মাদারি হেসে বলে, না। মাটি। এইঠে ত চুল্লিটা, তার সমুখত, মাটিত- সে যেন তার মাকে ঘরের অবস্থানটা খুব ঠিক করে বোঝাতে চায়।
মাদারির মা বিস্কুটটা তাকে এগিয়ে দেয়। মাদারি কোমরে দুহাত দিয়ে বলে, এইটা তোর, বাহাদুরদা দিছে, তুই খা কেনে, মাই, খা, বাহাদুরদা দিছে, বিস্কুট, আর মুই বানাইছু চা, খা। মায়ের চা খাওয়া দেখাটাই যেন তার প্রধান কাজ এমন অনড় হয়ে থাকে সে।
মাদারির মা চায়ে বিস্কুট ভিজিয়ে একটা কামড় দেয় আর তার মুখটা চায়ের ঈষদুষ্ণ তরল স্বাদে ভরে যায়, সহজে শূন্য হয়ে যায় না। মুখের সেই বিবর ভরে থাকে বিস্কুটের নরম অথচ তখনো অখণ্ড টুকরোয়। সে চিবয় না। মুখের ভেতরের সব অঙ্গ দিয়ে–তালু, মাড়ি, দাঁত, জিভের পাশ, মাথা দিয়ে সেই নরম অখণ্ড টুকরোটা আস্বাদ করতে থাকে। বাহাদুর হক দেয়, হে-এ মাদারি, তোর চা নিগা।
সেই ভিড়টা থেকে একজন জিজ্ঞাসা করে, চা পাওয়া যাবু নাকি?
বাহাদুর তার হাত তুলে ঘোষণা করে দেয়, আজ জলুশ, আজ দোকান বন্ধ।
.
২০৫.
হাটখোলায় নাচ গান
সকাল আটটা-সাড়ে আটটা নাগাদ পুরো হাটখোলার কম্যান্ড যেন বাহাদুরের হাতে চলে যায়।
তখন থেকেই লোক জুটতে শুরু করেছে। রাস্তা জুড়ে সারি দিয়ে ত লোক আসছেই, রাস্তা ছাড়াও নানা দিক থেকে লোক উঠে আসে। হাটখোলার উত্তরের রাস্তা দিয়ে গান গাইতে-গাইতে দেবপাড়া বাগানের মেয়ে-মজুররা ফরেস্ট উতরে আসে। তাদের পেছনে ঢোল বাজাতে বাজাতে মরদরা। প্রায় প্রত্যেকেই স্নান করেছে, অন্তত তেল মেখেছে প্রচুর। মেয়েরা মাথার চুলে ফুল গুঁজেছে–হাতের কাছে যে-ফুল পেয়েছে তাই। কিন্তু হাতের কাছেও সবাই ফুল পায়নি, তখন পাতা গুঁজেছে-হাতের কাছে যে-পাতা পেয়েছে তাই। দু-একজনের মাথায় চা পাতার তোড়া। তারা নদী, টিলা আর ফরেস্ট পেরিয়ে যে এল সেটা বোঝা যায় পায়ের দিকে তাকালে। কিন্তু হাটখোলায় এসেও তাদের নাচ থামে না বরং এতক্ষণ যেন ফরেস্টের ভেতর দিয়ে আসতে-আসতে তারা নাচার ঠিক জায়গা পায়নি। তা ছাড়া, সময় মত হাটখোলায় পৌঁছবার তাড়াও ছিল। এখন এখানে এসে যখন দেখছে, হাতে সময় আছে, হাটখোলায় জায়গাও আছে প্রচুর, আর তাদের পায়ে নাচও জমা আছে–তারা গাইতে-গাইতে নাচতে শুরু করে দেয়। আর, তাদের পেছনে-পেছনে মরদরা ঢোল বাজায় আর দোলে, দোলে আর ঢোল বাজায়। একজন একটা বাঁশিও এনেছে। কিন্তু এতটাই হাড়িয়া খেয়েছে যে কিছুতেই বাঁশিটা ঠোঁটে লাগাতে পারে না। সে ঠোঁটে লাগাতে গিয়ে একবার থুতনিতে, একবার গালে, এমন-কি একবার গলায় লাগায়। লাগিয়ে ফুও দেয়। যখন বাজে না, তখন বাঁশিটা তুলে এনে তাকিয়ে পরীক্ষা করে। আবার বাঁশি ঠোঁটে লাগাতে চায়।
দেবপাড়ার দলের সঙ্গে কখন যে মিরপাড়া, খয়েরবাড়ি, মুমবাড়ির মজুররা মিশে যায় তা কেউ টেরও পায় না। একটা দল বেশি বড় হয়ে গেলে আর একটা দল তৈরি হয়ে যায়। তাদের ঢোল বাজতে থাকে, বাজতেই থাকে। বুড়িহোরসার চর থেকে একদল সাঁওতাল এসেছে, তারা চা-বাগানের এদের কাউকে চেনে না, কিন্তু ওদের নাচ আর ঢোল বোঝে-তারাও এদের সঙ্গে নাচতে শুরু করেছে। মনে হয়, আজ হাটখোলায় নাচ হবে–এটাই কথা ছিল।
পাশাপাশি গ্রাম থেকে রাজবংশীরাও উঠে এসেছে। তারাও তাদের সবচেয়ে পরিষ্কার জামা কাপড় পরে সেজেছে। মেয়েরা আর বয়স্ক পুররুষরা, মনে হয়, মান করেই এসেছে-নইলে মাথায় মুখে তেল মেখেছে। তাদের নাচ নেই–তারা গোল হয়ে দাঁড়িয়ে এই নাচ দেখে যাচ্ছে।
বাহাদুর একটা ব্যাটনও জোগাড় করেছে।
সে সেই ব্যাটন নিয়ে নাচ যারা দেখছে তাদের লাইন রাখতে ব্যস্ত। লম্বা-লম্বা পা ফেলে মিলিটারির, মত হাঁটছে। আর বাচ্চাদের বসিয়ে দিচ্ছে, মেয়েদের এক পাশে সরিয়ে দিচ্ছে, অকারণে এই পাছত যাও, পাছত যাও বলে চেঁচিয়ে উঠছে। বাহাদুরকে এরা প্রায় প্রত্যেকেই চেনে। তাই তার এই পরিবর্তনকেই সবচেয়ে নাটকীয় লাগে–নাচ আর ঢোল ত তারা প্রায়ই দেখে থাকে।
ভিড়ের ভেতর থেকে কে চিৎকার করে, হে-এ বাহাদুর, ঘোমশাই ডাকোছে।
বাহাদুর তার দিকে ব্যাটন উঁচিয়ে বলে, আইজ দুকান বন্ধু, আইজ জলুশ।
হঠাৎ একটা হৈ-হৈ আওয়াজে সবাই পেছনে তাকিয়ে দেখে তিনটি ট্রাক দাঁড়িয়ে আছে, রাস্তার ওপর, ভর্তি মেয়ে-পুরুষ, একটা ঝাণ্ডা-মতও কী আছে, তারা নাচ আর ঢোলের আওয়াজ পেয়ে ট্রাকের ভেতরই যেন নেচে উঠতে চায়। বাহাদুর দৌড়ে তাদের কাছে যায়। একজন ড্রাইভারের পাশের আসন থেকে গলা বাড়িয়ে কী জিজ্ঞাসা করে, বাহাদুর তাকে জবাব দেয়, ট্রাক ত এ্যালায়ও আসে নাই, আসিবার টাইম হই গিছে। সেই ট্রাক একটু আওয়াজ তুলে চলে যায়। বাহাদুর পেছনে ট্রাকটার পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। আর ড্রাইভারকে উদ্দেশ্য করে যেন বলে–চলি যান, মোরা যাছি। তৃতীয় ট্রাকটাকে সে হাত তুলে চালাতে নিষেধ করে, তারপর রাস্তাটা পেরিয়ে গিয়ে ব্যাটনটা তুলে চালাবার নির্দেশ দেয়। সেই ট্রাকটা চলে গেলে বাহাদুর চিৎকার করে ওঠে, হাপাড়া টি এস্টেট চলি গেইছে, এ্যালায় লঙ্কাপাড়া আসিবার ধরিছে–
তা তোমারখান কখন আসিবার ধরিবে হে বাহাদুর? বুড়োমত ছোটখাট একজন এসে বাহাদুরকে জিজ্ঞাসা করে।
উমারায় সব বাগানের মানষি, নিজের ট্রাক, উঠি বসিছে, স্টার্ট দিছে, আর তোমার এ্যালায় কুন কনট্রাকটর আসি ট্রাকগাড়ি দিবে, ছাড়িবে, তার বাদে তোমরালা জলুশত যাবেন। স্যালায় জলুশ ফরসা। হ-য়, পক পক করি মুখ্যমন্ত্রী আসিবেন মোর বনমন্ত্রীখানও থাকিবে। আর হামরালা য্যালায় যাম, দেখিম বাশ গিলান খাড়া আছে–মন্ত্রীও নাই, তিস্তাও নাই। তোর্সর মানষির তিস্তা নাই রো, তিস্তা নাই-বাহাদুর আবার সেই নাচের দলটার দিকে চলে যায়। যারা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিল তাদের ভিড়টাও একটু আলগা হয়ে গেছে। পেছন থেকে বাহাদুর চিৎকার করে ওঠে, হে-ই, লাইন ঠিক রাখো কেনে, লাইন ঠিক বানাও, এই ছাওয়া-ছোটর দল, মারিব একখান, ব্যাস, ট্রাক আসি গেলে সব লাইন দিয়া উঠিবেন, ওয়ান-টু-থ্রি।
