এখন এই ভিড় দেখে মনে হতে পারে, জলুশ বোধহয় একটাই হচ্ছে আর এর মধ্যে কামতাপুর, উত্তরখণ্ড, গোৰ্খাল্যান্ড, নমশূদ্র সমিতি–এই সব ভাগাভাগিও যেন কিছু নেই। সরকার ও সরকারের দলগুলি যে-ভাবে তিস্তা ব্যারেজের উদ্বোধন অনুষ্ঠানকে আগামী নির্বাচনের প্রথম মিটিঙে পরিণত করতে চাইছে তাতে ঐ সব খুচরো দলের পাত্তা পাওয়াই মুশকিল। তার ওপর, ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের, এগ্রো ইন্ড্রাস্ট্রিজের আর চা বাগানের ট্রাক সারা জেলা থেকে লোকগুলোকে তুলে নিয়ে সেই ব্যারেজ ফেলবে। সকাল হতে না-হতেই সে কাজ শুরু হয়েছে। লোক জড়ো করাই যদি সরকারের ও সরকারের দলগুলির একমাত্র উদ্দেশ্য হত তা হলে তিস্তা ব্যারেজের কাছাকাছি জায়গাগুলো থেকেই ত যথেষ্ট লোক আনতে পারত। কিন্তু সরকার ও সরকারের দলগুলি চায়, এই সমাবেশ থেকে সবাই যেন নিশ্চিত হয়ে যায় যে এই জেলায় ঐসব খুচরো দলের কোনো অস্তিত্ব ত নেইই, এমন-কি কংগ্রেসও নেই। সেই জন্যেই এত দূর-দূর থেকেও তোক নিয়ে যাওয়া।
কিন্তু এই সব ট্রাকে করে যারা যাচ্ছে তাদের ভেতর কামতাপুর, উত্তরখণ্ড, নমশূদ্র সমিতি বা গোর্খাল্যান্ডের লোকজনও দু-চারজন ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকতে পারে। এভাবে ত তাদের বাছাও যাবে না। এমন-কি উত্তরখণ্ড বা গোখাল্যান্ডের লোকজনের সরকারি ব্যবস্থায় যাওয়া অনেক বেশি নিরাপদ বোধ হতে পারে। এখানে, এই হাটখোলায় সেই ভাগাভাগি নিয়ে কোনো উত্তেজনা নেই, বা, পরস্পরের কোনো সন্দেহও নেই-যে-উত্তেজনা ও সন্দেহ থাকে তোটের দিন, সে পঞ্চায়েতের ভোটই হোক আর লোকসভার ভোটই হোক। দুটো আলাদা অফিসই যে তৈরি হয়ে যায় গাছতলায়, তাই নয়। এক-একটা ভোটকেন্দ্রে মাত্র সাতশ-আটশ ভোটারের মধ্যে হয়ত ভোট দেয়, বড় জোর সাড়ে তিনশ-চারশ জন; কিন্তু সেই ক-জন ভোটারের পছন্দ-অপছন্দ নিয়ন্ত্রণ করার জন্যে পুরো এলাকাটাতেই একটা উদ্বেগ-উত্তেজনা, কোনো সময় বা হিংস্রতা ছড়িয়ে পড়ে। তা সব সময় চাপাও থাকে না, বিশেষত চা বাগান এলাকায় প্রকাশ্য হয়েও যায়।
তাছাড়া, কামতাপুর-গোর্খাল্যান্ড-উত্তরখণ্ডনমশূদ্র সমিতি এই সবের সঙ্গে তিস্তা ব্যারেজের উদ্বোধনের ঘটনার ভেতরের সংযোগ কোথায়, তা ত এদের জানার কথাও নয়, এরা জানেও না। কিন্তু, না-জানলেও, চা বাগানের আন্দোলন বা জমি-জিরেতের নানা গোলমালে সরকার ও সরকারের দলগুলি সম্পর্কে যে-মনোভার তৈরি হয়ে আছে, তা থেকেই ত এরা নিজেদের ভূমিকা যথাস্থানে ঠিক করে নিতে পারবে।
আটটা বেজে যাওয়ার পর ধূপগুড়ির ভটচাজদের দুটো হাটবাস আর সিংজির একটা বিরাট বড় ট্রাক এসে দাঁড়ায়।
.
২০৬.
বাসে-ট্রাকে মিছিল ওঠে ট্রাকটা আর বাস দুটো প্রথমে এসে রাস্তার ওপর দাঁড়িয়ে পড়ে। ড্রাইভার মুখ বাড়িয়ে লোকজনকে কী জিজ্ঞাসা করে।
বাহাদুর তখন ছিল নাচের ওখানে, ভিড়ের পেছনে। বোধহয়, তারও একটু ক্লান্তি লেগেছিল। সে বাস আর ট্রাক দাঁড়াতে দেখে ছুটে রাস্তার দিকে যায়, ডান হাতে ব্যাটনটা তুলে। তার পেছন-পেছন বাচ্চাকাচ্চাদের একটা দলও ছোটে। ততক্ষণে বাসদুটোর ছোকরা দুজন রাস্তায় নেমে পেছনের ট্রাকটাকে একটু পেছিয়ে যেতে ইশারা করছে, আর বাসের গায়ে চড় মারছে একটা করে। পেছনের ট্রাকের ছোকরাটা ট্রাকের ওপর থেকেই ড্রাইভারের মাথার টিনে একটা চড় মারে, তারপর আস্তে-আস্তে চড় মারতেই থাকে। ট্রাকটা একটু পেছয়, তারপর রাস্তার উল্টোদিকে পেছনের চাকা চালায়। এর মধ্যে দ্বিতীয় বাসটাও একটু পেছিয়ে যায়।
বাহাদুর এসে রাস্তা আর হাটখোলার মধ্যে দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে ব্যাটনটা তুলে চিৎকার করে, এইঠে, এইঠে, ব্যাস, ঠিক আছে, সিধা, সিধা, সিধা
ট্রাক ও বাস দুটো ততক্ষণে রাস্তার ওপর পেছন ঘুরিয়ে এমন ভাবে দাঁড়িয়েছে যে একে-একে হাটখোলার সামনের জায়গাটুকুতে এসে ঢুকবে। বাহাদুর ব্যাটন উঁচু করে বাচ্চাদের দলটাকে তাড়া করে–এই হট, হট, বাস ঢুকিবার রাস্তা দে কেনে, সরি যাও, সরি যাও।
ট্রাক আর বাসগুলো সত্যিই যেন বাহাদুরের নির্দেশ মেনে-মেনেই নিজেদের মুখ ঠিক করে। তারপর রাস্তার ঢালে এসে দাঁড়ায় আর প্রথম বাসটা ধীরে ধীরে হাটখোলায় নেমে আসে, ধীরে-ধীরে খানিকটা এসে দাঁড়ায়, ড্রাইভার জানলা দিয়ে মাথা গলিয়ে পেছনে কী দেখে আবার খানিকটা এগিয়ে নিয়ে যায়।
পেছনের বাসটা ততক্ষণে, প্রথম বাসটার চাকার দাগ ধরে-ধরেই যেন, ঢাল থেকে হাটখোলায় নামে। প্রথম বাসটার পেছনে দাঁড়িয়ে বাহাদুর দুহাত উঁচু করে তাকে নির্দেশ দিতে থাকে–তার ডান হাতে ব্যাটন।
ট্রাকটা একটু তফাতে ছিল। সেটা একটা বেশ বড় ধরনের আওয়াজ করে বাঁ দিকে নেমে যায়, এই বাসগুলোর সঙ্গে ট্র্যাক রেখে বা দিকে। তারপর আরো একটা আওয়াজ তুলে থেমে যায়।
বাস আর ট্রাক যতক্ষণ রাস্তা থেকে মাঠে নামছিল ততক্ষণ এই ভিড়া নাচগুলোর দিকে পেছন ফিরে স্থির হয়ে দেখছিল। এক নাচের দলগুলোই যেন নেশায় নেচে চলে, যেন এই বাস-ট্রাক ইত্যাদির সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই, যেন এই ভিড় চলে গেলে যে-নির্জনতা পড়ে থাকবে তাতে তারা নাচের আরো গভীরে চলে যেতে পারবে।–
কিন্তু বাস আর ট্রাকগুলো যেই দাঁড়িয়ে গেল, সবগুলো নাচের দল পরস্পরের বাধা হাত মুহূর্তে খুলে ফেলে এই বাস আর ট্রাকগুলোর দিকে ছুটে গেল। গ্রামের রাজবংশীদের ভিড়টা ত নাচের বাইরে, এই বাস-ট্রাকগুলোর চারপাশেই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল। তারা কিছু বুঝে উঠবার আগেই নাচের মেয়েরা তাদের ফাঁক দিয়ে দৌড়ে বাস আর ট্রাকে উঠে পড়ে। তারপর তারা নিজেরা এক-একটা জায়গায় বসে পড়ার আনন্দে হেসে ওঠে। যে যখন জায়গা পাচ্ছে তখন হেসে উঠছে। একলা নয়, কয়েক জন। এক সঙ্গে ত আর তারা জায়গা পায় না। তাই কিছুক্ষণ শুধু হাসি ওঠে আর থামে। এত মাইল-মাইল হেঁটে এসে, এত ঘণ্টা-ঘণ্টা নেচে, এমন দৌড়ে বাসে-ট্রাকে ওঠায় তাদের হাসির মধ্যে একটু হাফছাড়া শ্বাসও ছিল।
