আর, এরকম উদ্ভট সময়ে পাহাড় অঞ্চল থেকে কথা ওঠে–তিস্তা ব্যারেজের আসল মতলব পাহাড়ের নদীর জল সমতলের জন্যে টেনে নেয়া।
একথার কোনো যুক্তি নেই কারণ পুরো পাহাড় এলাকা পেরিয়েই ত ব্যারেজের জায়গায় জল আসছে। একথা ইতিহাসের দিক থেকেও ঠিক নয় কারণ উত্তরবঙ্গে সবচেয়ে বেশি নদী নিয়ে প্রকল্প তৈরি হয়েছে দার্জিলিং জেলাতেই। একথা পাহাড়ের স্বার্থেও ঠিক নয় কারণ তিস্তা প্রকল্পে ত পাহাড়ি অঞ্চলও উপকৃত হবে।
কিন্তু কথাটা রাজনীতির দিক থেকে বড় বেশি লাগসই কথা।
চোখের সামনে দেখা যাচ্ছে, নীচে তিস্তার জলকে এক জায়গায় আটকে, তিস্তাকে একটা মূলখাতে বইয়ে দেয়ার কাজ চলছে, কাজ এগচ্ছে। দেখতে দেখতে ফরেস্টের ভেতর, এক নির্জন জায়গার চেহারা বদলে গেল সেই কাজের বেগে। দেখতে-দেখতে তিস্তার বুকে অন্ধকার রাত্রিতে আলো জ্বলে উঠল–রাতেও কাজ চলছে। সেদিকে আঙুল দেখিয়ে বলা যায়–ঐ দেখো, তিস্তা ব্যারেজের কাজ চলছে; তিস্তা ত পাহাড়ের নদী, কালিম্পঙের নদী, আমাদের নদী; কিন্তু এই যে আমাদের নদী সে যতক্ষণ পাহাড়ের ভেতর বয়ে যাচ্ছে ততক্ষণ তার দিকে রাজ্য সরকারের নজর নেই; এমন-কি সেই ইংরেজরা তিস্তার ওপর যেকটা সঁকো পাহাড়ে তৈরি করেছিল তারপর দেশী সরকার একটি কোও তৈরি করে নি; অথচ দেখো, নীচে, সমতলে কত বড় তিস্তা ব্রিজ তৈরি হল; ওরা আমাদের নদীও লুটে নিচ্ছে; আমরা এ হতে দেব না; তিস্তা ব্যারেজ ভাঙতে হবে।
এই সব যুক্তি বড় তাড়াতাড়ি লোকের মনে ধরে। বঞ্চিত মানুষ বড় তাড়াতাড়ি হিংসুটে হয়ে উঠতে চায়, তাতে তার মনে একটা সান্ত্বনা অন্তত পায়। আর, চোখের সামনে গড়ে ওঠা একটা জিনিশকে ভাঙার আহ্বান দিলে লড়াইটা একটা প্রত্যক্ষতা পায়। তাই পাহাড় থেকে পাহাড়ি মানুষের আওয়াজ উঠেছে–তিস্তা ব্যারেজ ভাঙতে হবে। সে আওয়াজ হাজার-হাজার বছরের প্রাচীন রাস্তা বেয়ে জলপাইগুড়ির সমতলে যে-পাহাড়ি মানুষ আছে তাদেরও মুখে উঠে এল–তিস্তা ব্যারেজ ভাঙতে হবে।
উত্তরখণ্ড, কামতাপুর, গোর্খাল্যান্ড ও পুরনো চরের নমশূদ্রদের সংগঠন–এই এতগুলো আন্দোলনের বিরোধিতার সামনে সরকার তিস্তা ব্যারেজের কাজের গতি বাড়িয়ে দিল। প্রথমত, এই এতগুলো বিরোধিতার মধ্যে কোনো ঐক্য নেই। প্রত্যেকেরই আলাদা-আলাদা কারণ আছে এবং সে কারণগুলি পরস্পরের বিরোধী। উত্তরখণ্ড চায় ভাটিয়া তাড়াতে। নমশূদ্ররা চায় উপযুক্ত পুনর্বাসন। উত্তরখণ্ড চায় স্বতন্ত্র রাজ্য। কামতাপুর চায় আসামের একটা অংশের সঙ্গে মিলন। গোর্খাল্যান্ড চায় স্বাতন্ত্র-আলাদা রাজ্য হিশেবে হলেই ভাল হয়।
প্রতিপক্ষদের ঐক্যবদ্ধ হওয়া অসম্ভব, সুতরাং রাজ্য সরকার তার নিজের রাজনৈতিক শক্তিকে সংহত করতে পারে। বামফ্রন্টের ভেতরকার পার্টিগুলো ত আছেই, বাইরের পার্টির মধ্যে কংগ্রেস-এর পক্ষে রাজনীতিগত ভাবে এই সব দলের কোনোটিকে প্রকাশ্যে সমর্থন দেয়া অসম্ভব। সুতরাং. এই অভূতপূর্ব রাজনৈতিক ঐক্যের সঙ্গে তিস্তা ব্যারেজের আংশিক কাজ সম্পূর্ণ করে যদি উদ্বোধন ঘটানো যায়, তা হলে উত্তরবঙ্গের লোক হাতেনাতে প্রমাণ পাবে যে এই সরকার তাদের কথা কতটাই ভাবছে।
এরই সঙ্গে-সঙ্গে সরকার, দার্জিলিং ও জলপাইগুড়ি জেলার চা বাগানগুলিতে, যেখানে-যেখানে তাদের ইউনিয়ন আছে সেখান থেকে, প্রধানত পাহাড়ি মানুষদের একত্রিত করেছে। জলপাইগুড়ি-কোচবিহারে তাদের কৃষক সংগঠনগুলিকে প্রচারে নামিয়েছে। তারা রাজনীতির দিক থেকে অনেক সুসংহত। তারা পাহাড়ের মানুষজনের ও রাজবংশীদের মধ্যে প্রায় এক বছর ধরে বিচ্ছিন্নতাবাদ-এর বিরুদ্ধে প্রচার করে আসছে। এবং সংখ্যার দিক থেকে তারাই গরিষ্ঠ।
তাই, তিস্তা ব্যারেজের উদ্বোধন উপলক্ষে–উত্তরখণ্ড, কামতাপুর, গোর্খাল্যান্ডের দল আজ বিক্ষোভ করছে বটে কিন্তু সে-বিক্ষোভ তিস্তা ব্যারেজ পর্যন্ত পৌঁছবে না, পৌঁছতে দেওয়া হবে না। সরকারের দলগুলিও সারা জেলা থেকে মিছিল নিয়ে ব্যারেজে যাচ্ছে সমর্থন জানাতে। কেন্দ্রীয় সরকারের জলবিষয়ক রাষ্ট্রমন্ত্রী, রাজ্য সরকারের সেচমন্ত্রী, মুখ্যমন্ত্রী স্বয়ং আসছেন উদ্বোধন করতে। আর এরই ফলে ব্যারেজ ঘিরে, পুলিশ, সি-আর-পি, বিএসএফের পাকের পর পাক, পাকের পর পাক।
.
১৯৮.
নির্বাচন ও উদ্বোধন তিস্তা ব্যারেজের উদ্বোধন তাই একটা সরকারি প্রকল্পের উদ্বোধনমাত্র নয়, হয়ে উঠেছে একটা রাজনৈতিক ঘটনা।
সরকার ও সরকারের অন্তর্ভুক্ত দলগুলি পরিষ্কার শক্তিপরীক্ষায় নেমেছে। তারা এটা প্রমাণ করে দিতে চায় যে এই সব কামতাপুর, উত্তরখণ্ড, নমশূদ্র সমিতি, গোখাল্যান্ড ইত্যাদির কোনো রাজনৈতিক ভিত্তিই নেই। নেহাত, সরকারে পক্ষে এদের দমন করাটা একটা কৌশলগত প্রশ্ন, তাই, দু-পাঁচজন লোক এক হয়েই একটা স্তন বা ল্যান্ডের শ্লোগান দিতে পারে। তারা ত শ্লোগান দিয়েই খালাশ। সরকারের পক্ষে ত আর সব সময় তাদের জেলে ভরা সম্ভব নয়। জেলে ভরলে ত তাদের নেতা বানিয়ে দয়া হবে। আর-এক হয়, হাঠে-মাঠে যেখানেই তারা মিটিং-মিছিল করবে–সেখানেই পুলিশ দিয়ে মেরে ছাতু করে দেয়া। পুলিশের মারের অনেক সুফল আছে। কিন্তু মার দিতে বললে পুলিশ ত আর রয়ে-সয়ে মার দেবে না। তাতে যদি দু-একটা মারা যায়, তা হলে তাই নিয়ে সারা দেশে গোলমাল বাধবে। মারা না গেলেও, পুলিশের মারের খবর কাগজে-পত্রে এমন ফলাও হয়ে বেরবে যে আন্দোলন থামার বদলে চাগিয়ে উঠবে।
