ায়-এই খবরদার, সাবোধান, লাইন লাগাও,–আর এই একই কথা বলতে বলতে একবার দ্বিতীয় বাসটার সামনে, আর-একবার ট্রাকটার সামনে গিয়ে, লাফায়।
ততক্ষণে পুরুষমানুষরা বাসের ছাদে ও ট্রাকের ভেতরে ওঠা শুরু করেছে-ট্রাকের ভেতরে তখনো কিছু জায়গা ছিল।
এর মধ্যে আবার বাসের ও ট্রাকের ভেতর থেকে ডাকাডাকি শুরু হয়েছে। যে যার নিজের লোকদের জন্যে জায়গা রেখে ডাকছে। এক বাড়ির লোক এক জায়গায় গায়ে গা লাগিয়ে বসতে চায়, এক পাড়ার লোকও এক জায়গাতেই থাকতে চায়।
কিন্তু গাড়িতে ওঠার সময় ত আর কেউ পেছনে ফিরে তাকায় নি–তখন যে যার মত আগেভাগে জায়গা নিতে চেয়েছে। এখন তাই বাসের ভেতর-বাহিরে এরকম সব আওয়াজ উঠছে–
হে-এ-ই মাই গে, এইঠে আয় কেনে
কাকা গেই, হে-এ-ও কাকা, কাকা গেই
হে-এ বাহাদুর, বাহাদুর, মোর বিটিখান কোটত উঠিল এটু দেখি দে।
চাপি বসেন, চাপি বসেন, আরো লোক সিন্ধাবার নাগিবে।
এইঠে উঠিলেন আবার এইঠে নামি যাছেন?
আরে উঠিবার দেন, উঠিবার দেন, মোর বহিন নাগে, উঠিবার দেন।
যায় যেইঠে আছেন, নড়িবেন না, স্যালায় ব্যারাজত গিয়া বাছি নিবেন।
ছাদের উপর সাবধান, ডালত ধাক্কা না খান।
কিন্তু, এত কিছু সত্ত্বেও দুটি বাসে আর একটি ট্রাকে, জায়গা কুলোয় না। তখনো অনেকে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকে–তার মধ্যে বাচ্চা আছে, বুড়ি আছে, কয়েকজন ধুতি-শার্ট পরা, ছাতা হাতে, দেউনিয়া মানুষ আছে যাদের পক্ষে বাসের ছাদে ওঠা সম্ভব নয়।
রাস্তার ওপর দুজন শহরের ছেলে যে এতক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিল, তা কারো যেন খেয়ালেই পড়েনি। এখন তারা এগিয়ে আসতে বোঝা যায়, তারা এই বাস-ট্রাকের সঙ্গে এসেছে। তারা এসে ট্রাকের কাছে দাঁড়ায়। একটি ছেলে চাকা বেয়ে ওপরে উঠে যায়। উঠেই ধমকাতে শুরু করে- কী, নিজেরা বসলেই হবে, আর কাউকে উঠতে দিতে হবে না? নিন, সরে বসুন, এগিয়ে যান, এগিয়ে যান। দেখি, এই যে বুড়িমা, আপনি এই কোনায়, হ্যাঁ এই কোণে বসুন, তা হলে আর লোকের চাপ লাগবে না।
ছেলেটি বুড়িমাকে পেছন থেকে ধরে একটু উঁচু করে কোনাকুনি বসিয়ে দেয়। তাতে একটু হাসির রোল ওঠে। ছেলেটি বলে, হ্যাঁ, হাসতে-হাসতে এগিয়ে যান, এগিয়ে যান।
মেয়েদের সম্পর্কে তার স্বাভাবিক সমবোধ থেকে সে তাদের হাত দিয়ে ঠেলতে পারে না, কিন্তু সরে যান, সরে যান বলতে বলতে সে যে-ভাবে এগিয়ে যায় তাতে তার হাটুর খোঁচায় অনেকে সত্যি একটু সরে বসে।
ছেলেটি হঠাৎ মুখ বাড়িয়ে নীচের ছেলেটাকে বলে, বাসের ভেতর বাচ্চাদের কোলে নিয়ে বসা ত, দেখবি জায়গা হয়ে যাবে।
এই ছেলেটি ট্রাকের ওপর এক-একটা বাচ্চাকে তুলে ধরে বলে, এ কার বাচ্চা।
বাচ্চার মা এই-যে, এই-যে করতেই সবাই হেসে ওঠে। বিশেষত বাগানের মেয়েরা। তারা ত হেসেই আছে। বাগানে আজ করার সূত্রেই তারা ভদ্রলোকের ছেলেদের কথার ধারধোর ধরতে পারে কিছুটা।
এদিকে অন্য ছেলেটি বাসদুটোর জানলা দিয়ে চেঁচায়–বাচ্চাদের কোলে বসান, বাচ্চাদের কোলে বসান। তারপর বাহাদুরকে ডেকে বলে, বাচ্চাদের কোলে বসাতে বলুন, আর, এই বাচ্চাদের বাসে তুলে দিন কয়েকটি বাচ্চাকে মাঠ থেকে টেনে এনে সে বাহাদুরের সামনে দেয়। কিন্তু সে সরে যেতেই বাচ্চাগুলো তাদের বাবা কাকা মা-মাসির কাছে ছুটে চলে যায়। বাহাদুর অবিশ্যি ততক্ষণে বাসের জানলা দিয়ে তার ব্যাটন চালাচ্ছে-হেই ছোঁয়া, সিট ছাড়, তর মায়ের কোলত বস্।
ট্রাকের পেছন দিকে তখন খানিকটা জায়গা বেরিয়েছে। সেই দেউনিয়া চেহারার কয়েকজন এবং মেয়েরা ট্রাকে উঠে যেতে পারে।
.
২০৭.
মাদারির মায়ের ট্রাকারোহণ
মাদারির মা কোথাওই উঠতে পারে না। মাদারি যে-কোনো জায়গাতেই উঠতে পারত, কিন্তু মাকে ছাড়া। ওঠে কী করে।
জলুশ মানেই ত দল বেঁধে যাওয়া। বাড়ির লোকরা দল বাধে, টাড়ির লোকরা দল বাধে, বস্তির। লোকরা দল বাধে, বাগানের লোকরা দল বাধে। কেউ ছুটে গেলে দলের লোকরাই তাকে ডেকেডুকে নিয়ে নেয়।
কিন্তু মাদারির মার দল বাধা ত তার এইটুকু ছেলের সঙ্গে। তার ত আর কোনো টাড়ি নেই যে মাদারির মা বলে কেউ ডাকবে। সে বাসটার দিকে না গিয়ে যদি ট্রাকটার দিকে ছুটত তা হলে হয়ত একটা জায়গা পেয়ে যেত। কিন্তু বাসটাতে ত সে একটা বসার জায়গা পেয়েছিলও। একটা মোটামত বেটিছোয়া এসে তাকে ধমকে বলে, এইটা ত ধূপগুড়ির ভটচাজদের বাস, আমাদের জন্যে পাঠাইছে, তোমরা কেন উঠছ, নামো, নামো।
মাদারির মা তার কথাকে সত্য বলে মানে বটে কিন্তু নামে না।
সে-মহিলা একটু পেছিয়ে চেঁচাতে শুরু করে, এ-এ-ই বিশ্বাস, দেখ ত এইখানে কে বসে আছে? তারপর, আবার মুখটা মাদারির মার দিকে ঘুরিয়ে এনে বলে, নামো, নামা সিট থিকে, এবার সে মাদারির মায়ের হাত ধরে টানও দেয়।
