না। তা ত বটেই। কিন্তু ছোটবেলাতেও কি এখানে ছিলেন? মানে তিস্তা কি বরাবরই এরকম কাছাকাছিই ছিল?
তিস্তা ত স্যার, আটষট্টি সনটাক যদি বাদ করি ধরেন, তা হলে ধরেন একখান বলা যায় গয়ানাথ সুহাসের প্রথম প্রশ্নটার কোনো জবাব দেয় না।
মানে, আটষট্টির, ফ্লাডেই সবটা বদলাল?
না, সে ত বদল হয়ই, নদী ত আর মানষির দালানবাড়ি না-হয়, যে, একেবারে পাকা থাকিবে, নড়চড় না হবে। বদল ত হয়ই হওয়া নাগে।
সুহাস ওঁর কাছে আসলে জানতে চাইছিল সে ম্যাপের সঙ্গে মিলিয়ে যেবদলটা দেখছে তার কতটা এদের চোখে দেখা। কিন্তু গয়ানাথ অত দার্শনিকতায় পৌঁছে গেছে দেখে সে আর কথা বাড়ায় না। গয়ানাথের যেন খানিকটা প্রতীক্ষা ছিল, সুহাস কিছু বলবে, সেটুকু জুড়ে তীক্ষ্ণতর ঝিঁঝির ডাক আর প্রতিধ্বনিত তিস্তার গর্জনে এই ফরেস্টটা আরো ঘন ও নীরবতা আরো প্রসারিত হয়।
গয়ানাথ যেন আত্মচিন্তার মতই আবার যোগ করে, কিন্তু আবার নদীর ত একটা পাকাপাকি ভাবও আছে। অ, যতই ভাঙুক আর সক স্যার শ্যাষম্যাস একটা ঠিকই হয়। ধরেন–
গয়ানাথ একটু থামে। কী উদাহরণ দেবে সেটি তাকে একটু ভাবতে হয় যেন। আর সুহাসও একটা অনুমানের চেষ্টা করে–গয়ানাথ তার নিজের কয়েক বছরের কোনো দেখাকে যেন একটা পাকা সিদ্ধান্তের মত করে বলছে। নদীর পাড় একেবারেই বদলে যায়, নদী পুরনো খাতে আর ফিরে যায় না, এমন ঘটনা গয়ানাথ দেখে নি, কিন্তু তাই বলে ত সেটা মিথ্যা নয়। সুহাস যেন বুঝে যায়, গয়ানাথের কাছে তার ম্যাপের সাক্ষ্যের যে-সমর্থন চাইছিল তা পাওয়া যাবে না।
এই নীরবতায় তারা ভেজাপচা পাতার ওপর দিয়ে চলে যায়। সুহাস প্রিয়নাথকে জিজ্ঞাসা করে, কোথায়? প্রিয়নাথ কোনাকুনি হাতটা তুলে একটা আন্দাজ দেয়। সেই সময় গয়ানাথ বলে, ধরেন, এই আটষট্টির বানাটাই ধরেন। তিস্তা ত, ধরেন, এইখান থিকা সোজা বায়ে ঢুকে, ধরেন, তিস্তা আর ধরলার মাঝখানে যে বিশাল তেকেনিয়া জায়গাখান, ঐটাকে ভাজি-ভাসি চলি গেল। আমরা ভাবিলাম, এই হইল, এখন থিকা ধরলার খাতখান তিস্তার খাত হয়্যা যাবে। কিন্তু তিস্তা ত আবার তার পুরানা খাতেই ফিরি গেল। এখনো যাছে।
এই একটু আগে যে-জায়গাগুলিকে ম্যাপ থেকে বাদ দেবে বলে ঢ্যারা কেটে এসেছে সেগুলোর কথা মনে রেখে সুহাস বলে-কিন্তু আপনাদের ত কত গ্রাম ভেসে গেছে। নামগুলো তার মনে পড়ে না। যেটা মনে পড়ে, সেটাই বলে, এই ফরেস্টেরই ত অনেকখানি ভেসে গেছে। এর উত্তরে হাঁসখালি।
কিন্তু স্যার, নদী মানেই ত ভাঙাভাঙি। যার পার ভাঙে আর নতুন পাড় হয়, সেইটা হয় নদী। আর যার পাড় ভাঙেও না নতুনও হয় না, ঐটা হয় ডোবা।
নদীর এই সংজ্ঞায় সুহাস বেশ চমৎকৃত হয়। সে কিছু বলতে যাচ্ছিল কিন্তু তার আগেই গয়ানাথ আবার শুরু করে দিয়েছে কিন্তু আপলাদের যত ভাঙিছে, ততখানই আবার গড়িবার ধরিছে।
কোথায়?
যেইঠে ভাঙিছে সেইঠেই, নতুন চর, নতুন জঙ্গল।
স্যার এই দিকে, প্রিয়নাথ বায়ে ঘোরে। আর সঙ্গে সঙ্গে তিস্তার গর্জন যেন বেড়ে যায়। একটা ঝোঁপ পার হতেই সামনে কয়েকটা গাছের ফাঁকে দেখা যায় তিস্তা। বিনোদবাবু এক জায়গায় ভাঙা গাছের ওপর বসে খাতায় নোট করছেন। সুহাসরা এল দেখে উঠে দাঁড়ান।
.
০২৩.
নদীর ম্যাপ আঁকা
স্যার, আপনি কি ম্যাপ কমপেয়ার করলেন?
হ্যাঁ, এই দেখুন। যেগুলোতে ক্ৰশ, তা বাদ যাবেই, তা হলে একটা আউট লাইন পাওয়া যায় বটে, কিন্তু ফরেস্টের, মানে এই ভিলেজটার টোটাল একারেজটা দরকার। তা হলে আগের একারেজের সঙ্গে এটার একটা কমপ্যারিজন করা যেত। দেখুন, আমার ডিমার্কেশন। সুহাস প্রিয়নাথের দিকে হাত বাড়ায়। প্রিয়নাথ ম্যাপটা খুলতে শুরু করে। সুহাস বলে, সাবধানে খুলবেন তারপর বিনোদবাবুর দিকে তাকিয়ে হেসে বলে, আমার হাত থেকে ম্যাপটা উড়ে গিয়েছিল, ওখানে। বিনোদবাবু সামান্য হাসির ভঙ্গি আনেন। সুহাস তখন নিজে হেসে বলে, একেবারে গাছের মাথায়।
মাটিতে ম্যাপটা পাতা হয়েছিল। সেই পড়েযাওয়া গাছটার ওপর এখন সুহাস বসে। বিনোদবাবু মাটির ওপর উবু হয়ে ম্যাপটার ঢেরা দেয়া জায়গাগুলোর ওপর দিয়ে আঙুলটা টেনে-টেনে বুঝে নেন। প্রিয়নাথ ম্যাপটা একদিকে চেপে থাকে। আর গয়ানাথ একটু দূরে দাঁড়িয়ে মাথাটা নিচু করে ম্যাপটার দিকেই তাকিয়ে থাকে, কিন্তু বোঝাই যায় সেখানে কিছু দেখছে না।
ব্যাপারটা বুঝে নিয়ে বিনোদবাবু উঠে দাঁড়িয়ে প্রিয়নাথকে বলেন, প্রিয়নাথ, চেইনটা একটু বায়ে সরাতে বলোত অনাথকে। আর-একটু ডাইনে সরো। মানে কোনাকুনি হবে। ঐটাকেই তা হলে পয়েন্ট ধরি স্যার, আপনি যেখান থেকে দেখলেন?
ধরুন, ওটা ত ভাল পয়েন্টই হবে।
প্রিয়নাথ শেকলটা একটু নাড়া দিয়ে চিৎকার করে কিছু বলে। তিস্তার বাতাসে সে-চিৎকার ভেসে। যায়। কিন্তু ওরকম ভাবেই ভেসে আসে অনাথেরও চিৎকার। বিনোদবাবু মেপে বলেন, হ্যাঁ ঠিক। আছে। নাকি, আর-একটু ছেড়ে দেব স্যার?
কথাটার জবাব খুঁজতে সুহাস একেবারে পাড়ে গিয়ে তিস্তার গতিটা আন্দাজের চেষ্টা পায়। নদীর দিকে তাকানো, মানেই ত ওপারের দিকে তাকানো, নীলাভ দিগন্তসীমায়। কিন্তু সুহাস তাকিয়ে আছে এই পারের তটরেখার দিকে, তার পায়ের তলায়।
এখানে পাড়টা অনেক বেশি খাড়া। আর, একেবারে পাড় থেকে ঝাকড়া মাথার বিরাট গাছ, লাম্পাতি, হালকা গাছ বলেই দাঁড়িয়ে থাকতে পারে। শাল হলে নিজের ওজনেই ভেঙে পড়ত। ওরা যেখানে দাঁড়িয়ে তার কয়েক হাতের মধ্যে একটা বিশাল খয়ের গাছ ডালপালা সমেত উপুড় হয়ে জলের মধ্যে পড়ে। জলের মধ্যে পড়া সত্ত্বেও তার ডালপালা-পাতা সব জলের ওপরেই আছে–তলার দিকের খানিকটা জলে ডুবে গেছে। সুহাস একটু ঝুঁকে দেখে, তলার মাটিটাও খেয়ে নিচ্ছে। সে বলে, এদিকে ত পাড়টা আরো ভাঙবে বলে মনে হয়, আর-একটু ছাড়বেন নাকি? …–
