তার চাইতে বরং এরকম কর্মসূচিই ভাল। দীর্ঘদিন ধরে সরকারের দলগুলি প্রচার করেছে, নিজেদের কথা লোকজনকে বুঝিয়ে বলেছে, সরকারের দলগুলির নানা নেতা নানা জায়গায় নানা দফায় মিটিং করেছে। একই সঙ্গে তিস্তা ব্যারেজের পর্যায়ক্রমিক কাজের মধ্যে অদলবদল ঘটানো হয়েছে, চিফ ইনজিনিয়ার ও মন্ত্রীর সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রীর বৈঠক হয়েছে–এক বছরের মধ্যে উদ্বোধন করা হবে সাব্যস্ত হয়েছে। রাজ্য সরকার কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে এই নিয়ে কথা বলেছে। সরকারের দলগুলির প্রথমে ইচ্ছে ছিল প্রধানমন্ত্রীকে দিয়ে উদ্বোধন করানো। তা হলে কামতাপুর, উত্তরখণ্ড, নমশূদ্র সমিতি, গোর্খাল্যান্ডের পেছনে যে কংগ্রেসি জনসাধারণের সমর্থন আছে, তারা দ্বিধায় পড়বে। কারণ ঐ মঞ্চ থেকে প্রধানমন্ত্রীকে বিচ্ছিন্নতাবাদের বিরুদ্ধে বলতেই হবে। প্রধানমন্ত্রী ও মুখ্যমন্ত্রী রাজনীতিগত ভাবে একই কথা বললে, তার একটা অন্য ধরনের প্রভাব পড়বেই। কিন্তু এই প্রস্তাবে বাদ সাধেন রাজ্যের বড়বড় অফিসাররা দু-চারজন। তারা প্রথমে বলেছিলেন–এরকম সময়ে প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তার দায়িত্ব ও-রকম ভৌগোলিক অবস্থানে রাজ্য সরকারের পক্ষে পালন করা সম্ভব হবে না। বা, সে দায়িত্ব, নেয়া উচিত হবে না। আর, প্রধানমন্ত্রীকে দিয়ে উদ্বোধন করালে এই ঘটনা একটা জাতীয় গুরুত্ব পাবে। সেই গুরুত্বের কারণেই আন্দোলনকারীরা নতুন ভাবে উৎসাহিত হতে পারে। সেই সুবাদে তারা হয়ত সত্যি একটা সক্রিয় বিক্ষোভ দেখিয়ে বসতে পারে। বিশেষত, গোখারা। পরন্তু হাসিমারায় সেনাবাহিনীর এয়ারস্ট্রিপেই নামুন আর বাগডোগরা এয়ারপোর্টেই নামুন–প্রধানমন্ত্রীকে গাড়িতে করে এতটা পথ জঙ্গল ও পাহাড়ের মধ্য দিয়ে যেতে হবে, সেসব পাহাড় ও জঙ্গলের গাছে কোনো গোপন আততায়ীর লুকিয়ে থাকা অসম্ভব নয়।
কিন্তু প্রধানমন্ত্রী ত হ্যাঁলিকপ্টারে চড়ে একেবারে তিস্তা ব্যারেজের ওপরেই নামতে পারেন।
এতখানি আলোচনার পর দু-চার জন অফিসার তাদের আসল বক্তব্য পরস্পরের আড়ালে মুখ্যমন্ত্রীকে জানান–তিস্তা ব্যারেজের মত এত গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের কৃতিত্বের ভাগ কেন্দ্রকে দেয়া রাজনীতিগত ভাবে ঠিক নাও হতে পারে। কারণ, প্রধানমন্ত্রী উদ্বোধন করলে তার ওপরই মিডিয়া নজর দেবে বেশি। এখন, বিশেষত নির্বাচনের যখন মাত্র কয়েক মাস বাকি, এরকম কিছু করা অনুচিত হবে।
নির্বাচনটা এসে যাচ্ছে বলেই, তিস্তা ব্যারেজের উদ্বোধন, সেই উদ্বোধন নিয়ে জনসমাবেশ, বিচ্ছিন্নতাবাদীদের আলাদা-আলাদা সমাবেশের মিলিত সংখ্যার চাইতেও বড় সমাবেশ করে সরকারের ও সরকারি দলগুলির প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা–এগুলো এতই জরুরি। সরকারি দলগুলি স্থির করেছে যে তিস্তা ব্যারেজ উদ্বোধন আসলে হবে নির্বাচনী অভিযানের শুরু। এই সমাবেশের শক্তিকে, তিস্তা ব্যারেজের সাফল্যকে এমন ভাবে সেদিন তুলে ধরতে হবে যে সেই ধাক্কায় সামনের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চলবে। উত্তরবঙ্গের মোট আসন সংখ্যা যদি সরকারি দলগুলি রাখতে পারে–দুটো-একটা সিটের অদলবদলের দুর্ঘটনা সত্ত্বেও–তা হলেই যথেষ্ট। আর, যদি সেই সিটের সংখ্যা দুটো-একটাও বাড়াতে পারে, তা হলে ত কথাই নেই। সেটা একমাত্র সম্ভব যদি সরকার ও সরকারি দলের রাজনৈতিক অভিযান তীব্র করে তুলে, কংগ্রেসের সঙ্গে এই সব বিচ্ছিন্নতাবাদীদের প্রকাশ্য বা অপ্রকাশ্য কোনো আপস-সমঝাওতা অসম্ভব করে তোলা যায়। নির্বাচনী কৌশলের দিক থেকে, এই সব উটকো দলগুলির ফলে, তা হলে, বামফ্রন্ট ও তার অন্তর্গত দলগুলির উপকারই হবে। কংগ্রেস-সমর্থক ভোট যদি সরকারি কংগ্রেস প্রার্থী ও এই সব উটকো দলের প্রার্থীদের মধ্যে ভাগ হয়ে যায়, তা হলে, বামফ্রন্ট গতবারের চাইতেও বেশি আসন পাবে–উত্তরবঙ্গে। সুতরাং, তিস্তা ব্যারেজ উদ্বোধন উপলক্ষে বামফ্রন্ট তার দলগুলির ও তার সরকারের সমস্ত শক্তি বিনিয়োগ করেছে।
কোথায় ভুটান সীমান্তের চা-বাগানের কোল-মুন্ডা সাঁওতাল শ্রমিক–সেই সাঁওতালপুর, কালচিনি, রাঙ্গালিবাজানা, রাজভাতখাওয়া থেকে তারা রাজবংশীদের সঙ্গে ট্রাকে-ট্রাকে মিছিল করে আসবে। একটা মস্ত বড় সুবিধে হয়েছে, চা-বাগানগুলি নিজেরাই ট্রাক দিয়েছে। অন্য দিকে জয়ন্তীর রাস্তা ও বিন্নাগুড়ি থেকে শুরু করে ঐ তল্লাটের সব উজাড় করে আনা হবে। ময়নাগুড়ি থেকে শুরু করে একদিকে লাটাগুড়ি পর্যন্ত লোকজন ত মিছিল করেই আসবে–তাদের ত ঘরের ব্যাপার। মাদারিহাট-বীরপাড়া-হাসিমারা থেকে ট্রাক আসবে ল্যাটারাল রোড ধরে। মেটেলি থেকে শুরু করে মেটেলির পেছন দিয়ে সেই মাইল-মাইল দূরের গরুবাথান রোডের চা-বাগানগুলির ভেতর থেকে নেপালি শ্রমিকদের খুব সংগঠিত ভাবে আনা হবে।
রাজবংশী বা মদেশিয়া জনসাধারণ জুটে যাবে, কিন্তু নেপালিদের সংগঠিত ভাবে নিয়ে না-এলে নিজে থেকে জুটে নাও যেতে পারে। ওদিককার পাহাড়ি চা বাগানগুলির আয়তন ছোট-ফলে নেপালি শ্রমিক থাকলেও সংখ্যা খুব বেশি নয়। সেই জন্যে সরকার ও সরকারি দলগুলি অন্য ব্যবস্থাও নিয়েছে। কয়েক বছর আগে ফরেস্টের পতিত জমি দখল করার জন্যে নেপালিরা প্রায় মিছিল করে এক-একটা ফরেস্টে ঢুকেছিল। তখন এ নিয়ে খুব হৈ-হৈও হয়েছিল। পরে, সরকার চুপ করে যায়–ভাবখানা যেন এদের জবরদখল মেনেই নিল। আসলে, ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টকে নির্দেশ দেয়া হয়, মাস তিন-চার পর থেকে নতুন গাছ লাগানোর কর্মসূচি হিশেবে জবরদখলকারীদের তারা তুলে দেবে। সব জায়গায় একসঙ্গে নয়। বড় জবরদখল কলোনিতে আগে নয়। এমনকি পর-পরও নয়। যেন জবরদখলকারীরা মনে করে যেন গোলমালে দরকার নেই বরং একই ফরেস্টের নতুন জায়গায় বসতি করা নিরাপদ। ফরেস্ট ডিপার্টমেন্ট দরকার হলে পুলিশের সক্রিয় সাহায্য নেবে। এই পদ্ধতিতে নতুন জবরদখল ঠেকানো গেছে, কিন্তু পুরনো জবরদখলকারীদের সব জায়গা থেকে তুলে দেয়া এখনো শেষ হয়নি। নির্বাচনের আগে একাজ আর করাও হবে না। এমন জবরদখলকারীর সংখ্যা এখনো কয়েক হাজার। ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের ও ফরেস্টের কনট্রাকটারদের অসংখ্য ট্রাকে এই জবরদখলকারীদের ব্যারেজে নিয়ে আসা হচ্ছে। তাদের আশা, সরকারকে সমর্থন করলে স্থায়ী বসবাসের পাট্টা মিলতে পারে।
