ট্রাকমোছা আর ঘোমশাইয়ের দোকানে কাপডিশধধায়া বাবদ মাদারি ত আজকাল ভাজ করা টাকাও আনে, মাঝে-মাঝেই, প্রায় এক হাট বাদে বাদে ত বটেই। মাদারির মা তাই কোনো-কোনো হাটে চাল কিনতে পারে–চা বাগানের যে-মজুররা রেশনের চাল এনে হাটে বেচে দিয়ে হাড়িয়া খেয়ে গান। গাইতে-গাইতে বাগানে ফিরে যায়, তাদের কাছ থেকে।
কিন্তু চাল কেনা যত সহজ, আগুন কেনা তত সহজ নয়। একটা আস্ত দেশলাই কেনা আর একটা আস্ত আগ্নেয়গিরি কেনা ত মাদারির মার কাছে একই কথা। চাল সে পেতে পারে, কিন্তু আগুন সে পাবে কোথায়?
মাদারির মাকে তার জন্যে কত কৌশল করতে হয়।
হাটে কোনো একটা জায়গায় সে চুপচাপ ঠেস দিয়ে থাকে। সাধারণত, একটা বড় গাছের তলায় ছোটখাট দু-তিনটে দোকান বসে। তৎসত্ত্বেও সেখানে, সেই গাছের গুঁড়িতে, মাদারির মায়ের ঠেস দেবার মত জায়গা বাকি থাকে। মাদারির মা সেখানে ঠেস দিয়ে বসে। বসেই থাকে। ঠিক বসা নয়, আধশোয়া হয়ে থাকে। ফরেস্টের ভেতর রোজ সারাদিন যে মুরগির মত সাবধানী, গুইসাপের মত নিভৃতচারী, গোখরোর মত কালান্তক, সে কিনা এখানে, এই হাটে তিনকাল-পেরনো এক বুড়ির মত শিথিল শরীর এলিয়ে দেয়।
মানুষের সঙ্গে মানুষের আত্মীয়তা তৈরি হয় বা ঘুচে যায় রহস্যময় সব কারণে। মানুষের সমাজ থেকে সরতে সরতে যে এখন ফরেস্টের ভেতর সেঁদিয়ে গেছে, সে এতক্ষণ একই গাছের গুঁড়িতে ঠেস দিয়ে আছে এই সুবাদে দোকানির আত্মীয় হয়ে যায় আর দোকানি, তার দিকে না-তাকিয়েই, একটা বিড়ি বাড়িয়ে দেয়–হাতটা পেছনে ছড়িয়ে। দেশলাইয়ের কাঠি জ্বালিয়ে নিজেরটা ধরিয়ে একটু কোমর বেঁকিয়ে মাদারির মারটাও ধরিয়ে দেয়। কাঠি নিবে গেলে, নিজের জ্বালানো বিড়িটাই এগিয়ে দেয়। এরকম বার-দুই বিড়ি খেয়ে মাদারির মা তার কাছ থেকে দেশলাইয়ের বাক্সের গায়ে বারুদের ভাঙা একটা টুকরো আর দুটো কাঠি চেয়ে নিতে পারে। এরকম চাওয়ার ফলে পঁচ-সাতটা কাঠিসমেত একটা আস্ত বাক্সই কেউ-কেউ দিলে তখন দুশ্চিন্তা আসে এই কাঠিগুলো সতেজ থাকতে-থাকতে ব্যবহার করার সুযোগ পাবে ত? কেউ তার প্রথম বিড়িটা লাইটারে জ্বালিয়ে দিলে মাদারির মা তার ঠেস দেয়ার গাছ বদলায়। আর, নেহাত যদি দেশলাই না পায় সেদিন মাদারি ঘোমশাইয়ের দোকান থেকে বেশ খানিকটা আগুন নিয়ে যায়।
.
২০০.
মাদারি কী করে আগুন নিয়ে যায়
এই আগুন নিয়ে যাওয়ার বিশেষ একটা পদ্ধতি আছে মাদারির।
কলাপাতা বা কচুপাতায় সে ছোট-ছোট কয়লার কুচি প্রথমে ছড়িয়ে দেয়। তারপর কয়লার কুচি দিয়ে গতি মত বানায়। তার ওপর গনগনে দুটো কয়লা বসিয়ে, আবার গুড় কয়লায় ঢেকে কুচো কয়লা ছড়িয়ে দেয়। দুই হাতে সেই কলাপাতার কয়েকটি টুকরো বা কচুপাতার ওপরে আগুন নিয়ে তারা মা-ছেলে হাটখোলা থেকে শ্যাওড়াঝোরার দিকে রওনা হয়।
এটা তাকে করতে হয় ঘোমশাই দোকান ছেড়ে চলে যাবার পরে অর্থাৎ হাট ভেঙে গেলেই শুধু নয়, হাট খালি হয়ে গেল। বাহাদুর উনুনের আঁচ ফেলে দেয়। তারপর, বাহাদুরই একটু সাহায্য করে গনগনে কয়লাটা বাছতে।
কিন্তু আগুনটা এমন দুই হাতের পাজায় এতগুলো মাইল নিয়ে যাওয়া বেশ কষ্টকর। হাত ধরে আসে–সেটা বড় কথা নয়। আসলে বিপদ আগুনটাকে বাঁচিয়ে রাখা। বৃষ্টিবাদল হলে ত গেল। তবু কচুপাতার ঢাকনার নীচে আগুনটাকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা চলে। যদি একটু বাতাস থাকে, বা এমনকি পাশ দিয়ে একটা ট্রাক চলে যাওয়ার ফলেও যদি বাতাস লাগে, কয়লার কুচি উড়ে যায়, গায়ে পড়ে, চোখে লাগে, আগুন বেরিয়ে পড়ে। তাই তখন মাদারিকে বাতাসের দিকে পিঠ ফেরাতে হয়, বা, সামনের ট্রাকের দিকে। ট্রাক চলে গেলে আবার সোজা হওয়া যায় কিন্তু বাতাসের দিকে পিঠ ফেরালে ত সেই সারা রাস্তাটাই আগুন বাঁচাবার জন্যে পেছন ফিরে হাঁটতে হয়। তাতে সময় অনেক বেশি লাগে। এক ঘুম পাওয়া ছাড়া তাতে আর মাদারির আপত্তি কী? তার কাছে ঘরে গিয়ে আগুনটাকে বাঁচানোর কাজ যেমন কঠিন, রাস্তাতে আগুনটাকে বাঁচিয়ে রাখার কাজও ততটাই কঠিন। এরকম করে বয়ে নিয়ে যাওয়া আগুনের পরিণতি নানারকম হতে পারে–নিভে ছাই হয়ে যাওয়া ছাড়াও। বাতাসের কী ট্রাকের আসা-যাওয়ায় ওপরের কয়লায় তাড়াতাড়ি আগুন লেগে যেতে পারে। তাড়াতাড়ি আগুন লাগা মানেই তাড়াতাড়ি ছাই হওয়া। আর আগুন যদি একবার ভেতর থেকে এরকম ওপরে উঠে আসে, তা হলে জ্বলন্ত কুচি কয়লা আর গুড়ো কয়লা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ওড়া শুরু করে, তখন ফেলে দেয়া ছাড়া কোনো উপায় থাকে না। আর-এক বিপদ হতে পারে, ঠিক এর বিপরীত পদ্ধতিতে। আগুন তাড়াতাড়ি নীচের দিকে নেমে গেল আর নীচের গুঁড়ো কয়লা আর কুচি কয়লায় লেগে আগুন ত পাতার ওপরে চলে আসে। তখন অবিশ্যি মাদারি তার মাকে বলে, রাস্তার ধার থেকে কিছু পাতা ছিঁড়ে আনতে। নীচে পাতার পলেস্তারা আরো বাড়িয়ে দিলে হাতে আগুনের আঁচ লাগে না।
যে-ন্যাশন্যাল হাইওয়ের ওপর দিয়ে এই দেশ ভারতবর্ষের কোনো এক রাজ্য থেকে আর-এক রাজ্যে মাল নিয়ে দিনরাত ট্রাক চলে–কত নতুন-নতুন সঁকো পেরিয়ে, কত নতুন-নতুন রাস্তা দিয়ে পথ ছোট করে করে, কত নতুন-নতুন পদ্ধতিতে গতি বাড়িয়ে বাড়িয়ে–সেই ন্যাশনাল হাইওয়ের স্বাদেশিক বিস্তারের অতি ক্ষুদ্র বা আণবিক এক ভগ্নাংশে পূর্ব গোলার্ধের এই রাত্রির কয়েকটি মাত্র ঘণ্টা জুড়ে এক মা তার সন্তানের সঙ্গে আগুন দিয়ে পথ হাঁটে, বা এক অগ্নিবহ বালক মায়ের সঙ্গে তার অরণ্যনিবাসে ফিরে চলে। কাল ন্যাশন্যাল হাইওয়ে কালই থাকে কিন্তু চারপাশের অন্ধকারে সেই রাস্তাটা আর দেখা যায় না, কেবল পায়ের তলায় অনুভব করা যায়-জলের ভেতর দিয়ে হাঁটলে যেমন জলের ভেতরের মাটিটুকু শুধু পা দিয়ে অনুভব করতে হয়। মাটিতে এমন অন্ধকার থাকলে সাধারণত আকাশের নক্ষত্রের দীপ্তি বেড়ে যায়, এতই বেড়ে যায় যে মনে হয়, নক্ষত্রের আলো পৃথিবীর মাটি পর্যন্ত পৌঁছতে পারে। এক্ষেত্রে, সে সুবিধাটাও থাকে না। কারণ ভারতবর্ষের গভীরতম এক অরণ্য দিয়ে ভারতবর্ষের জাতীয়– এই পথ গেছে। ঠিক সেই পথটুকুতেই এই রাত্রিতে মা ও ছেলে হাঁটছে। দুপাশের আকাশ-ঢাকা গাছ থেকে অন্ধকার পড়ছে। সেই গাছের পাতার ঘন বুনটের ভেতর দিয়ে আকাশটাকে কোথাও কোথাও আলোয়-আলোয় বুটিদার দেখায় বটে কিন্তু সে যেন নদীর অন্য পারের মত, যার বাস্তবতার সঙ্গে এই বাস্তবতার কোনো সম্পর্ক নেই, একেবারে কোনো সম্পর্কই নেই। বরং এই সময় আকাশের দিকে দু-একবার চোখ তুলে তাকানো বিপজ্জনক। পরে, চোখ নামালে এই অন্ধকারে আর-কিছুই দেখা যায় না। রাস্তার দুপাশ থেকে, ফরেস্টের গাছ-গাছালির ভেতর থেকে যে-অন্ধকার আড়াআড়ি উঠে আসছে সেটা বরং এদের কাছে কিছুটা পরিচিত। এই নিশ্চিদ্র কালর মধ্যে এই মাদারির হাতে শুধু কমলা রঙের একটা চাপা আগুন। এই আগুনটা যদি শ্যাওড়াঝোরা পর্যন্ত পৌঁছয় তা হলে মাদারির মায়ের আনা • শুকনো খড়িকাঠ লেলিহান জ্বলে উঠবে আর ঘরের সেই একটি মাত্র পাত্রটি নিয়ে মাদারি ঝোরা থেকে জল নিয়ে আসবে। সেই আগুনে, ধোয়ায়, চাল সেদ্ধ হওয়ার এক আদিম মানবিক গন্ধ ঐ আরণ্যক রাত্রিকে হঠাৎ কোমল করে তুলবে, অন্ধকার তত আর অন্ধকার থাকবে না। সেই আগুনের শিখার পাশে ছেলের সঙ্গে মায়ের আর-এক সংলাপ শুরু হতে পারে। কিন্তু সেই আর-এক সংলাপের কাছে পৌঁছনোর জন্যে এই রাস্তার কয়েক মাইল তাদের দুজনের সহযাত্রিক নীরবতা এই রকম নানা কথা দিয়ে দিয়েই খচিত হতে থাকে, নইলে, তাদের নীরবতাও ত প্রাকৃতিক হয়ে যেত।
