দে, রাখি দে, বাহাদুর আস্তেই বলে।
ঘোষমশাইয়ের দোকানটা একটু বড়। খড়ের দোচালা, মাটির ভিটে, শুধু চুল্লি আর এই আলমারি রাখার জায়গাটা বাধানো। বাঁধানো বটে, কিন্তু মাটিতে-মাটিতে এখনই এমন ময়লা যে সিমেন্ট আর দেখা যায় না। দোকানে সারি-সারি বেঞ্চি পাতা, একটা উঁচু বেঞ্চি, একটা নিচু–ইস্কুলের ক্লাশের মত। সেই চালের বাতার এক-এক জায়গায় এক-একটি জিনিশ গোজা। নামিয়ে নামিয়ে বাহাদুর সাজগোছ করছি। ঘরের ঐ দিকগুলোতেও ঝাঁপ আছে। সেগুলো খুলে দিলে মনে হয় যেন মাথার ওপরেও কোনো চাল নেই। শুধু পেছনের ঝাপটা হাটের দিন খেলা হয় না–পাছে কেউ পয়সা না দিয়ে পেছন থেকেই কেটে পড়ে। এখন ঝাঁপগুলো সব নামানো। শুধু এই চুল্লির পাশের ছোট ঝাপটা ভোলা! ফলে, এত বড় দোকানের ভেতরটা অন্ধকারই লাগছে। সেই কারণেই বাহাদুর আর মাদারি এমন চিৎকার করে কথা বলছে।
অথবা, হাটের দিন দোকানের ভেতর এরকম চিৎকার করে কথা বলার অভ্যেস থেকেই এখনো। বলে যাচ্ছে।
মাদারি মগটা দুই হাতে তোলে। তারপর, আবার নামিয়ে রাখে–মগটা নিয়ে উঠতে গেলে যদি চলকে পড়ে যায়। মাদারি দাঁড়িয়ে মগটার ওপর নিচু হয়ে তার কানায় দুহাত লাগিয়ে তোলে। কিন্তু, সোজা হওয়ার আগেই আবার নিচু হয়ে মগটা রেখে দিল। কানা ধরে এরকম করে তুলে সে ত টেবিলের ওপর রাখতে পারবে না। সেখানে ত তাকে আবার আঙুল উঁচু করতে হবে। এবার নিচু হয়ে সে মগটার দুটো পাশ বাইরে থেকে চাপ দিয়ে ধরে, তারপর তোলে। গরম আছে, তবে চা ত আধা-আধি, হাতে অত লাগছে না। ডান হাতটা একটু পিছলে নেমে যায় বটে কিন্তু ঐ ভাবেই মাদারি কয়েক পা হেঁটে টেবিলের কাছ পর্যন্ত যেতে পারে। সেখানে গিয়ে সে একটু দাঁড়ায়, তারপর মগসহ হাত দুটো নিজের মাথার ওপর তুলে ঠক করে মগটা টেবিলের ওপর নামায়।
নিজের হাত দুটো নিজের শরীরের দুপাশে ঝুলিয়ে মাদারি বয়স্ক লোকের মত একটা শ্বাস ফেলে। তারপর নাক টেনে আবার চেঁচায়, হে-এ বাহাদুরদা
বাহাদুর এবার যেন খুব কাছ থেকে বলছে এমন স্বরে বলে, ক কেনে।
রাখিছু। মগখান টেবিলত রাখিছু।
খাড়া। আসিছু–
মাদারি, যেখানে বসে চা বানিয়েছিল সেই জায়গাটার দিকে তাকায়। দেখে, চামচটা পড়ে আছে। চামচটা তুলে এনে টেবিলের ওপর রাখতেই গটগট আওয়াজ তুলে বাহাদুর এসে হাজির। মাদারি যেন তার এত সাধনায় তৈরি চা ভুলে যায় মুগ্ধ হয়ে দেখে বাহাদুরের টেরি, গোল ছবি-আঁকা গেঞ্জি, লোহার নাল লাগানো চওড়া বেল্ট, নীল রঙের সরু প্যান্ট ও পায়ে একটা বড় জুতো। বড়, মানে, জুতোটা যেন গোড়ালি থেকে অনেকটা উঁচু পর্যন্ত পা ঢেকে রেখেছে। এর মধ্যে বাহাদুরের টেরিটাই একমাত্র তার চেনা। বাহাদুরকে এত অচেনা লাগে মাদারির যে দু-এক পা পেছনে সরে গিয়ে বাহাদুরকে দেখে।
বাহাদুর এসে তিনটে কাঁচের গ্লাশ সাজিয়ে মগ থেকে চা ঢেলে ভর্তি করে দেয়। একটা গ্লাশ শুধু হাত বাড়িয়ে, শরীর না ঘুরিয়ে, মাদারির দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে, তোর মাক দিয়া আয়
মাদারি পাশ দিয়ে বেরতে গেলে বাহাদুর বলে, খাড়া কেনে।
তারপর মিষ্টির আলমারির তালাটা খুলে ঘোমশাইয়ের চৌকির ওপর রেখে, তালাটার চাবি ছিল না, ভেতর থেকে একটা প্লাস্টিকের বয়ম বের করে, খুলে, একটা লম্বা কুকিস বিস্কুট মাদারির হাতে দিয়ে বলে, যা, মাক দিয়া আয়।
গ্লাশ আর বিস্কুটটা নিয়ে দুপা গিয়ে মাদারির কেমন সন্দেহ হয় যেন, সে দাঁড়িয়ে পড়ে, না ঘুরে, মাথাটা একটু হেলিয়ে বলে, চা আর বিস্কুট দুইখানই মাইঅক দিম?
হয়, হয়। আর তোরটা এইঠে থাকি, বলে বাহাদুর তার চায়ের গ্লাশ আর বিস্কুট নিয়ে সেই ছোট ঝাপটা দিয়ে বাইরে বেরয়।
ঘোষমশাইয়ের দোকানটা হাটখোলার একেবারে দক্ষিণ সীমায়, বড় রাস্তার প্রায় গা ঘেঁষে। বলা উচিত দক্ষিণ-পশ্চিম কোনায়। কিন্তু টিউবওয়েলটা দোকানেরও দক্ষিণে। এই দক্ষিণ দিকটা দোকানের পেছন দিক হয়ে যেত টিউবওয়েলটা না থাকলে। এখন সেদিকের ঝাপটা দিয়ে বেরিয়ে দোকানটা ঘুরে ওদের হাটখোলা রাস্তা এ-সবের ভেতরে পড়তে হয়।
সেই বাইরে এসে বোঝা যায়–হঠাৎ যেন সকালটা অনেক বেড়ে গেছে। কোথাও কুয়াশা নেই। রোদ এসে পড়েছে হাটখোলার নানা ভাঙা চালে, নানা খোলা ভিটেয়, রাস্তায়। হাটের অসমতল ধুলো, মানুষের পায়ে-পায়ে এলোমেলো ধুলো, হিমে ভিজে নেতিয়ে। মাদারির মা রাস্তায়, একটু রোদে বসে। রাস্তাতেই আরো দু-চারজন লোক ঘোরাফেরা করছে। হাটখোলার একটা ভিটের ওপর জনাদশবার লোকের একটা ভিড় দাঁড়িয়ে আছে, রোদেই।
এই রকম প্রকাশ্য জায়গা দিয়ে, এত লোক পেরিয়ে, এতটা হেঁটে মাদারি তার মাকে চা-বিস্কুট দিচ্ছে–এটা যেন মানায় না। মানায় কি না-মানায় সেটা না-জেনেই মাদারি ঘোমশাইয়ের দোকান ঘুরে এদিকে এসে তার মাকে খুঁজতে এদিক-ওদিক তাকিয়ে কেমন অপ্রস্তুত বোধ করে। কেন অপ্রস্তুত বোধ করে সেটা ত সে বোঝে না। তাই মাকে খুঁজে পেয়ে চায়ের গ্লাশ আর বিস্কুট নিয়ে তার দিকে এগিয়ে যায়।
মাকে চা দিয়ে মাদারি বলে, মুই বানাইছু, বাহাদুরদা মোক শিখাইছে।
চা নিয়ে মাদারির মা বলে, টেবিল? যেন এটা জানা তার পক্ষে সবচেয়ে জরুরি যে হঠাৎ আজ জলুশের সকালে মাদারি মাথায় চা বানানোর টেবিলের সমান উঁচু হয়ে গেল নাকি?
