মাদারি আবার দুই হাতের এক হ্যাঁচকা টানে হ্যান্ডেলটাকে নামায়, এবার এক টানেই হ্যান্ডেলটা নেমে আসে, আবার পেটের ভর দিয়ে হ্যান্ডেলটার ওপর ঝোলে আর শরীরের ভর দিয়ে হ্যান্ডেলটাকে নামিয়ে এনে নামিয়ে রাখে। হড়হড় করে জল পড়তে শুরু করলে বাহাদুর মুখপোয়া শেষ করে হাতেরও কিছুটা ধুয়ে ফেলে উঠে দাঁড়ায়, কলপাড় থেকে সরে আসে। মাদারি হ্যান্ডেলটা ছেড়ে দিলে একটা আওয়াজ করে সেটা ওপরে উঠে যায়। আনাড়ি লোক এই কল চালাতে গিয়ে থুতনিতে, বা কপালে, হ্যাঁন্ডেলের ধাক্কা খায়।
মাদারির মা ততক্ষণে পায়ে-পায়ে রাস্তার ওপরেই এদিকে সরে এসে দাঁড়িয়েছে যেখান থেকে এই কলতলাটা সোজা দেখা যায়। মাদারির মা এদিকে তাকিয়ে ছিল না–সে তার বাঁ দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়ে ছিল। ঐ দিক থেকেই তারা এসেছে। ঐ রাস্তাটাই তার বেশি চেনা।
বাহাদুর দোকান ঘরের ভেতর ঢুকে যায়; পেছন-পেছন মাদারি। আর, মাদারির মা রাস্তা ধরে আবার খানিকটা আনমনা হেঁটে আড়ালে সরে যায়। মাদারি বাহাদুরকে জিজ্ঞাসা করে, হে-এ বাহাদুরদা, জলুশ কখন যাবে?
বাহাদুর একটা ছোট তোয়ালে দিয়ে হাত মুছতে-মুছতে বলে, যাবে, যাবে তর জলুশখান কি পাখা মেলি উড়ি যাবে? মানষিলা উঠিবে, চা-পানি খাবে, খোয়াদোয়া করিবে, স্নান করিবে, চুলখানা বান্ধিবে এ্যানং-এ্যানং করি, তারপর ত জলুশ ধরিবার তানে হাটত আসিবে। নাকি তোর নাখান ঘুম থিকা উঠি দৌড় ধরিবে, এ্যা? এই সব বলতে বলতে বেড়ায় গোজা একটা ছোট আয়নার সামনে বাহাদুর অনেকক্ষণ ধরে চুল আঁচড়ায়, চিরুনিটাতে বুড়ো আঙুল চালিয়ে একটা আওয়াজ তোলে, তারপর চিরুনিটা তার ছোট হাফপ্যান্টের পেছনের পকেটে খুঁজে দেয়।
হে-এ মাদারি, ঐঠে দেখ, চুল্লির উপর, গরম জল ফুটিবার ধরিছে, চা বানিবার ধর, তিন কাপ, তর মায়ের তানে একখান বলে দোকানের আর-এক জায়গায় গেঁজা একটা পোটলা নামিয়ে বাহাদুর একটা রঙচঙে কাপড় বের করে। সেটা ফাঁক করে গলায় ঢুকিয়ে দেয় এমন কায়দায় যে তার চুলে স্পর্শ লাগে না। তারপর হাত ঢোকায়। কোমর পর্যন্ত নামিয়ে নেয়ার পর বোঝা যায় এটা একটা খুব রঙচঙে ছবি আঁকা গোল গলার গেঞ্জি।
আবার সেই আয়নাটার সামনে এসে মাথাটা নিচু করে বাহাদুর নিজেকে একটু দেখে।
জল ত ফুটি গেইছে, হে-এ বাহাদুরদা–মাদারি নিবন্ত আঁচের যে-চুল্লিতে রাতভর জল ফুটছে তার পাশ থেকে জিজ্ঞাসা করে।
টেবিলের উপর দেখ, কেনে মখগান আছে, ঐঠে জল ঢাল আধাআধি, বলে বাহাদুর দোকানের আর-এক কোনায় গিয়ে ওপরের বাতায় গেঁজা একটা ফুলপ্যান্ট নামায়, তারপর সেখানে দাঁড়িয়েই ফুলপ্যান্টটা পরতে থাকে। প্রথমে টেনে তোলে কোমর পর্যন্ত, তারপর ফুলপ্যান্টটাকে শরীরের সঙ্গে মিলিয়ে নেবার জন্যে কোমরটা একবার ডাইনে বেঁকায়, একবার বয়ে বেঁকায়, একবার সামনে এগিয়ে আনে। চিরুনিটা হাফপ্যান্টের পকেট থেকে বের করে হাতে রাখে। তারপর সে কোমরে বোতামটা আটকে চেনটা টানতে পারে ও চিরুনিটা পেছনের পকেটে খুঁজতে পারে। সেই সময় মাদারি তার পায়ের আঙুলের ওপর ভর দিয়ে টেবিল থেকে মগটা আনে। সেই হাঁড়ি থেকে আধ মগ জল সে তুলতে পারে একটা এলুমিনিয়ামের গ্লাশের সাহায্যে। দুই গ্লাশ ঢালতেই তার মনে হল আধাআধি হয়ে গেছে। সেই মগটার সামনে থেকে ঘাড় ঘুরিয়ে দোকানের ভেতর দিকে তাকিয়ে সে বলে, হে-এ বাহাদুরদা, এ্যালায় কী করবু?
বাহাদুর তখন তার কোমরে একটা চকচকে চওড়া বেল্ট লাগাচ্ছিল। সেই বেল্টটা টাইট দিতে-দিতে সে বলে, খাড়া, আইচছু। তারপর বেল্টটা আটতে-আঁটতেই চুল্লির দিকে এগিয়ে আসে। তাকে দেখে মাদারি চিৎকার করে, হে এ বাহাদুর দাদা, তোমাক ত মিলিটারির নাখান দেখাছে।
বাহাদুর একটা কৌটো তুলে এনে একটু নিচু হয়ে মগটার মধ্যে তিন-চার চামচ চিনি ফেলে দেয়, তারপর একটা কড়াই থেকে একটা ছোট হাতভর্তি দুধ তুলে মাদারির পাশ দিয়ে মগটাতে ঢালে। হাতটা কড়াইয়ের ভেতর রেখে দিয়ে বাহাদুর একটা চায়ে ভেজা মরচে রঙের ন্যাকড়ার ভেতরে একটা কৌটো থেকে খানিকটা ডাস্ট চা ঢেলে পোটলা করে মাদারির হাতে দেয়–এটা নিয়া নাড়া কেনে। চায়ের রঙ যেইলা ধরিবে স্যালায় তুলি ফেলি চামচ নাড়াবি।
চামচা কোটত?
টেবিলের উপর, বলে বাহাদুর আবার দোকানের ভেতর দিকে চলে যায়। মাদারি চায়ের পোটলা হাতে আবার টেবিলের কাছে যায়, আঙুলে ভর দিয়ে এলুমিনিয়ামের একটা চামচ নিয়ে আসে। তার কাছে চামচটা খুবই জরুরি। মগে ঐ চামচের আওয়াজ তুলেই বাহাদুর তার কাছে এমন মাহাত্ম্য পেয়েছে। আজ জলুশের সুযোগে এই প্রথম সে চামচ নাড়ার অধিকার পেল।
চায়ের পোটলা সেই দুধ-চিনি ভেজানো গরম জলে মেশানো হল কি হল না, মাদারি চামচের আওয়াজ তোলা শুরু করে। বাহাদুর যে-রকম দ্রুত ও উচ্চ শব্দ তোলে, সেরকম। তাতে মগ নড়ে গিয়ে খানিকটা চা মাটিতে পড়ে যায়। তখন সে মগটাকে বা হাতে আরো জোরে চেপে ধরে।
.
২০৪.
বাহাদুরের সাজসজ্জা ও সমবেত চা পান
হে-এ বাহাদুরদা, গেলাসে ঢালিম? চা? তার চামচ নাড়ানোর তৃপ্তির পর মাদারি জিজ্ঞাসা করে।
খাড়া কেনে, না ঢালিস, মুই যাছ, বাহাদুর চিৎকার করে বলে।
মাদারি একটু চুপ করে থাকে, মগে তার তৈরি চায়ের দিকে তাকায়, সত্যিই বাহাদুরদার তৈরি চায়ের মতই রঙ হয়েছে। সে বাহাদুরের দিকে তাকায়, তারপর আবার চিৎকার করে, টেবিলের উপর রাখি দিম? মগখান?
