সরকার ও সরকারি দলগুলি এই অভিযানে বিচ্ছিন্নতাবাদীরা যেন কোনো বিক্ষোভ প্রদর্শনের মত সাহসও না পায়।
.
১৯৯.
মাদারির মা জলুশে যায় কেন
কিন্তু যার জলুশ যেখানেই যাক, মাদারির মা জলুশে যায় কেন? মাদারি হাট থেকে জুলুশের খবর নিয়ে এসেছে বলেই ত আর মাদারির মা জলুশে যেতে পারে না? যে-জুলুশে লোক দরকার, লোক বাড়ানোর দরকার, সে-জলুশের মাতব্বরদেরও ত মাদারির মাকে মনে পড়বে না। এই এত-এত বাড়ি-টাড়ির মধ্যে মাথা গোজার একটা ঠাই জোগাড় করার ক্ষমতা যার নেই, এই এত ঘন এত বড় ফরেস্টের মধ্যে কোন এক জায়গায় কোনো ঝোরার পাশে যাকে একটা শ্যাওড়াঝোরা বানাতে হয়, তার কোনো জলুশ থাকে না। এক দিন জলুশে যাবার অর্থ ত তার কাছে একটি দিন না-খেয়ে থাকা। একটি দিন না-খেতে পাওয়া বা না-খেয়ে থাকা মাদারির মায়ের কাছে কোনো অদ্ভুত ব্যাপার নয়। এমনও নয় যে সে তার একটা পুরো দিন নষ্ট হওয়াটা মাপতে পারে হাজিরা কত নষ্ট হল তার হিশেব দিয়ে। পেটের খিদে বা শ্রমের পয়সা–এর কোনোটাই মাদারির মায়ের দিনযাপনের মাপ নয়। তাহলে তার দিন নষ্ট হল কি হল না সেটা মাপা যায় কী করে?
এই ফরেস্টে, এই শ্যাওরাঝোরায় তাকে প্রতিদিন, প্রতিটি দিন, নিজের খাবার জোগাড়ে বেরতে হয়–যেভাবে ফরেস্টের মুরগি বেরয়, পাখি বেরয়, বড় বড় জীবজন্তু–যেমন হাতি, গণ্ডার–এরাও, বরয়। আর, তার নিজের খাবারের পরিমাণটা ত ঠিক করা নেই যে সেইটুকু সংগ্রহ হয়ে গেলেই তার কাজ ফুরিয়ে যাবে। সারা দিন ফরেস্টের ভেতরে-ভেতরে তাকে ঘুরে বেড়াতে হয়–ঘুরে বেড়াতে হয় মাটিতে চোখ রেখেই। ফরেস্টের ভেতরে ত আর মাটি দেখা যায় না, শুধু বুনো লতা-পাতা আর ঘাস। কখনো সে-লতা-পাতা আর ঘাসে মানুষ ডুবে যেতে পারে, ঠেলে এগনো যায় না। কখনো আবার, ছোট-ছোট খোলা রাস্তা পাওয়া যায়। এসব ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের বানানো রাস্তা–জীবজন্তুদের যাতায়াতের সুবিধের জন্যে,, ভেতরের গাছ কেটে জমা রাখার সুবিধের জন্যে। এরকম বেশ মাঠের মত চওড়া বড় রাস্তাও ফরেস্টের ভেতরে-ভেতরে আছে। সেই সব রাস্তা দিয়ে ট্রাক ঢোকে, হাতির পালদেরও অভ্যেস হয়ে যায় এরকম রাস্তা দিয়ে হাঁটা। মাঝে-মাঝে আবার মাটির ছোট-ছোট ঢিবলি লবণ দিয়ে মুড়ে দেয়া হয়। জীবজন্তুরা এসে সেগুলো চাটে।
মাদারির মায়ের তাই দুটো জিনিসের কখনো অভাব হয় না–উনুন জ্বালাবার জন্যে শুকনো, পাতলা, ছোটখড়িকাঠের, আর লবণের। কিন্তু সেই শুকনো খড়িকাঠে আগুন দেবার জন্যে তার কাছে কোনো দেশলাই থাকে না, সেই আগুনের ওপর দেবার জন্যে একটা ভাঙা পাত্র তার কাছে আছে বটে কিন্তু সেই পাত্রের ভেতর দেয়ার কিছু থাকে না। এত নুন পেতে পারে মাদারির মা, কিন্তু নুন নিয়ে মাখবে এমন কিছু সে রোজ পায় কোথা থেকে?
সকাল থেকে ফরেস্টের ভেতর মাটির দিকে তাকিয়ে ঘুরে বেড়ানোরও ত একটা মানচিত্র আছে। বেশি বনবাদাড়ের মধ্যে ঢুকলে খোঁজা যায় না, জঙ্গল চারদিক থেকে এমন চেপে ধরে যে জলের মধ্যে শাস নেয়ার জন্যে যেমন নাক উঁচু করে রাখতে হয় তেমনি নাক উঁচু করে চলতে হয়। তা হলে আর মাটির দিকে তাকাবে কী করে? ঐ সব বনবাদাড়ের ভেতরই কিছু চট করে পেয়ে যাওয়ার আশা থাকেবনমুরগির ডিম, বা বনমুরগির ডিম থেকে বেরনো অথচ দৌড়তে না-শেখা ছোট ছানাই গোটা একটা, মেটে ইঁদুরের গর্তের ভেতর হাত ঢুকিয়ে ইঁদুরের ছোট-ছোট বাচ্চাও জুটে যেতে পারে। সুতরাং বনবাদাড়ের ভেতর না ঢুকে ত মাদারির মায়ের কোনো উপায় নেই। তার শরীরের অভ্যাসও কেমন এই বনবাদাড়ের সঙ্গে মানিয়ে গেছে। মুখটা একটু উঁচুতে রাখলেও সে ঠিক জঙ্গলের মাটি দেখতে পায়, দেখতে-দেখতে খুঁজতেও পারে। মাদারির মার চোখদুটো থুতনির নীচে থাকলে ভাল হত।
এটাই ত তার সারা দিনের কাজ। হাতে একটা শক্ত লাঠি থাকে, বেশ ভারী, শালগাছের ডাল–ভেঙে নেয়া। খুব খিদের সময় লাঠিটাকে তার ভার মনে হয়। তা ছাড়া ঐ লাঠিটাই ত অস্ত্র। লাঠিটার তলার দিকটায় একটা কোণ আছে। ঐ কোণটুকু রেখেই লাঠিটা ভাঙা হয়েছে। ফলে, লাঠির আওতায় যদি কোনো ছোট প্রাণী পড়ে যা মাদারির মার খাদ্য হতে পারে, তা হলে ঐ লাঠি নিশ্চিত তার ঘাড়ে গিয়ে পড়ে। কোনো-কোনো সময় চলতে-চলতেই লাঠিটাকে বর্শার মত বিধিয়ে দেয়–যেভাবে মাছ মারে। আর কোনো-কোনো সময় মুহূর্তে লাঠিটাকে মাথার ওপর তুলে এনে শরীরের সমস্ত জোর দিয়ে সেটাকে নামিয়ে নিয়ে আসেকুড়ুলের মত। সেই সমস্ত সময় মাদারির মায়ের পুরো শরীরটা + জেগে ওঠে। ফরেস্টের ঐ আবছায়ায়–শাল-সেগুন-খয়ের-অর্জুনের পরিপ্রেক্ষিতে মাদারির মাও যেন একটা গাছই হয়ে ওঠে এমনই তার হাত দুটো ঋজু উঠে যায় মাথার ওপরে আর খর নেমে আসে, যেন, ঝড়ে কোনো গাছ হঠাৎ প্রাণ পেয়েছে। সেই দাঁড়িয়ে ওঠায় আর নেমে আসায় মাদারির মার এই শরীর ক্ষোদিত হয়ে যায়, যে-শরীর শুধু শরীরের জোরেই বেঁচে আছে, যে-শরীর শুধু শরীরের জোরেই আটটা না-দশটা সন্তানের জন্ম দিয়েছে।
আসলে এই ফরেস্টে খুব ভাল সাপ পাওয়া যায়। সাপের মাংসে তেল খুব আর ঝলসে নিতে আগুনের তাপও লাগে কম। চার পেয়ে মুখ-উঁচু সাপ পেলে ত কথাই নেই–অমৃত। কিন্তু ছোটখাট সাপও ত নেহাত কম নেই। মাদারির মা বিষধর সাপ চেনে। তাই চোখের সামনে পিঁপড়ে না-ধরা কোনো টাটকা মরা খরগোশ বা ধেড়ে ইঁদুর পেলেও সে ঘেঁয় না, এমন-কি লাঠি দিয়ে উল্টেও দেখে না। ফরেস্টে যা মরে তাকে মাটির সঙ্গে মিশে যেতে দিতে হয়। মরা জীবজন্তু খেয়েই বেঁচে থাকে এমন পাখি-পোকামাকড়ও ত ফরেস্টে থাকে।
