কিন্তু সে এটা বোঝেনি, দোকানের সঙ্গে তার ব্যবস্থাও নতুন মালিকের হাতে গেল কি না। বুঝতে অবিশ্যি বেশিক্ষণ লাগেনি। নতুন মালিকের নোক এসে সে রাত্রিতেই দোকানে তালা লাগিয়ে তাকে বলে গেল, আজ রাত্রিটা থাকো, কাল সকালে জিনিশপত্র বাচ্চা নিয়ে চলে যেও।
অতদিন বাড়ির খেয়ে, বাড়িতে থেকে, তার চেহারা ভাল হয়ে গিয়েছিল। নতুন মালিকের যে-লোকজন তাকে আগের রাত্রিতে বলে গিয়েছিল সকালে চলে যেতে, তাদেরই একজন, সহরাই উরাও, পরদিন কাক না-ডাকতে তাকে এসে বলে চল, আমার সঙ্গে বাচ্চা নিয়ে থাকবি।
লোকটার ঘর গিয়ে ওঠার দুদিন পর সে বুঝতে পারে লোকটি স-মিলে কাজ করে, স-মিলের মালিকই দোকানটার নতুন মালিক হয়েছে। লোকটি আগে কাজ করত চা বাগানে। সেখান থেকে ঘাটাই হয়ে স-মিলে এসেছে। লোকটার ঘর ছিল শাল বাকলা দিয়ে তৈরি। শীতকালে হাওয়া দিত। আর-একটা বাচ্চা হওয়ার পর লোকটা কাঠের ছোট-ছোট টুকরো দিয়ে ফাঁকগুলো বন্ধ করে দিয়েছিল।
সহরাই আগে চলে গেল, নাকি, তার প্রথম ছেলেটি–সে আর তার মনে পড়ে না।
সেই ঘরটাতে কিন্তু সে অনেক দিন থেকে গিয়েছিল। স-মিলের মালিক তাকে উঠে যেতে বলেনি। অনেক বৃষ্টিতে, রোদে, শীতে সেই কাঠগুলো পচে যেতে লাগল; যে-পাতলা কাঠগুলো ঘরের চাল হিশেবে ছিল তার কিছু পচে খসে গেল, কিছু উড়ে গেল; ঘরের পাটাতন নিজে থেকেই একে-একে খুলে গেল। এই সব হতে-হতে ত কয়েক বছরই যায়। এই ঘরটায় শেষ পর্যন্ত যতদিন সে থাকতে পেরেছে তাতে এক রাজবংশী বুড়ো জোতদার সপ্তাহে একদিন সন্ধ্যাবেলায় আসত, এক চা বাগানের বাঙালিবাবুও কয়েক দিন এসেছিল, এক মিলিটারি এসেছিল এক দিন, আর তার বাচ্চারা তখন নিয়মিতই হয়ে যাচ্ছে আর চলে যাচ্ছে। ততদিনে সে-ঘর কবে যে ভেঙে গেছে।
.
২০২.
মাদারির মা-র ও মাদারির ঘুম ভাঙে
মাদারির মার ঘরে মাদারির আর তার মার ঘুম ভাঙে সাত-সকালে মুরগির ডাকে আর ময়ূরের ডাকে। ঠিক শ্যাওড়া গাছটা বরাবর ঝোরার ওপর দিকে একটা শুকনো খটখটে গাছে ময়ূরটা রাত কাটায় আর সকালবেলা ওদের ঘুম ভাঙিয়ে চলে যায়। গরমের সময় কোনো-কোনো সন্ধ্যায় দেখা যায় ময়ূরটা সন্ধ্যা হওয়ার একটু আগে ঐ মরা গাছটাতে এসে বসে আছে। মরা গাছটারও অনেক দিন আগেই মরার কথা, কিন্তু, ময়ুরটার জন্যেই যেন মরে না, বছরের পর বছর বেঁচেই থাকে।
আর বনমোরগবনমুরগি ত প্রায় তাদের ঘরের মধ্যেই এসে ডাক দিয়ে যায়।
শীতকালে কষ্ট হয়। ঐ পাতার ঘরের ভেতর কাঠকুটো দিয়ে আগুন জ্বালানো যদি সম্ভব হয়, সম্ভব কবতেই হয়, তা হলেও সেল-আগুন শেষ রাতে নিবে আসে। সূর্যের আলো এই ফরেস্টের মধ্যে সোজাসুজি কোথাও ত ছড়িয়ে পড়ে না। কিন্তু কোনো একটা ফাঁকফোকর দিয়ে রাস্তার উল্টোদিকের ঢালটাতে রোদ আসে। সে-রোদ না-আসা পর্যন্ত তারা ঐ পাতার ঘর ছেড়েও বেরতে পারে না, পাথরের মত যেখানে পড়ে থাকার সেখানেই পড়ে থাকে।
এখন বর্ষা শেষ হয়ে গেছে প্রায়, শীত আসেনি। আকাশ শাদা হয়েই আসছে কিন্তু আচমকা বৃষ্টিপাত ঘটে যাচ্ছে যখন-তখন। দুপুরবেলায় ফরেস্টের ভেতর থেকে পচা জলের বাতাসে দম বন্ধ হয়ে আসে। এই সময় শরীর খুব গরম হয়ে যায়। আর, সকালে, সমস্ত গাছপালা যেন বৃষ্টিভেজা হয়ে থাকে, হিমে। সেই হিমেল সকালে মাদারি জেগে ওঠে, হে মা, চল্ যাবি কেনে, জলুশে।
মাদারি এখনো জানে, মা গেলেই তার যাওয়া হবে। মাদারির মা একবার ভাবে, বলে দেয়, তুই যা কেনে, মুই না যাও। কিন্তু, তা হলে ত মাদারি তার মায়ের কাছ থেকেই প্রথম জেনে যাবে যে এখন মা। ছাড়া জলুশে, এত বড় জলুশে যেতে পারে। যতদিন মাদারি সেটা নিজের থেকে না বোঝে ততদিন মাদারির মা তাকে বোঝাতে চায় না, এখন। এইবার বোধহয় তার হিশেবের গোলমাল হল। আর একটা ছেলে পেটে না-আসতেই, এই ছেলেটা চলে যাবার মত লম্বা হয়ে গেল। কিন্তু পেট ত তার আছে, সে এখন এই শ্যাওড়াঝোরায় ছেলে পেটে আনার জন্যে ছেলের বাপ পায় কোথায়? গাছ থেকে, বনমোরগ থেকে, ময়ূর থেকে ত আর মানুষের পেটে বাচ্চা হয় না। কিন্তু, এমন ত হতেও পারে যে তার আর বাচ্চার দরকার হল না। মাদারিকে বাহাদুর চা বানানো শিখিয়ে দিলে ঘোমশাইয়ের দোকানে সে একটা চাকরি পেয়ে গেল–চা বানানোর চাকরি। বা, ট্রাক মোছামুছিটা তার আরো খানিকটা বাড়ল, এই হাটেই।
এতগুলো কথা এতটা পরপর সাজিয়ে যে সে ভেবে উঠতে পারে তা নয়, কিন্তু, এমন ভাবনা তার মাথা বা মনের চারপাশে জমা হয়েই থাকে।
তাই মাদারি ডাক দিতেই সে সাড়া দেয়, যাবু নাকি তুই, সত্যিই?
মাদারি শুয়ে-শুয়েই তার মাকে ডেকেছিল! মার এই জিজ্ঞাসাতে ধড়ফড় করে উঠে বসে, কহিছিস কী মাই গে? কালি হাটত কতবার মারামারি আর কতখান ঢোলাই। তিনচারি ট্রাক যাবার ধরিবে। এ্যালায় নাকি সগায় যাবার ধরিবে, মারামারি হবে।
মাদারির মাও উঠে বসে, একটু হেসে বলে, তুই কি মারামারি করবু না মার খাবু? কায় মারে? মোক? ঘোষমশাইঅক ছাড়ি দাও, কায়ও মারিবার পারিবেন না, চল চল, ট্রাক চলি যাবে। মাদারি ঘরের ভেতর দাঁড়ায় আর মাদারির মা সেই আবছায়ায় দেখে স্বস্তি পায় মাদারি দাঁড়ালে এখনো এই ঘরে এটে যায়। মাদারির মা শুয়ে থাকে আর মাদারি বাইরে গিয়ে পেচ্ছাপ করে। করতে করতেই চিৎকার করে–মা গে।
