অয়
কুয়া (কুয়াশা) দিছে, ঘন কুয়া।
ত চলি আয় ভিতরত—
এই কুয়ার ভিতরত ট্রাক আসিবা পারিবে? মাদারি দুই হাত বুকের ওপর আড়াআড়ি রেখে বা হাতে ডান কাধ ধরে, ডান হাতে বা কাধ ধরে একটু কেঁপে নেয়। মাদারির মা মনে-মনে ততক্ষণে জলুশে যাবার জন্যেই তৈরি হয়ে গেছে। কিন্তু, সে এটা বুঝতে পারে তাদের আগে-আগেই রওনা হতে হলেও–এতগুলো মাইল হেঁটে ত তাদের হাটখোলায় পৌঁছতে হবে–এত আগে নিশ্চয়ই নয়। সেও জলুশে যাবে–এটাতে তারও মনে একটু ফুর্তি আসছে বটে, কোথাও যাওয়ার ফুর্তি। কিন্তু, সেই যাওয়ার প্রস্তুতির জন্যে সে এখনি ব্যস্ত হতে রাজি নয়। নিজেকে ব্যস্ত করে তোলার পক্ষে এখনো কিছু সময় তার হাতে আছে।
মাদারি, এইঠে শুই থাক্ কেনে, এ্যালায় দেরি আছে।
মুই চলি যাও, তুই আয় কেনে পাছত, পেছন ফিরে ঘরের প্রবেশপথের দিকে তাকিয়ে, আরো একবার কেঁপে উঠে মাদারি বলে।
তয় মুই না যাও, মাদারির মা বলে।
মাদারি তার মায়ের কাছে চলে এসে বলে, আচ্ছা, আচ্ছা, মুই এইঠে আসিছু, যাবি ত মাই?
মাদারির মা কোনো জবাব দেয় না।
মাই গে-এ
অয়
কখন যাবু?
খাড়া কেনে, এ্যালায় ত রাতি পোহায় নাই। তোর জলুশ কি আন্ধারত হবে?
না। রাতি পোহাইছে। কুঁয়া। চারিপুহে কুঁয়া।
কনেক আলো ধরুক। না-হয় ত ঐঠে হাট বসি থাকা নাগিবে।
কালি মুই শুনি আসিছু এইঠে ট্রাকগিলা আগত ছাড়ি দিবে, অনেক-অনেক দূর যারা নাগিবে ত! এইঠে দেরি বা ধরিলে আর পৌঁছিবে কখন?
কোটত যাবা নাগিবে? তুই চিনিস?
মুই ক্যানং করি চিনিম? স্যাই তিস্তা নদীর মুখত, বান্ধ বান্ধিবার তানে সব মন্ত্রী মানষিলা আসিবে। তা এইঠে তাড়াতাড়ি রওনা না ধরিলে পৌঁছিম ক্যানং করি।
পৌঁছিবে, পৌঁছিবে, ট্রাকগাড়ি কত জোরত যায় দেখিস না?
হয়। ট্রাকগাড়ি জোরত- যায়। দেখিছু।
মাদারি চুপ করে যায়। ট্রাক গাড়ির সঙ্গে মায়ের চাইতে তার সম্পর্কই ত বেশি। সে এখন চুপ করে সেই ট্রাকগাড়ির গতি কল্পনা করে। তার এই ঘর থেকে, তার ঘরের সামনের রাস্তা থেকে, হাটের সামনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সে ত এই ট্রাকগাড়ি কত জোরে ছোটে তা দেখে। পাশ দিয়ে চলে গেলে, গায়ে বাতাসের একটা ঝাপটা লাগে। অনেক সময় ঘাড় ঘুরিয়ে ঝাঁপট সামলাতে হয়। মাদারি তার মায়ের পাশে, রাশি রাশি শুকনো পাতার ওপর ফেলে দেয়া চটের ওপর, যেন ট্রাকের ঝাপটা সামলাতে ঘাড় ঘোরায়। ঘোরাতেই সে পাতার নরম শয্যায় ডুবে যায়। এইটি এ-ঘরের গোপন এক বিলাসিতা। শুকনো পাতা এনে গদি বানানো। পাতাগুলো যখন ভেঙে যায় তখন কিছুটা ফেলে দিয়ে আবার নতুন শুকনো পাতা ছড়িয়ে দেয়া হয়। তাহলে মাটি থেকে শীতের ঠাণ্ডা ওঠে না। বর্ষার জলও মাটি থেকে ভেজায় না।
পাশ ফিরে মাদারি বোধহয় তার ট্রাকের কথা ভাবতে-ভাবতেই একটু ঝিমিয়ে পড়ে। কিন্তু তার মার যেন আরো কিছু জানার ছিল। সে একবার ডাকে, আস্তে, হে মাদারি। কিন্তু মাদারি জবাব না দেয়ায় চুপ করে যায়। চুপ করে বাইরের আওয়াজ শোনে। জোর বৃষ্টি থেমে যাওয়ার পর জঙ্গলের ভেতর। থেকে টুপটাপ আওয়াজটা অনেকক্ষণ ধরে শোনা যায়। যে এই আওয়াজ জানে না, তার মনে হতে পারে বৃষ্টিরই আর-এক ছন্দ। সেই আওয়াজের নানা আয়তন আছে–কত ওপর থেকে কোন গাছ বা পাতার ওপর পড়ছে তার ওপর সেই আয়তন নির্ভর করে। মাদারির মা শোনে-জঙ্গলের ভেতর থেকে সেই টুপটাপ আওয়াজ উঠছে, ছড়িয়ে যাচ্ছে, এগিয়ে আসছে। হিম পড়ছে। সে আরো দুটো-একটা আওয়াজের অপেক্ষা করে রওনা হওয়ার জন্যে।
.
২০৩.
মাদারি প্রথম চা বানায়
কিন্তু এত করেও মাদারি আর মাদারির মা এতগুলো মাইল হেঁটে যখন হাটখোলায় পৌঁছয় তখন হাটখোলাতে একটা বড় ট্রাক শিশিরে ভিজে দাঁড়িয়ে আছে বটে, আর-কোনো জনমনিষি নেই। এতটা খালি দেখে মাদারি দূর থেকেই বলে ওঠে, হেই মাই গে, জলুশ চলি গেইসে।
মাদারির মা বলে, একখান মানষিও নাই আর তোর জলুশ চলি গেইল, ক্যানং তোর জলুশখান? ঐ ত ঐঠে একখানা ট্রাক কুঁয়াত ভিজি খাড়া হয়্যা আছে।
মাদারি তার মাকে ধমকে ওঠে, তুই চুপ কর, ঐখান ত এইঠেই থাকে, সিঙ্গিবাবুর ট্রাক, কাঠ নিগায়।
মাদারির মা বলে, চল, কনেক বসি; দেখিবু, মানষি আসিবার ধরিবে। তোক বারবার কহিছু এ্যালায়ও টাইম হয় নাই, টাইম হয় নাই।
এরকম কথা বলতে বলতে ওরা হাটখোলায় ঢোকে। ঢুকতেই দেখে ঘোমশাইয়ের দোকানের ঝাপটা আধখোলা। মাদারি দৌড়ে উল্টো দিকে গিয়ে দেখে বাহাদুর টিউবওয়েলের সামনে উবু হয়ে বসে আঙুল দিয়ে দাঁত ঘষছে।
হেই গে বাহাদুর দাদা, জলুশ কখন যাবা ধরিবে?
মুখের ভেতর থেকে আঙুল বের করে বাহাদুর মাদারিকে চোখের ইশারায় টিউবওয়েল টিপতে বলে। এই টিউবওয়েলের হ্যান্ডেলটা শক্ত, ওপরেই থাকে, একবার নামালে ধাক্কা মেরে উঠে আসতে চায়। বাহাদুরের ইঙ্গিত পাওয়া মাত্র মাদারি দৌড়ে এসে হ্যান্ডেলটা ধরে। হ্যান্ডেলটা একটু লম্বা ও একটু উঁচু। লোকের হাত যে-জায়গাটায় পড়ে, সেটুকু বাদে বাকিটুকুর রং কালচে-ব্যবহারের উজ্জ্বলতাসহ কালচে। লোকের হাত যতটা জায়গাকে ইস্পাতের মত রুপালি করে রেখেছে, মাদারির হাত, তার একটা খুব ছোট অংশেরই ওপর পড়ে।
মাদারি হ্যান্ডেলটাকে তার মাথার ওপর থেকে নামানোর জন্যে একটা হ্যাঁচকা টান দেয়। কিন্তু প্রথম টানে হ্যান্ডেলটা নামে না। তখন মাদারি আর-একটা টান দিতেই হ্যান্ডেলটা কিছুটা নেমে আসে আর মাদারি তার পেট দিয়ে হ্যান্ডেলটার ওপর ঝুলে পড়ে, তার বা পায়ের আঙুলগুলো মাটিতে ছোঁয়ানো থাকে, ডান পাটা শূন্যে উঠে যায়, তার প্যান্টটাও কোমর থেকে নেমে যায়, হ্যান্ডেলটা নেমে আসে আর টিউবওয়েলের বড় মুখ দিয়ে হড়হড় করে জল পড়ে। এই টিউবওয়েলটার এটাই মজা। হ্যান্ডেল একবার চালাতে পারলেই প্রায় এক বালতি জল হয়ে যায়। বাহাদুর জলের কাছে এগিয়ে যায়, তারপর দু-আঁজলা মিলিয়ে জল নিয়ে সারা মুখে ছড়ায়, মুখের ভেতরে টানে, জোরে-জোরে কুলকুচি করে, হ্যাঁক থুঃ বলে জোরে-জোরে গলা ঝাড়ে আর মাদারির হাতের হ্যান্ডেলটা খটাস করে ওপরে উঠে যায়।
