মাই গে।
হয়
…
হে-এ মাদারি
হয়।
…
মাই গে
হয়,
মুই ভুলি গেইছু রে–
কী ভুলিছিস?
লড্ডু আর নিমকি–
কায় দিছে তোক?
ঘোষমশাই কইছিল দোকান বন্ধ করিবার আগত একখান লাড়ু আর একখান নিমকি নিবার তানে। কইছিল। মুই নিবার ভুলি গেইছু।
কেনে? ভুলি গেইছিস কেনে?
তোর এই আগুনটার তানে—
আগুনটার তানে লাড্ড খোয়র কথা ভুলি গেছিস? লাড্ডু ত মিঠা লাগে।
হয়। খুব মিঠা। তক খোয়াম মুই সামনের হাটবার।
সব হাটবারত তক লাড়ু দেয়, খোয়ার তানে?
না দেয়, শুধু একখান হাটত দেয়। তোক খোয়ব সামনের হাটবার।
মাদারির মা তার জিভের স্বাদের স্মৃতিতে মিষ্টি কাকে বলে তার এক সন্ধান চালায়।
মাই গে
হয়।
বাহাদুরদাখান কইছে মোক চা বানিবার শিখাবে।
কী হবে তার বাদে?
মোক চাকরি দিবে, চায়ের দোকানত—
ত শিখায় না কেনে?
টেবিলখান এ্যালায়ও মোর মাথার উপরত।
মাদারির মা সেই অন্ধকারে ছেলের দৈর্ঘ্যের মাপ যেন প্রথম পায়। টেবিলের উচ্চতা পর্যন্ত গেলে মাদারি এখানে থাকবে না। মাদারির দাদারা, মাদারির মায়ের আরো আট-না দশ সন্তান কেউ থাকেনি। থাকে না। তা হলে মাদারির মা জলুশে যাবে কেন?
৬.২ মাদারির মা কতবার মা
মাদারির মা এখন মাদারির মা, বড় জোর আট-দশ বছর, তার আগে সে আরো অনেকবার আরো অনেকের মা হয়েছে। কতবার কত মাদারির মা, তা এখন হিশেব কষে বের করতে পারবে না। এখানে, এই শ্যাওড়াঝোরায় মাদারির মা কত বছর আছে সে হিশেবও তার জানা নেই। কিন্তু মাদারির জন্মের আগে থেকে মাদারির মাকে চেনে এমন লোকজন মাদারিহাটে এখনো অনেকেই আছে। চেনে, মানে, মুখটা চেনা–এই পর্যন্তই। তাই চাইতে গভীর ভাবে আর মাদারির মাকে কেউবা চিনবে। যাদের তার মুখটা মনে আছে, তারাও এই হিশেব দিতে পারবে না, কতদিন থেকে চেনা। মাদারির মার মুখ এমন নয় যার সঙ্গে চেনা-পরিচয়ের ইতিহাস মনে থেকে যায়, দরকার হলে মনে পড়াবার জন্যে মনে থেকে যায়। দেখলে চেনা লাগে-বড় জোর এই পর্যন্ত। তারাও এখন মনে করতে পারবে না, মাদারির মা, মাদারি হওয়ার আগে আর কার কার মা ছিল। অথবা, তাদের পক্ষে মনে করা সম্ভবই নয়। কারণ, তারা জানবে কী করে যে মাদারির মার সঙ্গে যে-মাদারি এখন ঘোরাফেরা করে, বা, একা-একা হাটে আসে, সে, সেই ছেলেটিই নয়, যে, মাদারির জন্মের আগে তার মার সঙ্গে চলাফেরা করত? তা হলে ত শুধু। মাদারির মাকে চিনলেই হয় না, তার ছেলেপুলে ইত্যাদিও সবাইকেই জানতে হয়। তেমন জানা কি সম্ভব?
কিন্তু মাদারির মার ত সব সময়ই একটা না একটা ছেলে দরকার। একটা প্রমাণ সাইজের পুরুষমানুষ তার সব সময় দরকার কী না সেটা কখনোই তার মনে আসেনি। কিন্তু একটা ছেলে তার নেহাতই প্রয়োজন। আর, মায়ের ওপরই সম্পূর্ণ নির্ভরশীল এমন ছেলে ছাড়া কে তার সঙ্গে থাকবে?
মাদারির মায়ের একটা মাপ আছে। সে জানে ঐ মোটামুটি যখন চায়ের দোকানের টেবিলের সমান মাথা হয়, বা নিজে থেকেই ট্রাকের চাকার ওপর ভর দিয়ে ট্রাকের পেছনে উঠতে পারে, বা, যা পয়সা পায় তার সবটা মাকে আর দেয় না তার কিছুদিনের মধ্যেই সে-ছেলে এই শ্যাওড়াঝোরা ছেড়ে চলে যায়। কোথায় যায় তা খুব ঠিক করে মাদারির মা জানে না। কিন্তু আন্দাজে জানে যে তারা মাদারিহাট থেকে বীরপাড়া বা হাসিমারায় যায়। সেখানে বাসট্রাকের ডিপো বা অন্য কোনো কাজ একটু-আধটু শিখতেও পারে। মিলিটারির বিরাট ছাউনি আছে এ-সব জায়গায়। সেখানে চোরাই মালের আড়তে এমন অনেক ছেলেরই নাকি কোনোনা-কোনো কাজ জুটে যায়। সেখান থেকে সেই ছেলেরা একই পদ্ধতিতে শিলিগুড়ি পৌঁছয়। সেখানে আরো বড় চোরাই চালানের আড়ত হয়ত আছে। আরো বড় বড় ট্রাকে আরো বেশি-বেশি মাল হয়ত আসে। তা ছাড়াও আছে রেলের ইয়ার্ড, ওয়াগন–এই সব। সেখানে ছেলেগুলো হয়ত ছড়িয়ে-ছিটিয়ে যায়। কেউ-কেউ নাকি, এমন-কি, নেপালে চলে যায়, সেখান থেকে অনেক নতুন মাল এনে অনেক-অনেক টাকায় বেচে। সে-সব মাল ভদ্রলোকরাও কেনে। তার কিছু কিছু জিনিশ, এই যেমন গায়ে দেয়ার জামা, ছাতা এই সব, মাদারিহাটেও ওঠে।
মাদারির আগে তার কটা ছেলে এরকম মাথায় একটু টান দিতেই, বা, ট্রাকে একা-একা চড়তে পেরেই চলে গেছে, তা তার মনে নেই। তবে, তেমন চলে যাওয়ার আগে ছেলেগুলো রোজ ফেরা ছেড়ে দেয়। প্রথমে ছাড়ে খাবার খুঁজে বেড়ানো। তারপর, হাটখোলাতেই সারা দিন-রাত থাকতে শুরু করে দেয়। অনেক দিন না ফিরলে মাদারির মা বুঝে নেয়, চলে গেছে।
কিন্তু তার ত ছেলে ছাড়া চলবে না। তাই এক ছেলে লম্বা হওয়া শুরু করতেই সে আর-এক ছেলে আনে, যাতে, আগের ছেলে খাবার খুঁজে বেড়ানো বা ঝোরায় আচমকা দাঁড়ানো ট্রাকের কাছে হাত পেতে দাঁড়ানো বন্ধ করার সঙ্গে-গেই পরের ছেলে একটা বয়সে পৌঁছে যেতে পারে।
এত হিশেব-নিকেশ করে ছেলে পেটে ধরতে হেলে ছেলের একটা বাপ ত মাদারির মার হাতের কাছে সব সময় বহাল থাকা দরকার।
প্রথম দিকে তার কোনো অসুবিধে হয়নি। আর, তখন সে ত এই শ্যাওড়াঝোরা পর্যন্ত পৌঁছয়ও নি। প্রথম ছেলেটার কথা তার সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন মনে আছে, কারণ, তখনো তার জানা হয়ন যে ছেলেও চলে যায়, ছেলের বাপও চলে যায়। এক নেপালি আধবুড়োর একটা মুদিখানা দোকান ছিল হাটের ঠিক উল্টো দিকে। তার কোনো বউবাচ্চা ছিল না। সেই দোকানের লম্বা বারান্দায় তখন মাদারির মা পৌঁছে গেছে। নিজে থেকেই বারান্দা-টারান্দা ঝাড় দিত। দোকানি তাকে দোকানের ভেতরটাও একদিন ঝাড় দিতে বলল। আরো একদিন একটা সাবান দিয়ে বলল, ভেতরের কুয়োপাড়ে গিয়ে ভাল করে স্নান করতে। তার পরেও তাকে সাবান মাখতে হয়েছে বটে, কিন্তু, সেসব সেই দিনের সাবান মাখাটার মত রোমাঞ্চকর ঠেকেনি। স্নানের পর সে শাড়িজামাও পেয়েছিল। সেই রাত থেকেই দোকানি তাকে নিয়ে প্রথম রাতে বিছানায় শুত। পরে, তাকে দোকানির বিছানা ছেড়ে নিজের বিছানায় চলে আসতে হত। অত ছোট বিছানায় দোকানির ঘুম আসত না–আর-এক জনের সঙ্গে শুলে। কিন্তু তার প্রথম বাচ্চা হওয়ার পর দোকানি নিজেই একটা বড় চৌকি এনে জোড়া লাগিয়ে নেয়। বাচ্চা নিয়ে দোকানির সঙ্গে তখন সে অনেকগুলি দিন ও কিছু বছর কাটল। দোকানিটাও ছেলেটাকে এত ভালবাসত যে দোকানে গদির ওপর বসিয়ে রাখত। মাদারির মার সময়ের বোধের সঙ্গে ত আর দিন-মাস-বছরের হিশেব মেলে না। কত দিন পর কে জানে দোকানি দোকানটোকান বেচে, একটা বাক্স নিয়ে বলল, চললাম রে। ছেলেটাকে একটু আদর করে গিয়ে বাসে উঠল। আর-সব লোকজন গিয়ে তাকে হেসে-হেসে বিদায় জানাল। মাদারির মা বুঝেছিলবাস পর্যন্ত তার যাওয়া চলে না।
